ঢাকা, শুক্রবার ০২, অক্টোবর ২০২৬ ৫:২৬:১৮ এএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

আন্তর্জাতিক কফি দিবস: দেশের পাহাড়ে কফির নতুন গল্প 

উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ১০:২০ এএম, ১ অক্টোবর ২০২৬ বৃহস্পতিবার

সংগৃহীত ছবি

সংগৃহীত ছবি

সকালের ঘুম কাটাতে এক কাপ গরম কফি, কাজের ফাঁকে আড্ডা কিংবা বৃষ্টির দিনে জানালার পাশে বসে কফিতে চুমুক—অনেকের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গী হয়ে উঠেছে এই পানীয়। বিশ্বজুড়ে কফিকে ঘিরে গড়ে উঠেছে বড় অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। সেই কফির গল্প এখন আর শুধু ব্রাজিল, কলম্বিয়া, ইথিওপিয়া বা ভিয়েতনামে সীমাবদ্ধ নেই। বাংলাদেশের পাহাড়েও ধীরে ধীরে জায়গা করে নিচ্ছে কফি চাষ।


আজ ১ অক্টোবর আন্তর্জাতিক কফি দিবস। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ১ অক্টোবরকে আন্তর্জাতিক কফি দিবস হিসেবে ঘোষণা করেছে। ২০২৬ সালে জাতিসংঘের আওতায় প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে দিবসটি পালিত হচ্ছে। কফির অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্বের পাশাপাশি এর সঙ্গে যুক্ত কৃষকদের জীবন ও জীবিকার বিষয়টি সামনে আনাই দিবসটির অন্যতম উদ্দেশ্য।

এক কাপ কফি হাতে নেওয়ার আগে এর পেছনের দীর্ঘ পথের কথা অনেকেরই মনে থাকে না। কফির বীজ থেকে গাছ, গাছ থেকে ফল, এরপর ফল সংগ্রহ, বীজ আলাদা করা, শুকানো, প্রক্রিয়াজাত করা, ভাজা এবং সবশেষে কাপে পৌঁছানো পর্যন্ত অনেক মানুষের শ্রম জড়িয়ে থাকে।

আন্তর্জাতিক কফি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে প্রায় ১ কোটি ২৫ লাখ কৃষক পরিবার কফি চাষের সঙ্গে যুক্ত। ফলে কফি শুধু জনপ্রিয় একটি পানীয় নয়, বহু পরিবারের আয়েরও গুরুত্বপূর্ণ উৎস। কফি উৎপাদনের সঙ্গে ক্ষুদ্র কৃষক, গ্রামীণ জনগোষ্ঠী ও কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি সরাসরি যুক্ত।

বাংলাদেশে কফি চাষের ইতিহাসও একেবারে নতুন নয়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের একটি প্রকল্পসংক্রান্ত নথিতে বলা হয়েছে, ১৯৬১ থেকে ১৯৬২ সালের দিকে চট্টগ্রাম পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর আফ্রিকা থেকে সংগ্রহ করা কফির চারা অন্যান্য ফলের চারার সঙ্গে পাহাড়ি এলাকায় রোপণ করেছিল। তবে তখন কফি বিক্রি ও প্রক্রিয়াজাত করার পর্যাপ্ত সুযোগ না থাকায় অনেক কৃষক পরে গাছ কেটে ফেলেন।


অর্থাৎ বাংলাদেশের পাহাড়ে কফি চাষের সম্ভাবনা নতুন নয়। কিন্তু উৎপাদন, বাজারজাতকরণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও কৃষকদের প্রয়োজনীয় সহায়তার ঘাটতির কারণে দীর্ঘদিন এই সম্ভাবনা বড় আকারে কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি।

দেশের তিন পার্বত্য জেলা বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির পাহাড়ি পরিবেশ কফি চাষের জন্য সম্ভাবনাময় বলে সরকারি গবেষণা ও প্রকল্প নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব এলাকার পাহাড়ি জমি, মাটি, তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের বৈশিষ্ট্য কফি গাছের জন্য উপযোগী হতে পারে।


বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটও পাহাড়ি এলাকায় কফির বিভিন্ন জাত ও বংশগত উপাদান নিয়ে গবেষণা করছে। খাগড়াছড়ির পাহাড়ি কৃষি গবেষণা কেন্দ্রে রোবাস্তা কফির একাধিক বংশগত উপাদান নিয়ে গবেষণা হয়েছে। রাঙামাটির রাইখালী এলাকাতেও কফি নিয়ে গবেষণা চালানো হয়েছে।


