অপরাধে রাজনৈতিক পরিচয় ঢাল হতে পারে না
দীপালি হাসান
উইমেননিউজ২৪
প্রকাশিত : ০২:১০ পিএম, ২ অক্টোবর ২০২৬ শুক্রবার
প্রতীকী ছবি।
রাজনীতিতে ক্ষমতা যত বড়, জবাবদিহির দায়ও তত বড়। সেই জায়গা থেকেই মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়ার ঘটনা গুরুত্বপূর্ণ। প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশে মিষ্টি শেষ পর্যন্ত সংসদ সদস্যের পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন।
রাড্ডার ঘটনাটি কোনো সাধারণ রাজনৈতিক বিরোধের ঘটনা নয়। একটি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান গুঁড়িয়ে দেওয়া, সেখানে হামলা-ভাঙচুর ও মালামাল লুটের অভিযোগ উঠেছে। যে প্রতিষ্ঠানে মা ও শিশুরা চিকিৎসাসেবা পেতেন, এমন একটি স্থাপনা রাজনৈতিক প্রভাব কিংবা দখলসংক্রান্ত বিরোধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার অভিঘাত শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের ওপর পড়ে না; ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ মানুষের অধিকারও। প্রতিবেদনে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কথাও উঠে এসেছে।
এখানেই মিষ্টির রাজনৈতিক ও নৈতিক দায়ের প্রশ্নটি সামনে আসে। তাঁর বিরুদ্ধে সরাসরি অপরাধের চূড়ান্ত দায় আদালতে নির্ধারিত হয়নি—এ কথাটিও মনে রাখতে হবে। তিনি হামলার সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। কিন্তু একজন সংসদ সদস্যকে ঘিরে যখন এমন গুরুতর অভিযোগ ওঠে এবং তদন্তে তাঁর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়, তখন রাজনৈতিক দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকে না।
আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হলো—দলীয় পরিচয়কে অনেক সময় ব্যক্তিগত দায় এড়ানোর ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা। ক্ষমতাসীন দলের নেতা কিংবা সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই তাঁর চারপাশে এমন একটি বলয় তৈরি হয়, যেখানে তদন্তের আগেই তাঁকে রক্ষা করার চেষ্টা শুরু হয়। এই সংস্কৃতি গণতন্ত্রের জন্য বিপজ্জনক।
সেই জায়গায় মিষ্টিকে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়ার সিদ্ধান্ত অন্তত একটি রাজনৈতিক বার্তা সামনে এনেছে—দলের পরিচয় কোনো অভিযোগের তদন্তকে থামিয়ে দেওয়ার কারণ হতে পারে না। রাড্ডার ঘটনায় ইতিমধ্যে বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের কয়েকটি কমিটি বিলুপ্ত এবং বেশ কয়েকজন নেতাকর্মীকে বহিষ্কারের খবরও এসেছে।
তবে এখানেই দায়িত্ব শেষ নয়।
পদত্যাগ কোনো অপরাধের আইনি নিষ্পত্তি নয়। রাজনৈতিক পদ ছেড়ে দেওয়া আর আইনের কাছে দায়বদ্ধ হওয়া এক বিষয় নয়। তদন্তে যার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ প্রমাণিত হবে, তাঁর বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে—তিনি এমপি হোন, দলের নেতা হোন কিংবা সাধারণ কর্মী হোন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও বলেছেন, তদন্তে সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।
একই সঙ্গে মিষ্টির ক্ষেত্রেও ন্যায়বিচারের স্বাভাবিক নীতি বজায় রাখতে হবে। অভিযোগ গুরুতর বলেই তদন্তের প্রয়োজন; আর তদন্তের ফলাফলের ভিত্তিতেই আইনি দায় নির্ধারিত হওয়া উচিত। রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং বিচারিক সিদ্ধান্তকে এক করে দেখা যাবে না।
তারেক রহমানের জন্যও এই ঘটনাটি একটি বড় রাজনৈতিক পরীক্ষার জায়গা তৈরি করেছে। দলের নেতাকর্মীরা যদি বুঝতে পারেন যে ক্ষমতার কাছাকাছি থাকলেই অভিযোগ থেকে রেহাই পাওয়া যাবে না, তাহলে রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে জবাবদিহির একটি নতুন চর্চা তৈরি হতে পারে। কিন্তু সেই বার্তা তখনই বিশ্বাসযোগ্য হবে, যখন তা শুধু একজন এমপির ক্ষেত্রে নয়—অভিযোগের ধরন ও ব্যক্তির রাজনৈতিক অবস্থান নির্বিশেষে সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রয়োগ হবে।
রাজনীতি জনগণের সেবা করার জায়গা, ব্যক্তিগত প্রভাব বিস্তার কিংবা রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও প্রতিষ্ঠানের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জায়গা নয়। বিশেষ করে একজন সংসদ সদস্যের কাছ থেকে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা আরও বেশি। কারণ তাঁর হাতে শুধু একটি দলীয় পদ থাকে না, জনগণের প্রতিনিধিত্বের সাংবিধানিক দায়িত্বও থাকে।
তাই রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ঘটনা থেকে সবচেয়ে বড় শিক্ষা হওয়া উচিত একটাই—রাজনৈতিক পরিচয় কোনো অপরাধের ঢাল হতে পারে না।
আর পদত্যাগের পরবর্তী ধাপ হলো স্বচ্ছ তদন্ত, আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং ক্ষতিগ্রস্ত স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির পুনর্গঠন। জনগণ শুধু রাজনৈতিক শাস্তি দেখতে চায় না; তারা দেখতে চায় আইনের শাসন বাস্তবে কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
ক্ষমতাসীন দলের একজন সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ সেই জবাবদিহির পরীক্ষার একটি অংশ মাত্র। এখন দেখার বিষয়, এই কঠোরতার নীতি কি সত্যিই সবার জন্য সমান থাকে।
