কিশোরদের কাছেও অ্যান কার্সনের অন্য এক জগৎ
অনু সরকার
উইমেননিউজ২৪
প্রকাশিত : ১২:৩৫ পিএম, ৯ অক্টোবর ২০২৬ শুক্রবার
অ্যান কার্সন
অ্যান কার্সন মূলত শিশু-কিশোরদের জন্য লেখেননি। তার সাহিত্যজগৎ গড়ে উঠেছে প্রাচীন গ্রিক পুরাণ, কবিতা, প্রেম, বিচ্ছেদ, যুদ্ধ, শোক ও মানুষের গভীর অন্তর্জগতকে ঘিরে। তবু তার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ কিশোর পাঠকের সামনে খুলে দিতে পারে এক আশ্চর্য দরজা—যে দরজা দিয়ে প্রাচীন গ্রিসের পুরাণ ঢুকে পড়ে আধুনিক জীবনের গল্পে।
বিশেষ করে Autobiography of Red এবং The Trojan Women: A Comic—এই দুটি কাজ কিশোর পাঠকের জন্য আলাদা করে আগ্রহের হতে পারে।
ডানাওয়ালা এক কিশোরের গল্প
Autobiography of Red অ্যান কার্সনের সবচেয়ে আলোচিত বইগুলোর একটি। ১৯৯৮ সালে প্রকাশিত এই বইটির কেন্দ্রীয় চরিত্র গেরিয়ন—গ্রিক পুরাণের এক লাল রঙের, ডানাওয়ালা দানব।
কিন্তু কার্সনের গেরিয়ন কোনো দূর অতীতের পৌরাণিক দানব হয়ে থাকে না। সে হয়ে ওঠে আধুনিক সময়ের এক কিশোর। তার আছে একাকিত্ব, ভয়, ভালোবাসা, বন্ধুত্ব, অপমান এবং নিজের পরিচয় খুঁজে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা।
গেরিয়ন ছবি তোলে। সে নিজের অনুভূতিগুলো বোঝার চেষ্টা করে। ভালোবাসে এবং ভালোবাসার আঘাতও পায়। তার জীবনে আসে হেরাক্লিস—গ্রিক পুরাণের সেই শক্তিশালী বীর, কিন্তু কার্সনের গল্পে হেরাক্লিসও শুধু পৌরাণিক নায়ক নন; তিনি হয়ে ওঠেন একজন মানুষ, যার সঙ্গে গেরিয়নের জটিল সম্পর্ক তৈরি হয়।
সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হলো, কার্সন এখানে পুরাণকে কেবল পুনরায় বলেননি। তিনি পুরাণের একটি চরিত্রকে তুলে এনে তার ভেতরে বসিয়ে দিয়েছেন আধুনিক এক কিশোরের মন।
তাই গেরিয়নের গল্প পড়তে গিয়ে কিশোর পাঠক হয়তো ভাবতে পারে—পৃথিবী থেকে হাজার বছর দূরে থাকা একটি পৌরাণিক চরিত্রও কি আমার মতো একা হতে পারে? সে কি আমার মতো কাউকে ভালোবাসতে পারে? নিজের পরিচয় নিয়ে দ্বিধায় ভুগতে পারে?
কার্সনের উত্তর—পারে।
এ কারণেই Autobiography of Red শিশুদের বই না হলেও কিশোর পাঠকের জন্য একটি ব্যতিক্রমী পাঠ হতে পারে।
ট্রয়ের নারীরা যখন কমিকের চরিত্র
অ্যান কার্সনের আরেকটি অভিনব কাজ The Trojan Women: A Comic। শিল্পী রোসানা ব্রুনোর সঙ্গে ২০২১ সালে তৈরি এই গ্রাফিক বইটি প্রাচীন গ্রিক নাট্যকার ইউরিপিদিসের বিখ্যাত ট্র্যাজেডি The Trojan Women–এর নতুন রূপ।
ট্রয় যুদ্ধ শেষ হয়েছে। শহর ধ্বংস। পুরুষেরা নিহত। বিজয়ীরা এখন ঠিক করছে পরাজিত নারীদের ভাগ্য। কারও স্বামী নেই, কারও সন্তান নেই, কারও ঘর নেই। যুদ্ধের বিজয়-পরাজয়ের হিসাবের বাইরে পড়ে থাকা এই নারীদের কান্নাই ইউরিপিদিসের নাটকের মূল সুর।
কার্সন ও ব্রুনো সেই পুরোনো ট্র্যাজেডিকে নিয়ে তৈরি করেছেন এক অদ্ভুত, কখনো হাস্যরসাত্মক, কখনো ভয়াবহ গ্রাফিক জগৎ। মানুষের চরিত্রগুলোর অনেককেই তারা প্রাণীর অবয়বে এঁকেছেন। ট্রয়ের রানি হেকাবে যেমন হয়ে উঠেছেন একটি কুকুর। অ্যান্ড্রোমাকিকে দেখা যায় গাছের রূপে; তার সন্তানকে বোঝাতে ব্যবহার করা হয়েছে একটি ছোট ডাল।
