দারুল আদালত: ইটের দেয়ালের আড়ালে ৪০০ বছরের ইতিহাস
নিজস্ব প্রতিবেদক
উইমেননিউজ২৪
প্রকাশিত : ০৯:১৫ এএম, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ বুধবার
সংগৃহীত ছবি
চট্টগ্রাম শহরের ব্যস্ত নগরজীবনের আড়ালে এমন কিছু স্থাপনা রয়েছে, যেগুলোর দেয়ালে সময়ের বহু অধ্যায় জমে আছে। চকবাজারের সরকারি হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজের পাহাড়চূড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা ‘দারুল আদালত’ তেমনই একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা। স্থানীয়ভাবে ‘পর্তুগিজ ভবন’ নামেও পরিচিত ভবনটি। প্রচলিত ঐতিহাসিক বর্ণনায় এটি চট্টগ্রামের প্রথম আদালত ভবন।
ভবনটির নির্মাণকাল নিয়ে একক কোনো মত নেই। স্থানীয় প্রচলিত ধারণায় এটি পর্তুগিজদের সময়, আনুমানিক ১৬৬৬ সালের দিকে নির্মিত। তবে, ইতিহাসবিদ আবদুল হক চৌধুরীর গবেষণা থেকে জানা যায়, চট্টগ্রাম ব্রিটিশ শাসনের অধীনে যাওয়ার পর ১৭৬১ সালের দিকে ভবনটি নির্মিত হয় এবং সেখানে আদালত স্থাপন করা হয়েছিল। ফলে ভবনটির প্রকৃত নির্মাণকাল নিয়ে মতভেদ এখনো রয়েছে।
ব্রিটিশ আমলের আদালত
‘দারুল আদালত’ শব্দের অর্থ আদালত বা বিচারালয় ভবন। ঐতিহাসিক সূত্রগুলোতে ভবনটিকে চট্টগ্রামের প্রথম আদালত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ব্রিটিশ শাসনের শুরুর দিকে এখানে বিচারিক কার্যক্রম পরিচালিত হতো। ১৮৫৭ সালের দিকে আদালত লালদিঘীর পাশে লালকুঠি বা রেড বিল্ডিংয়ে স্থানান্তরিত হলে দারুল আদালতের সেই ভূমিকার অবসান ঘটে।
ভবনটির সঙ্গে পর্তুগিজদের সম্পর্কের বিষয়টিও দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত। স্থানীয়ভাবে ‘পর্তুগিজ ভবন’ নামে পরিচিত হওয়ার পেছনে এর স্থাপত্যশৈলী অন্যতম কারণ। তবে, পর্তুগিজদের হাতে ভবনটি নির্মিত হয়েছিল কিনা, সে বিষয়ে নিশ্চিত ঐতিহাসিক প্রমাণ নিয়ে মতভেদ রয়েছে। ২০০৯ সালে চট্টগ্রাম মহসিন কলেজ কর্তৃপক্ষ ও প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের একটি জরিপে ভবনটির স্থাপত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত মুঘল, ব্রিটিশ বা আধুনিক স্থাপত্যরীতির সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না বলে উল্লেখ করা হয়েছিল।
স্থাপত্যেও আলাদা বৈশিষ্ট্য
দুইতলা ভবনটির স্থাপত্যে ইউরোপীয় ও স্থানীয় বৈশিষ্ট্যের সংমিশ্রণ দেখা যায়। বিভিন্ন ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, ভবনটির দেয়াল বেশ পুরু এবং এর কাঠামোয় ইটের ব্যবহার রয়েছে। ভবনের ওপরের অংশে দুটি টাওয়ার বা উঁচু কাঠামো রয়েছে। ঐতিহাসিক বর্ণনায় বলা হয়েছে, এসব স্থান থেকে পাহারাদাররা কর্ণফুলী নদী ও আশপাশের এলাকার গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করতেন।
দারুল আদালতের সঙ্গে একটি সুড়ঙ্গের গল্পও প্রচলিত রয়েছে। জনশ্রুতি অনুযায়ী, ভবনের নিচ থেকে কর্ণফুলী নদী পর্যন্ত একটি গোপন সুড়ঙ্গ ছিল এবং সেটি দিয়ে মালামাল আনা-নেওয়া হতো। ভবনটির নিচে গোপন কক্ষ থাকার কথাও স্থানীয়ভাবে প্রচলিত। তবে, এসব গল্পের ঐতিহাসিক সত্যতা নিশ্চিত করার মতো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বরং ইতিহাসবিদদের একটি অংশ পর্তুগিজ জলদস্যুদের দুর্গ হিসেবে ভবনটি ব্যবহারের প্রচলিত ধারণার সত্যতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।
