ঢাকা, শনিবার ১০, অক্টোবর ২০২৬ ৫:২৭:৫২ এএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

পর্যটককে নিরাপত্তা দিতে পারি না, পর্যটন নিয়ে বড়াই কেন?

দীপালি হাসান

উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ০৩:০৯ পিএম, ৯ অক্টোবর ২০২৬ শুক্রবার

ছবি: সংগ্রহিত।

ছবি: সংগ্রহিত।

নাটোরে জার্মান পর্যটকের ব্যাগ চুরির ঘটনা দেশের পর্যটন নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। পর্যটনের অপার সম্ভাবনার কথা বলে লাভ কী, যদি একজন বিদেশি পর্যটককেও নিরাপদে চলাফেরার নিশ্চয়তা দিতে না পারি?

বাংলাদেশের পর্যটন নিয়ে আমাদের আশাবাদের শেষ নেই। পাহাড়, সমুদ্র, বন, নদী, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, ঐতিহাসিক স্থাপনা—কী নেই এ দেশে! বিশ্বদরবারে বাংলাদেশের সৌন্দর্য তুলে ধরার কথা বলা হয়, পর্যটন খাতকে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন ও কর্মসংস্থানের সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হিসেবে তুলে ধরা হয়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার মতো নিরাপদ ও দায়িত্বশীল পরিবেশ কি আমরা তৈরি করতে পেরেছি?

নাটোর রেলস্টেশনে জার্মান পর্যটক ক্রিল ল্যান্ডারের ল্যাপটপ, ক্যামেরা ও গুরুত্বপূর্ণ জিনিসপত্রসহ ব্যাগ চুরির ঘটনা সেই প্রশ্নটিই সামনে এনেছে। ঐতিহাসিক স্থাপনা দেখতে বাংলাদেশে এসেছিলেন এই তরুণ। ভ্রমণের পথে নাটোর রেলস্টেশনে অপেক্ষা করার সময় এক ব্যক্তির কথায় বিশ্বাস করে নিজের ব্যাগ হারান তিনি। সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, টিকিট করে দেওয়ার কথা বলে ওই ব্যক্তি তার সঙ্গে কথা বলেন এবং একপর্যায়ে ব্যাগ নিয়ে চলে যান। ঘটনাটি পুলিশকে জানানোর পর তদন্ত ও উদ্ধার অভিযান শুরু হয়। সিসিটিভি ফুটেজ দেখে একজনকে শনাক্ত করার কথাও জানিয়েছে পুলিশ।

এখানে শুধু একটি ব্যাগ চুরির হিসাব করলে ভুল হবে। ওই ব্যাগে থাকা ল্যাপটপ ও ক্যামেরার আর্থিক মূল্য হয়তো নির্ধারণ করা সম্ভব। কিন্তু একজন বিদেশি পর্যটকের মনে বাংলাদেশের নিরাপত্তা সম্পর্কে যে সংশয় তৈরি হলো, তার মূল্য কত? তার অভিজ্ঞতা, তার বলা কথা, তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বিবরণ কিংবা দেশে ফিরে পরিচিতদের কাছে বলা গল্প—সবকিছুই বাংলাদেশের ভাবমূর্তির সঙ্গে জড়িয়ে যেতে পারে। একটি দেশের পর্যটন প্রচারে কোটি কোটি টাকা খরচ করেও যে আস্থা তৈরি করা কঠিন, এমন একটি ঘটনা মুহূর্তেই সেই আস্থায় ফাটল ধরাতে পারে।

পর্যটন শুধু সুন্দর দৃশ্যের নাম নয়; পর্যটন মানে নিরাপত্তা, আস্থা ও সম্মানজনক আচরণের নিশ্চয়তা। পর্যটক কোনো জায়গায় গিয়ে যেন প্রতারণার শিকার হওয়ার ভয় না পান, অপরিচিত মানুষের সাহায্য নিতে গিয়ে বিপদে না পড়েন, রেলস্টেশন বা বাস টার্মিনালে নিজের মালপত্র নিয়ে দুশ্চিন্তায় না থাকেন—এ নিশ্চয়তা দেওয়া রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্বের অংশ।

নাটোরের ঘটনাটি ঘটেছে রেলস্টেশনের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ জনপরিসরে। সেখানে যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব কার? রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ, স্টেশনে দায়িত্ব পালনকারী কর্মী, নিরাপত্তারক্ষী, রেলওয়ে পুলিশ—সবারই নির্দিষ্ট দায়িত্ব রয়েছে। তাহলে একজন বিদেশি পর্যটক কীভাবে এমন পরিস্থিতির শিকার হলেন? স্টেশনে পর্যাপ্ত নজরদারি ছিল কি না, যাত্রীদের জন্য নিরাপদ সহায়তা পাওয়ার ব্যবস্থা ছিল কি না, সন্দেহজনক ব্যক্তিদের চলাচল পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন।

