ডিমের ডজন ১৭০! যাবে কোথায় হতাশ ক্রেতারা
নিজস্ব প্রতিবেদক
উইমেননিউজ২৪
প্রকাশিত : ১১:০১ এএম, ৯ অক্টোবর ২০২৬ শুক্রবার
ছবি: সংগ্রহিত।
নিত্যপণ্যের বাজারে স্বস্তি নেই। চাল, ডাল, তেল, সবজি—কোনো না কোনো পণ্যের বাড়তি দাম সামলাতে যখন হিমশিম খাচ্ছেন সাধারণ মানুষ, তখন ডিমের ডজন ১৭০ টাকা হওয়ায় নতুন করে চাপে পড়েছেন ক্রেতারা। স্বল্প আয়ের মানুষের কাছে ডিম ছিল তুলনামূলক সস্তায় আমিষের চাহিদা পূরণের অন্যতম ভরসা। সেই ডিমের দামও নাগালের বাইরে চলে গেলে সাধারণ মানুষ যাবে কোথায়?
একসময় ডিমকে দরিদ্র ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের পুষ্টির সহজলভ্য উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হতো। মাছ-মাংসের দাম বেশি হলে অনেক পরিবার ডিমের ওপর নির্ভর করত। কিন্তু ডজনপ্রতি ১৭০ টাকা দরে ডিম কিনতে হলে চার সদস্যের একটি পরিবারকেও হিসাব কষতে হচ্ছে। প্রতিদিন একটি করে ডিম খাওয়ার অভ্যাস থাকলে মাসে শুধু ডিম কিনতেই উল্লেখযোগ্য অর্থ ব্যয় হবে। অথচ নিম্ন আয়ের বহু পরিবারের মাসিক আয় বাড়েনি সেই অনুপাতে।
প্রশ্ন হচ্ছে, ডিমের মতো একটি নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার দায় নেবে কে? উৎপাদন খরচ, খাদ্য, পরিবহন ও বিপণন ব্যয়ের অজুহাত দেখিয়ে দাম বাড়ানো হলে তার যৌক্তিকতা যাচাই করবে কোন কর্তৃপক্ষ? বাজারে দাম বাড়লেই কি ভোক্তাদের নীরবে বাড়তি টাকা গুনে যেতে হবে?
দেশে নিত্যপণ্যের বাজারে মূল্যবৃদ্ধির চাপ নতুন নয়। কিন্তু বারবার একই পরিস্থিতি তৈরি হলেও বাজার ব্যবস্থাপনায় কার্যকর পরিবর্তন কতটা এসেছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বাজারে অভিযান চালানো, ব্যবসায়ীদের সতর্ক করা কিংবা দাম নিয়ন্ত্রণের আশ্বাস দেওয়ার বাইরে সাধারণ মানুষ বাস্তবে কতটা সুফল পাচ্ছেন, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
ডিমের দাম বৃদ্ধির প্রভাব শুধু পরিবারের ব্যয়ের হিসাবেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি মানুষের পুষ্টির অধিকারেও আঘাত হানে। যেসব পরিবার নিয়মিত মাছ-মাংস কিনতে পারে না, তাদের জন্য ডিমের দাম বেড়ে যাওয়া মানে খাদ্যতালিকা থেকে প্রয়োজনীয় আমিষ কমিয়ে দেওয়া। বিশেষ করে শিশুদের পুষ্টির বিষয়টি এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারের আয় সীমিত হলে অভিভাবকেরা বাধ্য হয়ে খাবারের পরিমাণ বা ধরন কমান। এভাবে বাজারের অনিয়ন্ত্রিত চাপ শেষ পর্যন্ত মানুষের জীবনযাত্রার মানকেই নিচে নামিয়ে দেয়।
এ অবস্থায় শুধু ব্যবসায়ীদের ওপর দায় চাপিয়ে দায়িত্ব শেষ করার সুযোগ নেই। উৎপাদন থেকে খুচরা বিক্রি পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে প্রকৃত খরচ, সরবরাহ ও মুনাফার হিসাব খতিয়ে দেখতে হবে। কোথাও কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হচ্ছে কি না, অযৌক্তিক মুনাফা নেওয়া হচ্ছে কি না এবং পাইকারি ও খুচরা দামের ব্যবধান অস্বাভাবিক কি না, তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে। বাজার তদারকির দায়িত্বে থাকা সংস্থাগুলোকে লোকদেখানো তৎপরতা নয়, কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
একই সঙ্গে ডিম উৎপাদনকারী খামারিদের প্রকৃত সমস্যাও চিহ্নিত করা জরুরি। উৎপাদন ব্যয় বেড়ে থাকলে তার কারণ নির্ণয় করে সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে। আবার সেই অজুহাতে ভোক্তার ওপর ইচ্ছেমতো বাড়তি দাম চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগও রাখা যাবে না। উৎপাদক ও ভোক্তা—উভয়ের স্বার্থ রক্ষা করে স্বচ্ছ বাজারব্যবস্থা গড়ে তোলাই হওয়া উচিত সরকারের লক্ষ্য।
সবচেয়ে বড় কথা, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বিষয়টি নীতিনির্ধারকদের গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। বাজারে পণ্য থাকলেই মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না; সেই পণ্য কেনার সামর্থ্যও থাকতে হয়।
ডিমের ডজন ১৭০ টাকা—এটি শুধু একটি পণ্যের দাম নয়, সাধারণ মানুষের ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয়েরও একটি সতর্কসংকেত। বাজারের এই চাপ যদি কার্যকরভাবে সামাল দেওয়া না যায়, তাহলে নিম্ন আয়ের মানুষের পুষ্টি ও জীবনমান আরও সংকুচিত হবে। তাই প্রশ্নটি এখন আর শুধু ডিমের দাম নিয়ে নয়; প্রশ্ন হলো, সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাবার রাখার দায়িত্ব রাষ্ট্র কতটা পালন করছে?
ক্রেতারা আর কত চাপ সামলাবেন? পকেটের অবস্থা বিবেচনা না করে বাজার চলতে পারে, কিন্তু মানুষের জীবন চলে না।
