ঢাকা, শনিবার ২৬, সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৫:৫০:৫৩ এএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

জামালপুর সদর হাসপাতালের বেহাল দশা

জামালপুর প্রতিনিধি

উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ০২:৫৪ পিএম, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ শুক্রবার

জামালপুর সদর হাসপাতাল

জামালপুর সদর হাসপাতাল

জামালপুরের মানুষের চিকিৎসার অন্যতম প্রধান ভরসা ২৫০ শয্যার জামালপুর জেনারেল হাসপাতাল। কিন্তু সেই ভরসার জায়গাটিই এখন যেন অসুস্থতার আরেক নাম। বেহাল অবস্থা সারা হাসপাতালজুড়ে। ধারণক্ষমতার কয়েক গুণ রোগীর চাপ, শয্যার সংকট, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ, পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও জনবলের অভাব—সব মিলিয়ে প্রতিদিনই চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন রোগী ও স্বজনেরা।

সাম্প্রতিক সময়ে হাসপাতালটির বিভিন্ন ওয়ার্ডে ঘুরে দেখা এবং রোগী-স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে যে চিত্র উঠে এসেছে, তা উদ্বেগজনক। কোথাও বেডের ওপর রোগী, কোথাও মেঝেতে, আবার কোথাও বারান্দা কিংবা চলাচলের জায়গা দখল করে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। গাদাগাদি করে থাকা রোগীদের কারণে ওয়ার্ডে স্বাভাবিকভাবে চলাচলেরও সুযোগ নেই।

বেড নেই, মেঝেতেই ঠাঁই

২৫০ শয্যার এই হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে ৬০০ থেকে ৮০০ রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রতিদিন গড়ে ৭০০ থেকে সাড়ে ৭০০ রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন—যা হাসপাতালের নির্ধারিত ধারণক্ষমতার প্রায় তিন গুণ।

ফলে বেড না পেয়ে রোগীদের ঠাঁই হচ্ছে মেঝেতে। মেডিসিন ওয়ার্ডে এমনও দেখা গেছে, একটি বেডে একাধিক রোগীকে জায়গা ভাগ করে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। করিডোর ও চলাচলের স্থানও রোগীদের দখলে চলে গেছে।

সম্প্রতি এক রোগী মোজাহিদ জানান, তিন দিন হাসপাতালে থেকেও তিনি বেড পাননি। মেঝেতে বসেই তাকে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।

অন্য এক রোগীর স্বজনের ভাষায়, রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে এসে সুস্থ পরিবেশে চিকিৎসা করানোর আশা থাকলেও বেড না পেয়ে মেঝেতে থাকতে হচ্ছে। মানুষের চলাচলের জায়গাতেও রোগী শুয়ে থাকায় অসুস্থ মানুষটির বিশ্রামের সুযোগ নেই।

নোংরা-অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ

শুধু শয্যা সংকটই নয়, হাসপাতালের পরিবেশ নিয়েও রোগী ও স্বজনদের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। মেঝেতে জমে থাকা ময়লা, অপরিচ্ছন্ন ওয়ার্ড, রোগী ও স্বজনদের গাদাগাদি করে অবস্থান এবং পর্যাপ্ত জায়গার অভাবে স্বাস্থ্যকর পরিবেশ বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।

সম্প্রতি টিআইবি ও সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) আয়োজিত গণশুনানিতে রোগী ও স্বজনেরা হাসপাতালের নোংরা-অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, সেবা পেতে বিলম্ব, ফ্যান-বাতি অচল থাকা, হয়রানি এবং চিকিৎসক-নার্সদের আচরণসহ ২১টি অভিযোগ তুলে ধরেন।

ডেঙ্গু রোগীদের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। আলাদা ডেঙ্গু ওয়ার্ড বা পর্যাপ্ত শয্যা না থাকায় মেডিসিন ওয়ার্ডেই অন্যান্য রোগীর সঙ্গে গাদাগাদি করে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে তাদের। এক রোগীর স্বজনের অভিযোগ, ময়লার মধ্যেই রোগীদের মেঝেতে রাখা হচ্ছে।

চিকিৎসকও প্রয়োজনের তুলনায় কম

রোগীর তুলনায় চিকিৎসক ও জনবলও অপ্রতুল। ২০২৫ সালের একটি প্রতিবেদনে দেখা যায়, হাসপাতালটিতে চিকিৎসকের ৭৩টি পদের বিপরীতে কর্মরত ছিলেন ৪৮ জন। চিকিৎসক সংকটের পাশাপাশি নার্স ও অন্যান্য জনবলের ঘাটতিও রয়েছে।

অতিরিক্ত রোগীর চাপের সঙ্গে এই জনবল সংকট যুক্ত হওয়ায় দায়িত্ব পালনকারী চিকিৎসক ও নার্সদের ওপরও তৈরি হচ্ছে বাড়তি চাপ। ফলে রোগীরাও কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

সাম্প্রতিক এক গণশুনানিতে জানানো হয়, ২৫০ শয্যার হাসপাতাল হলেও সেখানে প্রায় ১৫০ শয্যার উপযোগী জনবল রয়েছে। অথচ প্রতিদিন ছয় শতাধিক রোগী ভর্তি থাকেন।