ঘটনার পর পুলিশ তৎপর হয়েছে, সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করেছে, উদ্ধার অভিযান চালিয়েছে—এ উদ্যোগ অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু অপরাধ ঘটার পর তৎপর হওয়াই যথেষ্ট নয়। প্রশ্ন হচ্ছে, অপরাধটি ঠেকানোর মতো ব্যবস্থা আগে থেকে ছিল কি না। নিরাপত্তাব্যবস্থার সাফল্য শুধু অপরাধী শনাক্ত করার মধ্যে নয়; এমন পরিস্থিতি তৈরি করা, যাতে অপরাধ করার সুযোগই কমে আসে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

আরেকটি বিষয় স্পষ্ট করে বলা দরকার। বিদেশি পর্যটক বলে তার নিরাপত্তা বেশি গুরুত্বপূর্ণ, আর দেশি পর্যটক বলে কম—এমন নয়। প্রতিটি নাগরিক ও ভ্রমণকারীর নিরাপত্তা সমান জরুরি। তবে বিদেশি পর্যটকের সঙ্গে ঘটে যাওয়া অপরাধ আন্তর্জাতিক পরিসরে দেশের ভাবমূর্তিকে প্রভাবিত করতে পারে বলে এ ধরনের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বাড়তি পেশাদারত্ব ও দ্রুততার পরিচয় দেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে স্থানীয় পর্যটক, সাধারণ যাত্রী ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে ভ্রমণকারীদের নিরাপত্তাও অবহেলা করা চলবে না।

বাংলাদেশের পর্যটন খাতের অন্যতম বড় সমস্যা হলো, আমরা সম্ভাবনার কথা বলি বেশি, পর্যটকের বাস্তব অভিজ্ঞতা নিয়ে ভাবি কম। পর্যটনকেন্দ্রে পৌঁছানোর রাস্তা কেমন, যাতায়াতব্যবস্থা কতটা নির্ভরযোগ্য, কোথায় অভিযোগ জানাতে হবে, বিপদে পড়লে কার সাহায্য পাওয়া যাবে, প্রতারণার শিকার হলে প্রতিকার মিলবে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে শুধু প্রচারণা চালালে পর্যটন শিল্প এগোবে কীভাবে?

একজন পর্যটক যখন কোনো দেশে যান, তখন তিনি শুধু দর্শনীয় স্থান দেখেন না; দেখেন সেই দেশের মানুষ কেমন, প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা দায়িত্বশীল, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা কতটা কার্যকর এবং বিপদে পড়লে তিনি কত দ্রুত সহায়তা পান। তার সামগ্রিক অভিজ্ঞতাই পরবর্তী সময়ে ওই দেশ সম্পর্কে ধারণা তৈরি করে। ফলে পর্যটন উন্নয়নের পরিকল্পনায় নিরাপত্তাকে আলাদা কোনো বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। নিরাপত্তাই পর্যটন অবকাঠামোর মৌলিক অংশ।

এখন প্রশ্ন, উত্তরণের পথ কী?

প্রথমত, রেলস্টেশন, বাস টার্মিনাল, বিমানবন্দর এবং পর্যটকদের যাতায়াতের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। শুধু সিসিটিভি ক্যামেরা বসালেই দায়িত্ব শেষ হয় না; ক্যামেরা সচল রাখা, ফুটেজ নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা এবং অপরাধের অভিযোগ পেলে দ্রুত তা কাজে লাগানোর ব্যবস্থাও থাকতে হবে।

দ্বিতীয়ত, পর্যটকদের সহায়তার জন্য দৃশ্যমান তথ্যকেন্দ্র ও নির্ভরযোগ্য অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। কোথায় টিকিট পাওয়া যাবে, কীভাবে বৈধ পরিবহনসেবা নেওয়া যাবে, বিপদে পড়লে কোথায় যোগাযোগ করতে হবে—এসব তথ্য সহজ ভাষায় এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ইংরেজিসহ একাধিক ভাষায় দিতে হবে। স্টেশন ও পর্যটনকেন্দ্রে দায়িত্বে থাকা কর্মীদেরও পর্যটকবান্ধব আচরণ ও জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রশিক্ষণ প্রয়োজন।

