বীরকন্যা প্রীতিলতা: এক সাহসী কন্যার গল্প
অনু সরকার
উইমেননিউজ২৪
প্রকাশিত : ১১:৪১ পিএম, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ বুধবার
প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার।
বাংলার আকাশে অনেক উজ্জ্বল তারার জন্ম হয়েছে। তাঁদের কেউ কবি, কেউ বিজ্ঞানী, কেউ শিক্ষক, আবার কেউ দেশের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করে মানুষের হৃদয়ে চিরদিনের জন্য জায়গা করে নিয়েছেন। তেমনই এক উজ্জ্বল নাম প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার। তিনি ছিলেন সাহসী, মেধাবী, দেশপ্রেমিক এবং অদম্য এক তরুণী। আজও তাঁর জীবন আমাদের শেখায়—নিজের দেশকে ভালোবাসতে হয়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হয় এবং মানুষের মর্যাদাকে সবার আগে রাখতে হয়।
ছোট্ট রাণী
১৯১১ সালের ৫ মে চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার ধলঘাট গ্রামে জন্ম নেন প্রীতিলতা। তাঁর বাবা জগদ্বন্ধু ওয়াদ্দেদার ছিলেন একজন কর্মচারী এবং মা প্রতিভাদেবী ছিলেন স্নেহময়ী গৃহিণী। পরিবারের সবাই আদর করে তাঁকে ডাকতেন ‘রাণী’ নামে।
ছোটবেলা থেকেই প্রীতিলতা ছিলেন শান্ত, লাজুক এবং খুব মেধাবী। তিনি মাকে ঘরের কাজে সাহায্য করতেন, বই পড়তে ভালোবাসতেন এবং নতুন কিছু জানার জন্য সবসময় আগ্রহী থাকতেন। স্কুলে তাঁর প্রিয় বিষয় ছিল সাহিত্য, ইতিহাস ও সংস্কৃত।
পড়াশোনায় সবার সেরা
চট্টগ্রামের ডা. খাস্তগীর সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ে পড়াশোনা শুরু করেন প্রীতিলতা। প্রতিটি শ্রেণিতে তিনি ভালো ফল করতেন। পরে তিনি ঢাকার ইডেন কলেজে পড়াশোনা করেন এবং সেখানেও কৃতিত্বের সঙ্গে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর কলকাতার বেথুন কলেজে উচ্চশিক্ষা লাভ করেন।
প্রীতিলতা শুধু ভালো ছাত্রীই ছিলেন না, তিনি গান শুনতে ভালোবাসতেন, বাঁশি বাজাতেন এবং সাহিত্য পড়তেন। বন্ধুদের সঙ্গে স্বপ্ন দেখতেন—একদিন বড় হয়ে দেশের জন্য কিছু করবেন।
অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ
সেই সময় ভারতবর্ষ ব্রিটিশ শাসনের অধীনে ছিল। অনেক মানুষ নানা ধরনের বৈষম্য ও অবিচারের শিকার হতেন। এই অন্যায় দেখে প্রীতিলতার মনে গভীর কষ্ট জন্ম নেয়। তিনি ভাবতেন, মানুষে মানুষে এত ভেদাভেদ কেন? সবাই কি সমান মর্যাদা পাওয়ার অধিকারী নয়?
দেশের স্বাধীনতা ও মানুষের সম্মানের জন্য যারা কাজ করছিলেন, তাঁদের আদর্শ প্রীতিলতাকে অনুপ্রাণিত করেছিল। তিনি বিশ্বাস করতেন, দেশকে ভালোবাসা মানে দেশের মানুষের কল্যাণের কথা ভাবা।
সাহসী এক তরুণী
প্রীতিলতা ছিলেন অসাধারণ সাহসী। নানা বাধা ও ভয়কে জয় করে তিনি দেশের মানুষের মর্যাদা রক্ষার কাজে নিজেকে যুক্ত করেন। তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল দেশপ্রেম এবং মানুষের প্রতি ভালোবাসা।
মাত্র ২১ বছর বয়সে তিনি দেশের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেন। ১৯৩২ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর তাঁর জীবনের শেষ অধ্যায় রচিত হয়। কিন্তু তাঁর আদর্শ, সাহস ও আত্মত্যাগ কখনো শেষ হয়নি। আজও তিনি বেঁচে আছেন মানুষের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায়।
আমাদের জন্য প্রীতিলতার শিক্ষা
প্রীতিলতার জীবন থেকে আমরা অনেক কিছু শিখতে পারি—
মন দিয়ে পড়াশোনা করতে হবে।
অন্যায়ের বিরুদ্ধে সত্য ও ন্যায়ের পথে দাঁড়াতে হবে।
মানুষকে ভালোবাসতে হবে।
নিজের দেশ ও সংস্কৃতিকে শ্রদ্ধা করতে হবে।
সাহস, সততা ও দায়িত্ববোধ নিয়ে জীবন গড়তে হবে।
রাতের আকাশে যেমন কিছু তারা কখনো নিভে যায় না, তেমনি প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের নামও ইতিহাসে চিরদিন উজ্জ্বল হয়ে থাকবে। তিনি ছিলেন বাংলার এক সাহসী কন্যা, যিনি আমাদের শিখিয়ে গেছেন—ভালোবাসা, সাহস আর আদর্শ মানুষকে মহান করে তোলে।
যখনই আমরা দেশের কথা ভাবব, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সত্যের কথা বলব, তখনই মনে পড়বে সেই ছোট্ট মেয়েটির কথা—যার নাম প্রীতিলতা, যার হৃদয় ছিল সাহসে ভরা, আর যার স্বপ্ন ছিল একটি সুন্দর, মর্যাদাপূর্ণ দেশ।
