বাড়ি ফিরতে যশোর কারাগারে ৪৫ ভারতীয় নাগরিকের কান্না
নিজস্ব প্রতিবেদক
উইমেননিউজ২৪
প্রকাশিত : ১০:১১ এএম, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ রবিবার
সংগৃহীত ছবি
চরল দেবী (৪৮) সারাদিনই কাঁদেন। তার ধারণা, যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের প্রাচীরের বাইরেই ভারত। এই প্রাচীরটি পার হতে পারলেই তিনি তার বাড়ি ভারতের বিহারে যেতে পারবেন। দু’বছর ধরে কাঁদতে কাঁদতে তিনি মানসিক রোগী হয়ে গেছেন। এখন তিনি খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রিজন সেলে ভর্তি রয়েছেন।
চরল দেবীর মতো যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে ১৪ বছর ধরে কাঁদছেন শ্রী গোবিন্দ বিহারী (৪৭)। ২০১১ সালে অবৈধভাবে বাংলাদেশে প্রবেশের দায়ে তার একবছর কারাদণ্ড হয়। সাজা শেষে ১৪ বছর ধরে তিনি মুক্তির অপেক্ষায় রয়েছেন।
শুধু চরল দেবী বা গোবিন্দ বিহারীই নন; যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে এমন ৪৫ জন ভারতীয় বন্দি রয়েছেন, যাদের এখন কোনো সাজা নেই। মুক্তি পেয়ে দেশে ফেরার অপেক্ষা তাদের। কিন্তু ভারত থেকে প্রত্যাবাসনের অনুমোদন না মেলায় কারাগারের প্রকোষ্ঠেই বছরের পর বছর কাটছে তাদের।
যশোর কেন্দ্রীয় কারাগার সূত্র জানায়, বাংলাদেশের সীমান্তের একটি বড় অংশ ভারতের সঙ্গে। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় নাগরিকরা অবৈধভাবে দেশে ঢুকে পড়েন। তাদের কোনো পাসপোর্ট থাকে না। অবৈধ এসব ভারতীয় নাগরিক আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়েন। অবৈধ অনুপ্রবেশসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক মামলায় বাংলাদেশের আদালতে এদের কারো কারো কোনো সাজাই হয়নি। আর অধিকাংশের ১৫ দিন থেকে দুই বছরের কম সাজা হয়েছে। এই সাজা ভোগ শেষ হয়ে যাওয়ায় এদের মুক্তিতে আর কোনো বাধা নেই। কিন্তু মুক্তি মিলছে না প্রশাসনিক জটিলতার কারণে।
সূত্র জানায়, ভারতীয় এই বন্দিদের পাসপোর্ট না থাকায় তাদের মুক্তির জন্য প্রথমে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগ থেকে প্রত্যাবাসনের অনুমোদন দেওয়া হয়। এরপর ভারতীয় হাই কমিশন তথা ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। দু’পক্ষের আলোচনায় চূড়ান্ত হওয়ার পর প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। আটক এই বন্দিদের অধিকাংশেরই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগ থেকে প্রত্যাবাসনের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। কিন্তু মেলেনি ভারতীয় হাইকমিশন বা কর্তৃপক্ষের অনুমোদন।
চরল দেবীর সঙ্গে কারাগারে থাকা এক নারী জানান, চরল দেবী সারাদিনই কান্নাকাটি করেন। বাংলা বোঝেন, কিন্তু বলতে পারেন না। তিনি জানিয়েছেন, তার বাড়ি বিহারের দাউদপুর গ্রামে। বাবার বাড়ি রসুলপুর। তার স্বামী সন্তোষ ধরদু, শ্বশুর মিঠু তিওয়ারি। তার দুই ছেলে দুই মেয়ে। তিনি গ্রামে ঘুরে ঘুরে কাপড়ের ব্যবসা করতেন। কখন কীভাবে এই দেশে চলে এসেছেন, জানেন না।
চরল দেবী মনে করেন, জেলখানার দেওয়ালের বাইরের তার দেশ। এখন থেকে বের হতে পারলেই তিনি বাড়ি ফিরতে পারবেন। এই ভাবনা-আর কান্না তাকে মানসিক রোগী বানিয়ে ফেলেছে। তাই সম্প্রতি তার ঠাঁই হয়েছে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রিজন সেলে। বন্দি এই ৪৫ জনের সাতজন নারী।
কারা সূত্রটিও স্বীকার করেছে, ভারতীয় এই বন্দিদের অনেকে বছরের পর বছর কারাগারে থাকায় তাদের মানসিক সমস্যাও দেখা দিচ্ছে। কেউ কেউ মানসিক রোগীদের মতো আচরণ করেন, গায়ে কাপড়ও রাখতে চান না।
এ প্রসঙ্গে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও সাইকোথেরাপিস্ট ডা. এএইচএম মোস্তফা কামাল সৈকত বলেন, দিনের পর দিন বিনা কারণে আটক থাকায় এই বন্দিরা ডিপ্রেশনে ভুগতে থাকেন। এই হতাশা তীব্র পর্যায়ে পৌঁছালে তারা মানসিক রোগীতে পরিণত হতে পারেন। তাই কর্তৃপক্ষের উচিত, যতদ্রুত সম্ভব তাদেরকে পারিবারে ফিরিয়ে দেওয়া।
সূত্রটি আরও জানায়, ভারতীয় এই ৪৫ বন্দির সিংহভাগই বয়স্ক। এদের মধ্যে ২৪ জন পঞ্চাশোর্ধ্ব। ফলে তাদের শারীরিক রোগব্যাধি যেমন আছে, তেমনি রয়েছে মৃত্যুঝুঁকিও। জীবিত থাকা অবস্থায় তাদের থাকা-খাওয়ার যেমন ব্যয় আছে, তেমনি মারা গেলে মরদেহ সংরক্ষণও ব্যয়বহুল। বছরখানেক আগে এক ভারতীয়র মৃত্যুর পর মরদেহ সংরক্ষণে হাসপাতালের হিমঘর (মারচুয়ারি) ভাড়াবাবদই প্রায় লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে।
যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার আবিদ আহমেদ জানান, যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে সাজা শেষ বা আদালতের নির্দেশে ৪৫ জন ভারতীয় বন্দি মুক্তির অপেক্ষায় রয়েছেন। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে এই বন্দিদের বিস্তারিত তথ্য রয়েছে। এদের অধিকাংশই বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগ থেকে প্রত্যাবাসনের অনুমোদন পেয়েছেন। কিন্তু ভারতীয় কর্তৃপক্ষের প্রত্যর্পণের অনুমোদন না মেলায় তাদের মুক্তি সম্ভব হচ্ছে না।
এ ব্যাপারে যশোরের জেলা প্রশাসক এবং জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ আশেক হাসান বলেন, ভারতীয় এই বন্দিদের নিজ দেশে প্রত্যর্পণের ব্যাপারে প্রশাসন খুবই আন্তরিক। আমরা চেষ্টা করছি যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি এই ভারতীয়দের দ্রুত দেশে ফেরত পাঠাতে। এজন্য ভারতীয় হাইকমিশনের সঙ্গে যোগাযোগও করা হয়েছে। তবে এখনও আশানুরূপ সাড়া পাওয়া যায়নি। আমরা আশাবাদী হাইকমিশনের মাধ্যমে তাদেরকে দেশে ফেরত পাঠানো সম্ভব হবে। আর তা না হলে আদালতের মাধ্যমে ফেরত পাঠানোর বিকল্প ভাবনাও রয়েছে।