কফি চাষের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে গত কয়েক বছরে পাহাড়ি এলাকার কৃষকদের মধ্যে আগ্রহ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কাজুবাদাম ও কফি গবেষণা, উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ প্রকল্পের মাধ্যমে কফি চাষের এলাকা বাড়ানো, কৃষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং উৎপাদন ও ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তি উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়।


২০২৫ সালেও রাঙামাটিতে কফি ও কাজুবাদাম চাষ সম্প্রসারণ নিয়ে কৃষি কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে রাঙামাটি সদর, নানিয়ারচর, কাপ্তাই ও কাউখালীসহ বিভিন্ন এলাকার কৃষি কর্মকর্তারা অংশ নেন। বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির বিভিন্ন এলাকাতেও কৃষি সহায়তা কার্যক্রম রয়েছে।

বিশ্বে কফির অনেক জাত থাকলেও আরবিকা ও রোবাস্তা সবচেয়ে পরিচিত দুই ধরনের কফি। বাংলাদেশেও এই দুই ধরনের কফি নিয়ে গবেষণা চলছে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণায় খাগড়াছড়ির পাহাড়ি কৃষি গবেষণা কেন্দ্রে আরবিকা ও রোবাস্তা উভয় ধরনের কফির বংশগত উপাদান নিয়ে কাজের তথ্য পাওয়া যায়।


গবেষণার মাধ্যমে বাংলাদেশের মাটি ও আবহাওয়ার সঙ্গে কোন ধরনের কফি বেশি মানানসই, কোন জাত থেকে ভালো ফলন পাওয়া যেতে পারে এবং কীভাবে রোগবালাই ও অন্যান্য সমস্যা মোকাবিলা করা যায়, তা খুঁজে দেখা হচ্ছে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের একটি নথিতে বলা হয়েছে, দেশে ইতোমধ্যে রোবাস্তা ধরনের একটি কফির জাত ‘বারি কফি-১’ নামে অবমুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি আরবিকা ধরনের আরেকটি জাত নিয়েও কাজ চলছে।


তবে কফি চাষের সম্ভাবনা থাকলেই বড় উৎপাদন সম্ভব নয়। কফি গাছের পরিচর্যা, ছায়া ব্যবস্থাপনা, পানি, সার, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ এবং সঠিক সময়ে ফল সংগ্রহের মতো বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ। গবেষণায় কফি চাষে সঠিক দূরত্ব বজায় রাখা, সেচ ও সার ব্যবস্থাপনা এবং পর্যাপ্ত ছায়ার প্রয়োজনীয়তার কথা উঠে এসেছে।

পাহাড়ি জমির ঢাল, মাটিক্ষয় ও পানির ব্যবস্থাপনাও গুরুত্বপূর্ণ। পার্বত্য অঞ্চলে ঢালু জমি, ভারী বৃষ্টিতে মাটিক্ষয়, মাটির অম্লতা ও সেচের সীমাবদ্ধতার মতো সমস্যা রয়েছে। তাই এই এলাকায় টেকসই কৃষি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত না করলে দীর্ঘমেয়াদে ভালো ফলন পাওয়া কঠিন হতে পারে।


বাংলাদেশের কফির বাজার এখনো মূলত আমদানিনির্ভর। মানুষের কফি পানের অভ্যাস বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এর চাহিদাও বাড়ছে। ফলে দেশের পাহাড়ি এলাকায় কফি উৎপাদন বাড়ানো গেলে স্থানীয় কৃষকদের জন্য নতুন আয়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে পাহাড়ি কৃষিতেও আসতে পারে বৈচিত্র্য।


তবে উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি কৃষকের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করা, ভালো মানের চারা সরবরাহ, প্রক্রিয়াজাতকরণের সুযোগ তৈরি এবং বাজারের সঙ্গে কৃষকদের সংযোগ বাড়ানো জরুরি। কারণ শুধু কফি উৎপাদন করলেই হবে না, সেই কফিকে সঠিকভাবে প্রক্রিয়াজাত করে বাজারে পৌঁছে দিতে পারলেই কৃষক প্রকৃত অর্থে লাভবান হবেন।

একসময় বাংলাদেশের পাহাড়ে কফির চারা লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া হলেও পর্যাপ্ত বাজার ও প্রক্রিয়াজাতকরণের সুযোগের অভাবে তা বড় পরিসরে এগোয়নি। কয়েক দশক পর আবার সেই কফিকে ঘিরে নতুন করে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।


আন্তর্জাতিক কফি দিবসে তাই কফির কাপের পাশাপাশি সেই কাপের পেছনে থাকা কৃষকের কথাও সামনে আসছে। বাংলাদেশের পাহাড়ি কৃষকেরা যদি কফি চাষ থেকে স্থায়ী আয় ও ভালো বাজার পান, তাহলে দেশের কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে এই কফি।