ঢাকা, শনিবার ১০, অক্টোবর ২০২৬ ৫:২৬:৫৬ এএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

বিশ্ব ডাক দিবস আজ, হারিয়ে গেছে চিঠি

জোসেফ সরকার

উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ১২:৪৩ পিএম, ৯ অক্টোবর ২০২৬ শুক্রবার

প্রতীকী ছবি।

প্রতীকী ছবি।

একসময় ডাকপিয়নের সাইকেলের ঘণ্টা শুনলেই বুকের ভেতর কেঁপে উঠত আনন্দ। চিঠির খামে লেগে থাকত প্রিয় মানুষের হাতের ছোঁয়া, দূরদেশের গন্ধ আর অপেক্ষার গল্প। সেই চিঠি এখন প্রায় হারিয়ে গেছে। তার জায়গা নিয়েছে মুঠোফোনের ক্ষুদে বার্তা, ই-মেইল আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দ্রুত যোগাযোগ। তবু চিঠির আবেদন কি ফুরিয়েছে? বিশ্ব ডাক দিবসে ফিরে দেখা যাক চিঠির সেই মায়াময় দিনগুলো।

আজ ৯ অক্টোবর, বিশ্ব ডাক দিবস। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে পালিত হচ্ছে দিবসটি। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য—‘সমন্বিত ডাক নেটওয়ার্ক, সীমাহীন সম্ভাবনা’। আধুনিক প্রযুক্তি ও বিস্তৃত নেটওয়ার্ক কাজে লাগিয়ে ডাকসেবাকে আরও দ্রুত, সাশ্রয়ী ও জনবান্ধব করে তোলার প্রত্যয়ে আজ থেকে শুরু হয়েছে ডাকসেবা সপ্তাহ।

শুক্রবার সকালে রাজধানীর আগারগাঁওয়ের ডাক ভবনে ডাক অধিদপ্তরের উদ্যোগে এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। ডাক অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কাজী আসাদুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের সচিব বিলকিস জাহান রিমি।

বিশ্ব ডাক দিবস উপলক্ষে আজ ও আগামীকাল ডাক বিভাগের সব পর্যায়ের কার্যালয়ে সঞ্চয় ব্যাংক কার্যক্রম ছাড়া সাধারণ ডাকসেবা চালু রাখা হয়েছে। ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত চলবে ডাকসেবা সপ্তাহ। এ উপলক্ষে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে বিশেষ চিঠি উৎসবের আয়োজন করা হয়েছে। দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়েও অনুষ্ঠিত হচ্ছে চিঠি উৎসব, ডাকটিকিট প্রদর্শনী ও ডাকসেবাবিষয়ক মেলা।

ডাক বিভাগের এসব আয়োজনের লক্ষ্য আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় মানুষের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দেওয়া। কিন্তু প্রযুক্তির এই দ্রুতগতির সময়ে চিঠি নিয়ে মানুষের পুরোনো আবেগ, স্মৃতি আর অপেক্ষার গল্পগুলোও যেন নতুন করে মনে করিয়ে দেয় বিশ্ব ডাক দিবস।

চিঠির জন্য অপেক্ষার দিন

একসময় ডাকপিয়ন ছিলেন প্রতিটি পাড়া-মহল্লার পরিচিত মুখ। কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে কিংবা সাইকেল চালিয়ে তিনি যখন গলিতে ঢুকতেন, অনেক বাড়ির মানুষই উৎকর্ণ হয়ে থাকত। কারও ছেলে বিদেশে থাকে, কারও স্বামী দূরের শহরে চাকরি করেন, কারও মেয়ে বিয়ের পর অন্য জেলায়। সেই দূরত্ব ঘুচিয়ে দেওয়ার একমাত্র ভরসা ছিল চিঠি।

ডাকপিয়নের হাতে নিজের নামে একটি খাম দেখলে কত মানুষের মুখে যে হাসি ফুটত! আবার দিনের পর দিন চিঠি না এলে বুকের মধ্যে জমত দুশ্চিন্তা। ডাকঘরের সামনে, বাড়ির উঠানে কিংবা জানালার পাশে অপেক্ষা—সবকিছুর সঙ্গে মিশে ছিল প্রিয়জনের খবর পাওয়ার আকুলতা।

চিঠি শুধু খবর বহন করত না; বহন করত মানুষের অনুভূতি। নীল খামে লেখা প্রেমপত্র, মায়ের কাছে সন্তানের চিঠি, দূরদেশে থাকা বাবার লেখা কয়েকটি লাইন, বন্ধুর কাছে বন্ধুর অভিমান কিংবা পরীক্ষার ফল জানিয়ে বাড়িতে পাঠানো আনন্দের সংবাদ—প্রতিটি চিঠির ছিল আলাদা গল্প।

কখনো একটি চিঠি বারবার পড়া হতো। ভাঁজ করে রাখা হতো বইয়ের পাতায়, আলমারির ড্রয়ারে কিংবা পুরোনো বাক্সে। বহু বছর পর সেই চিঠি হাতে নিলে আবার ফিরে আসত ফেলে আসা দিন, হারিয়ে যাওয়া মানুষ আর জীবনের কোনো এক মায়াময় সময়।

চিঠি হারিয়েছে, অপেক্ষাও কি?