তৃতীয়ত, পর্যটকদের সঙ্গে প্রতারণা, চুরি, ছিনতাই কিংবা হয়রানির অভিযোগের দ্রুত তদন্ত ও প্রতিকার নিশ্চিত করতে হবে। শুধু বিদেশি পর্যটকের ঘটনা সংবাদমাধ্যমে আলোচিত হলেই তৎপর হওয়া চলবে না। সব অভিযোগের ক্ষেত্রেই পেশাদার তদন্ত, আইনানুগ ব্যবস্থা এবং ভুক্তভোগীকে নিয়মিত অগ্রগতি জানানো জরুরি। নাটোরের ঘটনায়ও শুধু একজনকে শনাক্ত করার ঘোষণায় থেমে গেলে হবে না; চুরি যাওয়া মালপত্র উদ্ধার, দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা এবং পর্যটককে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।

চতুর্থত, পর্যটন উন্নয়নে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, পর্যটন করপোরেশন, স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ, রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ ও পর্যটন ব্যবসায়ীদের মধ্যে সমন্বয় থাকতে হবে। পর্যটনকেন্দ্রের নিরাপত্তা কার দায়িত্ব, অভিযোগ কে গ্রহণ করবে, কোন সংস্থা কীভাবে ব্যবস্থা নেবে—এসব বিষয়ে স্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন। দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকলে পর্যটকের দুর্ভোগই বাড়বে।

পঞ্চমত, পর্যটকদের নিরাপত্তা ও সেবার মান নিয়মিত মূল্যায়ন করতে হবে। কোথায় কী ধরনের অপরাধ হচ্ছে, অভিযোগ নিষ্পত্তিতে কত সময় লাগছে, পর্যটকেরা কোন সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন—এসব তথ্য প্রকাশ করা উচিত। তাতে দুর্বলতা চিহ্নিত করা যাবে এবং সংশোধনের অগ্রগতিও বোঝা সম্ভব হবে।

সবচেয়ে বড় কথা, পর্যটনকে কেবল প্রচার, উৎসব কিংবা উন্নয়ন প্রকল্পের হিসাবের মধ্যে আটকে রাখা যাবে না। পর্যটকের অভিজ্ঞতাই হতে হবে সাফল্যের প্রধান মাপকাঠি। পর্যটনকেন্দ্রের সৌন্দর্য বাড়ানোর পাশাপাশি সেখানে পৌঁছানোর নিরাপদ পথ, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, নির্ভরযোগ্য পরিবহন, দায়িত্বশীল সেবাকর্মী এবং দ্রুত প্রতিকার পাওয়ার নিশ্চয়তা দিতে হবে।

বাংলাদেশের পর্যটন নিয়ে আশাবাদী হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে। কিন্তু সম্ভাবনা থাকলেই সাফল্য আসে না। সাফল্যের জন্য প্রয়োজন পরিকল্পনা, বিনিয়োগ, দক্ষ ব্যবস্থাপনা, আইনের কার্যকর প্রয়োগ এবং জবাবদিহি। বিদেশি পর্যটককে আমন্ত্রণ জানিয়ে তার নিরাপত্তার দায়িত্ব উপেক্ষা করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

নাটোরের ঘটনাটি তাই সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষের জন্য সতর্কবার্তা। একজন পর্যটকের ব্যাগ চুরি হয়েছে—এটুকু বলে বিষয়টিকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। এ ঘটনা আমাদের নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতা খতিয়ে দেখার, দায়িত্ব নির্ধারণের এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার করার সুযোগও তৈরি করেছে।

আমরা যদি পর্যটককে নিরাপত্তা দিতে না পারি, প্রতারণা থেকে রক্ষা করতে না পারি, বিপদে পড়লে দ্রুত সহায়তা নিশ্চিত করতে না পারি, তাহলে পর্যটনের অপার সম্ভাবনা নিয়ে বড় বড় কথা বলে লাভ কী? বিজ্ঞাপনে বাংলাদেশের সৌন্দর্য দেখানো যায়, কিন্তু নিরাপত্তাহীনতার অভিজ্ঞতা আড়াল করা যায় না। পর্যটকের আস্থা অর্জন করতে হয় কাজে, দায়িত্বশীলতায় এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে।

বাংলাদেশের পর্যটনের ভবিষ্যৎ শুধু কতজন বিদেশি পর্যটক এলেন, সেই সংখ্যায় নির্ধারিত হবে না; নির্ধারিত হবে তারা কতটা নিরাপদ বোধ করলেন, কী অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরে গেলেন এবং আবার আসতে আগ্রহী হলেন কি না—তার ওপর। এই সত্য যত দ্রুত নীতিনির্ধারকেরা বুঝবেন, দেশের পর্যটন তত দ্রুত বাস্তব অগ্রগতির পথে এগোতে পারবে।