ঝুঁকিপূর্ণ ভবনেও চিকিৎসা

হাসপাতালের আরেকটি বড় সমস্যা অবকাঠামো। বহির্বিভাগের পুরোনো ভবনটি ১৯৬১ সালে নির্মিত। ২০২১ সালে গণপূর্ত বিভাগ ভবনটিকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করলেও সেখানে এখনও চিকিৎসাসেবা চলছে। ভবনের ছাদ ও দেয়ালে ফাটল, বিভিন্ন স্থানে পলেস্তারা খসে পড়া এবং বৃষ্টির সময় ছাদ চুইয়ে পানি পড়ার অভিযোগ রয়েছে।

অর্থাৎ একদিকে রোগীর ঠাঁই নেই, অন্যদিকে যেসব ভবনে চিকিৎসা চলছে সেগুলোর কোনো কোনোটি নিজেই ঝুঁকিপূর্ণ। এতে রোগী, স্বজন, চিকিৎসক ও কর্মচারী—সবার নিরাপত্তাই প্রশ্নের মুখে।

আট বছরেও চালু হয়নি আইসিইউ

হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্র বা আইসিইউ উদ্বোধনের পরও দীর্ঘদিন ধরে তালাবদ্ধ রয়েছে। প্রথম আলোর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জনবল সংকট, সিদ্ধান্তহীনতা ও অব্যবস্থাপনার কারণে আট বছর ধরে আইসিইউ চালু করা সম্ভব হয়নি।

জেলার গুরুতর অসুস্থ রোগীদের জন্য এটি বড় সংকট। সংকটাপন্ন রোগীর প্রয়োজন হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্যত্র নেওয়ার ঝুঁকি ও ভোগান্তি তৈরি হয়।

এক ইনকিউবেটারে তিন নবজাতক

গত ৫ সেপ্টেম্বর হাসপাতাল পরিদর্শনে গিয়ে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত হাসপাতালের সার্বিক পরিস্থিতি দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। পরিদর্শনের সময় একটি ইনকিউবেটারে তিন নবজাতককে রাখার চিত্রও তাঁর নজরে আসে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

হাসপাতালের এমন চিত্র শুধু অবকাঠামোগত সংকট নয়, পুরো স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাপনার ওপরই প্রশ্ন তৈরি করছে।

কর্তৃপক্ষের বক্তব্য

হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. সোহানুর রহমান জানিয়েছেন, হাসপাতালটি ২৫০ শয্যার হলেও প্রতিদিন গড়ে ৭০০ থেকে সাড়ে ৭০০ রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন। ধারণক্ষমতার চেয়ে অতিরিক্ত রোগীর কারণে হাসপাতালের ওপর ব্যাপক চাপ তৈরি হয়েছে। পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় আলাদা ডেঙ্গু ওয়ার্ডও চালু করা সম্ভব হয়নি বলে জানান তিনি।

গণশুনানিতে রোগী ও স্বজনদের অভিযোগ শোনার পর হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. মাহফুজুর রহমান সোহান সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধানের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন।

চিকিৎসার জায়গায় কেন এমন দুর্ভোগ?

জামালপুরের এই হাসপাতাল শুধু সদর উপজেলার মানুষের নয়, জেলার বিভিন্ন উপজেলা এবং আশপাশের এলাকার মানুষেরও গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসাকেন্দ্র। ফলে প্রতিদিন রোগীর চাপ বাড়ছে। কিন্তু সেই অনুপাতে শয্যা, ভবন, চিকিৎসক, নার্স, পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও অন্যান্য অবকাঠামো বাড়েনি।

ফলে হাসপাতালের প্রতিটি ওয়ার্ডে যেন একই চিত্র—রোগীর ভিড়, বেডের জন্য অপেক্ষা, মেঝেতে চিকিৎসা, বারান্দায় স্বজনের রাত কাটানো, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ আর চিকিৎসক-নার্সদের ওপর অতিরিক্ত চাপ।

একটি সরকারি হাসপাতাল মানুষের শেষ ভরসার জায়গা। সেখানে অসুস্থ মানুষ সুস্থ হওয়ার আশায় আসেন। অথচ জামালপুর জেনারেল হাসপাতালে এসে যদি তাকে মেঝেতে শুয়ে থাকতে হয়, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে চিকিৎসা নিতে হয় কিংবা প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও শয্যা না মেলে—তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে, এই বিপুলসংখ্যক মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার দায়িত্বটি কীভাবে আরও কার্যকরভাবে পালন করা যায়?

এদিকে জামালপুরবাসীর দাবি, সাময়িক ব্যবস্থা নয়, প্রয়োজন হাসপাতালের শয্যা ও অবকাঠামো বৃদ্ধি, দ্রুত চিকিৎসক-নার্সসহ প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ, ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের বিকল্প ব্যবস্থা, পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা এবং দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা আইসিইউসহ প্রয়োজনীয় সেবা দ্রুত চালু করা। তা না হলে ২৫০ শয্যার এই হাসপাতাল রোগীর চাপ সামলাতে গিয়ে আরও বড় সংকটে পড়বে।