মাদ্রাসা থেকে মহসিন কলেজ
দারুল আদালতের ইতিহাস পরবর্তীতে চট্টগ্রামের শিক্ষা ইতিহাসের সঙ্গেও যুক্ত হয়ে যায়। সরকারি হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজের নিজস্ব ইতিহাস অনুযায়ী, মহসিন ফান্ডের সহায়তায় ১৮৭৪ সালে চট্টগ্রাম মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে এই প্রতিষ্ঠানটি বিকশিত হয়ে ১৯২৭ সালে ইসলামিক ইন্টারমিডিয়েট কলেজে রূপ নেয় এবং পর্তুগিজ ভবনেই এর কার্যক্রম পরিচালিত হতো।
ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী, ১৮৭৯ সালে তৎকালীন চট্টগ্রাম মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে ভবনসহ পাহাড়টি ৩০ হাজার টাকায় কিনে নেয়। পরবর্তীতে ভবনটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে। ১৯২৭ সালে ইসলামিক ইন্টারমিডিয়েট কলেজ প্রতিষ্ঠার পরও ভবনটি শিক্ষা কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত ছিল।
১৯৭৯ সালের ২০ জুলাই ইসলামিক ইন্টারমিডিয়েট কলেজ এবং সরকারি উচ্চ মাধ্যমিক কলেজ একীভূত হয়ে বর্তমান সরকারি হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। কলেজের নিজস্ব ওয়েবসাইটেও পর্তুগিজ ভবনে চট্টগ্রাম মাদ্রাসা ও পরবর্তী ইসলামিক ইন্টারমিডিয়েট কলেজের কার্যক্রম পরিচালনার ইতিহাস উল্লেখ রয়েছে।
পরিত্যক্ত ভবন, হারিয়ে যাওয়ার শঙ্কা
সময় গড়ানোর সঙ্গে ভবনটির অবস্থা খারাপ হতে থাকে। ২০০২ সালে ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে সেখানে একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়। বর্তমানে ভবনটিতে সাধারণ মানুষের প্রবেশ নিষিদ্ধ। হাজী মুহাম্মদ মহসিন সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটেও ভবনটিকে প্রায় ৪০০ বছরের পুরোনো এবং বর্তমানে পরিত্যক্ত হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
চট্টগ্রামের ইতিহাসের নীরব সাক্ষী
দারুল আদালতের গুরুত্ব শুধু একটি পুরোনো ভবন হিসেবে নয়। এর সঙ্গে চট্টগ্রামের বিচারব্যবস্থার প্রাথমিক ইতিহাস, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন, পর্তুগিজদের চট্টগ্রাম অধ্যায় নিয়ে প্রচলিত ইতিহাস, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিকাশ এবং নগরের স্থাপত্য ঐতিহ্য একসঙ্গে যুক্ত।
চট্টগ্রামে চকবাজার এলাকায় পাহাড়চূড়ায় নীরবে দাঁড়িয়ে থাকা দারুল আদালত শুধু ইট, চুন ও পুরোনো স্থাপত্যের সমষ্টি নয়। এর প্রতিটি দেয়াল চট্টগ্রামের অতীতের একেকটি অধ্যায়ের কথা মনে করিয়ে দেয়। তবে, নির্মাণকাল, পর্তুগিজদের ভূমিকা এবং সুড়ঙ্গের মতো কিছু তথ্যের ক্ষেত্রে লোককথা ও প্রামাণ্য ইতিহাসের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। চট্টগ্রামের নগর ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ এই স্থাপনাটি সংরক্ষণ করা গেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সামনে শহরের বিচার, শিক্ষা ও ঔপনিবেশিক ইতিহাসের একটি বাস্তব নিদর্শন তুলে ধরা সম্ভব হবে।