দেখতে কমিকের মতো হলেও বিষয়টি মোটেই শিশুসুলভ নয়। যুদ্ধ, হত্যা, দাসত্ব, সন্তান হারানো এবং নারীর ওপর যুদ্ধের নির্মমতার মতো কঠিন বিষয় এখানে রয়েছে। তাই বইটিকে ছোটদের বই বলা ঠিক হবে না।
তবে কিশোর পাঠকের জন্য এর গুরুত্ব অন্য জায়গায়।
ছবি ও কথার মিশ্রণে প্রাচীন একটি যুদ্ধের গল্পকে নতুন করে দেখার সুযোগ তৈরি হয়। ইতিহাসের বইয়ে যে যুদ্ধ শুধু তারিখ, রাজা আর যুদ্ধক্ষেত্রের নাম হয়ে থাকে, কার্সনের কাজে সেই যুদ্ধ এসে দাঁড়ায় একজন মায়ের সামনে—যে তার সন্তান হারিয়েছে; একজন নারীর সামনে—যে তার স্বামী হারিয়েছে; একজন মানুষের সামনে—যার পুরো পৃথিবী ধ্বংস হয়ে গেছে।
পুরাণ থেকে নিজের গল্প
অ্যান কার্সনের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব সম্ভবত এখানেই। তিনি কিশোরদের জন্য আলাদা করে গল্প না লিখেও কিশোর পাঠকের কাছে পৌঁছানোর মতো কিছু চরিত্র ও প্রশ্ন তৈরি করেছেন।
তার গেরিয়ন একজন পৌরাণিক চরিত্র, কিন্তু তার একাকিত্ব আধুনিক।
তার হেলেন প্রাচীন গ্রিসের নারী, কিন্তু সৌন্দর্য ও খ্যাতির যে চাপ তাকে ঘিরে থাকে, তা আজকের পৃথিবীতেও অচেনা নয়।
তার ট্রয়ের নারীরা হাজার হাজার বছর আগের যুদ্ধের শিকার, কিন্তু তাদের কান্না আজকের যুদ্ধবিধ্বস্ত পৃথিবীর মানুষের কান্নার মতোই।
অ্যান কার্সন তাই তরুণ পাঠককে শুধু গল্প বলেন না; তিনি তাকে প্রশ্ন করতে শেখান।
পুরাণ কি শুধু পুরোনো গল্প?
হাজার বছর আগের মানুষের দুঃখ কি আজও আমাদের স্পর্শ করতে পারে?
একজন পৌরাণিক দানবের একাকিত্ব কি একজন কিশোরের একাকিত্বের মতো হতে পারে?
যুদ্ধের জয় কি সত্যিই জয়, যদি তার পরে অসংখ্য মানুষের ঘর, পরিবার ও স্বপ্ন ধ্বংস হয়ে যায়?
এই প্রশ্নগুলোর মধ্য দিয়েই অ্যান কার্সনের সাহিত্য কিশোর পাঠকের কাছে নতুন অর্থ পেতে পারে।
শিশুতোষ নয়, কিন্তু কিশোরদের জন্য দরজা খুলে দেয়
অ্যান কার্সনের বইকে সরাসরি ‘শিশু সাহিত্য’ বললে ভুল হবে। তার অধিকাংশ কাজই প্রাপ্তবয়স্ক পাঠকের জন্য এবং অনেক বইয়ের বিষয়বস্তু জটিল ও গভীর।
কিন্তু তার সাহিত্য থেকে কিশোর পাঠকের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা নেওয়া যায়—পুরোনো গল্পকে নতুন করে বলা যায়।
একটি প্রাচীন গ্রিক পুরাণকে আধুনিক কিশোরের গল্পে পরিণত করা যায়। হাজার বছরের পুরোনো ট্র্যাজেডিকে ছবি ও কমিকের ভাষায় নতুন প্রজন্মের সামনে হাজির করা যায়। আর সবচেয়ে বড় কথা, ইতিহাস ও পুরাণের চরিত্রদের এমনভাবে দেখা যায়, যেন তারা আমাদেরই পরিচিত মানুষ।
এই জায়গাটিতেই অ্যান কার্সন শিশু-কিশোর সাহিত্যের কাছাকাছি এসে দাঁড়ান—শিশুদের জন্য লিখে নয়, নতুন প্রজন্মের পাঠককে পুরোনো সাহিত্যের সঙ্গে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে।
আর হয়তো এটাই তার সাহিত্যিক জগতের সবচেয়ে সুন্দর দিক—প্রাচীন গ্রিসের ধ্বংসস্তূপ থেকে তিনি তুলে আনেন এমন কিছু গল্প, যেগুলো আজও একজন কিশোরের হৃদয়ে গিয়ে বলতে পারে, ‘তোমার একাকিত্ব তুমি একা বয়ে বেড়াচ্ছ না।’