মুঠোফোনের একটি বার্তা এখন মুহূর্তেই পৌঁছে যায় পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। ভিডিও কলে দেখা যায় প্রিয় মানুষের মুখ। ই-মেইলে পাঠানো যায় জরুরি কাগজপত্র। প্রযুক্তি যোগাযোগকে সহজ করেছে, সময় ও দূরত্বকে অনেকটাই ছোট করে এনেছে।

তবু চিঠির সঙ্গে এই যোগাযোগের একটি মৌলিক পার্থক্য আছে। চিঠি লেখার জন্য মানুষকে সময় নিয়ে বসতে হতো। ভাবতে হতো কী লিখবে, কোন কথাটি আগে বলবে, কোন অনুভূতিটি শব্দের মধ্যে ধরে রাখবে। হাতের লেখায় ধরা পড়ত মনের অবস্থাও। কোথাও অক্ষর কেঁপে উঠত, কোথাও কালির দাগ ছড়িয়ে যেত, কোথাও একটি বাক্যের পর দীর্ঘ বিরতি জানিয়ে দিত না-বলা কথার উপস্থিতি।

আজকের দ্রুত যোগাযোগের যুগে সেই দীর্ঘ অপেক্ষা অনেকটাই হারিয়ে গেছে। হারিয়ে গেছে চিঠির খাম খোলার উত্তেজনা, পরিচিত হাতের লেখা দেখার আনন্দ, ডাকটিকিট জমিয়ে রাখার শখ আর ডাকপিয়নের জন্য পথ চেয়ে থাকার দিনগুলো।

তবে চিঠি একেবারেই অপ্রয়োজনীয় হয়ে যায়নি। ব্যক্তিগত চিঠির পাশাপাশি সরকারি নথি, বাণিজ্যিক যোগাযোগ, পার্সেল ও পণ্য পরিবহনে ডাকব্যবস্থার গুরুত্ব এখনো রয়েছে। বিশেষ করে বিস্তৃত ডাক নেটওয়ার্ককে কাজে লাগিয়ে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও সেবা পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ আছে।

ডাকব্যবস্থার সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশ ডাক বিভাগ এখন ঐতিহ্যবাহী ডাকসেবার পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর, দক্ষ ও জনবান্ধব লজিস্টিকস সেবা প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের লক্ষ্যে কাজ করছে। পরিবর্তিত সময়ে এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ। অনলাইন কেনাকাটা, পণ্য পরিবহন, নথি আদান-প্রদান এবং ডিজিটাল সেবার বিস্তারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ডাকব্যবস্থাকেও আধুনিক হতে হবে।

তবে আধুনিকায়ন মানে শুধু দ্রুত পণ্য পৌঁছে দেওয়া নয়। সেবার মান, নির্ভরযোগ্যতা, সাশ্রয়ী খরচ এবং গ্রাহকের আস্থা নিশ্চিত করাও জরুরি। শহর থেকে প্রত্যন্ত গ্রাম—সব জায়গায় মানুষের প্রয়োজন অনুযায়ী ডাকসেবা পৌঁছে দিতে পারলেই এই প্রতিষ্ঠান নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলতে পারবে।

বিশ্ব ডাক দিবসের ইতিহাসও সেই যোগাযোগের বিস্তৃত স্বপ্নের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। ১৮৭৪ সালের ৯ অক্টোবর ইউনিভার্সাল পোস্টাল ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠিত হয়। আন্তর্জাতিক ডাকব্যবস্থাকে সুসংহত করার এই ঐতিহাসিক দিনটির স্মরণে ১৯৬৯ সালে টোকিওতে অনুষ্ঠিত ইউনিয়নের কংগ্রেসে ৯ অক্টোবরকে বিশ্ব ডাক দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এরপর থেকে বিশ্বজুড়ে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে।

আবার কি লেখা হবে চিঠি?

আজকের শিশুরা হয়তো ডাকপিয়নের জন্য অপেক্ষা করার অভিজ্ঞতা জানে না। তাদের কাছে দূরের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ মানে মুঠোফোনের পর্দায় ভেসে ওঠা নাম, কয়েকটি শব্দ কিংবা একটি ছবি। চিঠির খাম খুলে পড়ার আনন্দ তাদের অনেকের কাছেই অচেনা।

তবু চিঠির আবেদন নতুন করে ফিরিয়ে আনা অসম্ভব নয়। স্কুলে চিঠি লেখার আয়োজন, বন্ধুদের হাতে লেখা চিঠি বিনিময়, মা-বাবা কিংবা দাদা-দাদিকে চিঠি লেখা—এমন ছোট ছোট উদ্যোগ নতুন প্রজন্মকে শব্দের সঙ্গে, স্মৃতির সঙ্গে এবং অনুভূতি প্রকাশের সঙ্গে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দিতে পারে।

বিশ্ব ডাক দিবসে তাই ডাকব্যবস্থার আধুনিকায়নের পাশাপাশি চিঠির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের কথাও ভাবা প্রয়োজন। কারণ ডাকব্যবস্থা কেবল কাগজ কিংবা পণ্য বহন করে না; মানুষের সম্পর্ক, স্মৃতি ও যোগাযোগের ইতিহাসও বহন করে।

একদিন হয়তো পুরোনো কোনো বাক্স খুলতে গিয়ে পাওয়া যাবে হলদে হয়ে যাওয়া একটি চিঠি। কাঁপা হাতে লেখা কয়েকটি বাক্য, খামের ওপর পরিচিত ঠিকানা, কোণে লাগানো বিবর্ণ ডাকটিকিট। চিঠিটি পড়তে পড়তে মনে হবে, সময় চলে গেছে, মানুষ বদলে গেছে, কিন্তু কিছু অনুভূতি এখনো অক্ষত।

প্রযুক্তি আমাদের দ্রুত যোগাযোগ করতে শিখিয়েছে। চিঠি শিখিয়েছিল মনের কথা সময় নিয়ে বলতে।

বিশ্ব ডাক দিবসে সেই পুরোনো শিক্ষাটিও মনে রাখা যাক।