ঢাকা, মঙ্গলবার ১৩, অক্টোবর ২০২৬ ৫:১৬:৫৭ এএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

দুর্গাপূজা: বাঙালি হিন্দুদের বড় ধর্মীয় উৎসবে পরিণত যেভাবে

নিজস্ব প্রতিবেদক

উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ১১:২০ এএম, ১২ অক্টোবর ২০২৬ সোমবার

সংগৃহীত ছবি

সংগৃহীত ছবি

এ বছর ১৬ অক্টোবর মহাষষ্ঠী পূজার মধ্য দিয়ে বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হতে যাচ্ছে। দুর্গাপূজা রাতারাতি বাঙালি হিন্দুদের প্রধান উৎসবে পরিণত হয়নি। কয়েক শতাব্দী ধরে বিবর্তনের মধ্য দিয়ে একটি হিন্দু ধর্মীয় আচার থেকে এটি বাঙালি সংস্কৃতি, পরিচয়, শিল্পকলা, সামাজিক বন্ধন ও সম্মিলিত উৎসবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকে পরিণত হয়েছে।

দুর্গাপূজার ইতিহাস বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিবর্তন, বিত্তশালী জমিদার পরিবারের উত্থান, সর্বজনীনভাবে পূজা আয়োজনের প্রসার এবং দেবী দুর্গাকে ঘিরে বাঙালির স্বতন্ত্র ভাবনার সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত। বাঙালির কল্পনায় দুর্গা শুধু অশুভ শক্তির বিনাশকারী মহাশক্তি নন, তিনি সন্তানদের নিয়ে বাপের বাড়িতে ফিরে আসা এক আদুরে কন্যাও।

ইউনেস্কোর স্বীকৃতি: বিশ্ব সংস্কৃতির মাইলফলক

দুর্গাপূজার ইতিহাসে ইউনেস্কোর স্বীকৃতি একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। ২০২১ সালের ১৫ ডিসেম্বর প্যারিসে অনুষ্ঠিত ইউনেস্কোর আন্তঃসরকারি কমিটির ১৬তম অধিবেশনে ‘কলকাতার দুর্গাপূজা’ মানবজাতির অমূল্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতিনিধিত্বমূলক তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়। ধর্মীয় আচার, শিল্পকলা, কারুশিল্প, জনসম্পৃক্ততা ও সামাজিক সহযোগিতার সমন্বয়ের বিষয়টি বিশেষভাবে তুলে ধরে ইউনেস্কো।

দুর্গাপূজা এশিয়ার প্রথম উৎসব হিসেবে এই স্বীকৃতি পায়। এর মধ্য দিয়ে মূলত দুর্গাপূজার অপরিসীম সাংস্কৃতিক গুরুত্বের স্বীকৃতি মেলে, যা প্রচলিত ধর্মীয় উপাসনার আনুষ্ঠানিকতার গণ্ডি ছাড়িয়ে বহুদূর বিস্তৃত হয়ে পড়েছে।

ধর্মীয় শিকড়: বাংলায় দেবী দুর্গার আগমন

ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে দেবী দুর্গার পূজা হয়। তবে বাংলায় শারদীয় দুর্গাপূজা নামে পরিচিত তাঁর পূজা একটি অনন্য ঐতিহ্য গড়ে তুলেছে। হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, মহিষাসুর নামের মহিষরূপী অসুরকে পরাজিত ও বধ করেন দেবী দুর্গা। এর মধ্য দিয়ে অশুভ শক্তির ওপর দৈবশক্তির বিজয় হয়। বাংলায় এই পৌরাণিক কাহিনি বিশেষভাবে পারিবারিক ও আবেগঘন অর্থ লাভ করেছে।

দেবী দুর্গা বাঙালির কাছে উমা নামেও পরিচিত। তিনি হিমালয় ও মেনকার আদরের কন্যা, যিনি প্রতিবছর কয়েক দিনের জন্য বাপের বাড়িতে বেড়াতে আসেন। বাঙালির পরিচিত প্রতিমায় তাঁর সঙ্গে থাকেন সন্তান লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশ।

পৌরাণিক কাহিনি, মাতৃত্ব, পারিবারিক পুনর্মিলন ও ঘরে ফেরার এই সমন্বয় দুর্গাপূজাকে কেবল ধর্মীয় আচারের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখে না; বরং তারঁ সঙ্গে বাঙালির গভীর আবেগ ও আত্মিক সম্পর্ক যুক্ত করে।

দুর্গাপূজার জাঁকজমক বাড়ান জমিদাররা

ষোড়শ শতাব্দীর শেষভাগ ও সপ্তদশ শতাব্দীতে বাংলার বিত্তশালী জমিদার ও রাজপরিবারগুলো জাঁকজমকপূর্ণ শরৎকালীন দুর্গাপূজা আয়োজনের ঐতিহ্য প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

বাংলাদেশের বর্তমান রাজশাহী জেলার তাহেরপুরের রাজা কংসনারায়ণের নাম এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁর নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রাচীন বাংলার শারদীয় দুর্গাপূজার জাঁকজমকপূর্ণ ঐতিহ্য। তবে বাংলায় প্রথম জাঁকজমকপূর্ণ দুর্গাপূজার সূচনা হয়েছিল, ঐতিহাসিকদের পুঁথিগত বিদ্যার চেয়েও পুরাকালে।

সুবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের দুর্গাপূজার ঐতিহ্য ১৬১০ সাল থেকে চলে আসছে বলে কথিত রয়েছে। অন্যদিকে, কলকাতার শোভাবাজার রাজবাড়িতে রাজা নবকৃষ্ণ দেবের বিখ্যাত দুর্গাপূজা শুরু হয় ১৭৫৭ সালে।

এসব অভিজাত পরিবারের পূজা ছিল ধর্মীয় আয়োজনের পাশাপাশি বিত্ত, মর্যাদা ও সামাজিক প্রভাব প্রদর্শনের উপলক্ষ। সংগীত, ভোজ, নাট্য পরিবেশনা এবং বর্ণাঢ্য সাজসজ্জা পূজাকে বড় ধরনের সামাজিক উৎসবে রূপ দেয়। এর ফলে দুর্গাপূজা কেবল ধর্মীয় অনুষ্ঠান না থেকে বাঙালির বৃহত্তর সামাজিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ আয়োজনে পরিণত হয়।

জমিদারবাড়ির আঙিনা থেকে গণমানুষের উৎসব

দীর্ঘদিন ধরে সবচেয়ে জাঁকজমকপূর্ণ দুর্গাপূজার আয়োজন করত বিত্তশালী জমিদার পরিবারগুলো। সাধারণ মানুষ ধর্মীয় কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে পারলেও অভিজাতদের ব্যক্তিগত আয়োজনে সাধারণ মানুষের তেমন প্রবেশাধিকার ছিল না।

সময়ের সঙ্গে এই পরিস্থিতির পরিবর্তন শুরু হয় বারোয়ারি পূজার প্রসারের মধ্য দিয়ে। এ ধরনের পূজায় একাধিক ব্যক্তি বা পরিবার চাঁদা ও সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে পূজার আয়োজন করতেন।

প্রচলিত একটি বিবরণ অনুযায়ী, হুগলির গুপ্তিপাড়ায় কয়েকজন বন্ধু একত্রে পূজার আয়োজন করে এই ধারার সূচনা করেন। তবে ঐতিহাসিক বিবরণে এ আয়োজনের সময় নিয়ে মতভেদ রয়েছে। কারও মতে, এটি ১৭৬০-এর দশকে, আবার কারও মতে, ১৭৯০ সালের দিকে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে কলকাতায় সর্বসাধারণের অংশগ্রহণে আয়োজিত পূজা ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

‘সার্বজনীন’ শব্দটি সবার জন্য উন্মুক্ত- এমন একটি বৃহত্তর আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে। এর মাধ্যমে দুর্গাপূজা কোনো একটি পরিবারের উৎসবের পরিবর্তে পুরো সম্প্রদায়ের উৎসবে পরিণত হতে থাকে। এই পরিবর্তন তিনটি ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে।

প্রথমত, অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়ে। মানুষ চাঁদা দেওয়া, স্বেচ্ছাসেবা এবং আয়োজনের বিভিন্ন কাজে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পায়।

দ্বিতীয়ত, সামাজিক বন্ধন দৃঢ় হয়। ব্যক্তিগত আর্থিক সামর্থ্য যা-ই হোক, একটি এলাকার মানুষ সম্মিলিতভাবে উৎসব উদযাপন করতে পারেন।

তৃতীয়ত, জনপরিসরে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের বিস্তার ঘটে। রাস্তা, উঠান এবং পরবর্তী সময়ে সুসজ্জিত পূজামণ্ডপ উপাসনা ও সামাজিক মিলনমেলার অভিন্ন পরিসরে পরিণত হয়।

এভাবেই দুর্গাপূজা একটি পরিবারের একক আয়োজন থেকে বেরিয়ে এসে সমষ্টির উৎসবে রূপ নেয়।

বাঙালির পরিচয়ের প্রতীকে পরিণত হয় দুর্গাপূজা

ভাষা, সাহিত্য, খাবার, সংগীত, পারিবারিক সম্পর্ক ও অভিন্ন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মধ্য দিয়ে বাঙালি পরিচয় প্রকাশ পায়। দুর্গাপূজা ধীরে ধীরে এসব উপাদানকে এক বার্ষিক উৎসবে একত্র করেছে।

এই উৎসবের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে রয়েছে মহালয়া, ঢাক, পূজামণ্ডপ ও প্রতিমা, আড্ডা, খাবার, নতুন পোশাক এবং বিজয়া দশমী। অনেক বাঙালির কাছে মহিষাসুরমর্দিনী পাঠের মধ্য দিয়ে মহালয়া উৎসবের আবেগঘন সূচনা ঘটায়। ঢাকের স্বতন্ত্র বাদ্যধ্বনি তৈরি করে উৎসবের অনন্য আবহ। মৃৎশিল্পী ও কারুশিল্পীরা মাটিকে রূপ দেন দেবী প্রতিমায়, আর নকশাবিদেরা পূজা ও উৎসবের জন্য নির্মাণ করেন নান্দনিক স্থাপত্যশৈলীর অস্থায়ী মণ্ডপ।

বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করা, আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে যাওয়া, একসঙ্গে খাবার খাওয়া এবং নতুন পোশাক পরার মধ্য দিয়ে দুর্গাপূজা দৈনন্দিন সামাজিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে। বিজয়া দশমীতে দেবীর বিদায় আবার মিলন ও বিচ্ছেদের আবেগ জাগায়। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে দেবী দুর্গার পূজা হলেও এসব ঐতিহ্য দুর্গাপূজাকে স্বতন্ত্র বাঙালি বৈশিষ্ট্য দিয়েছে।

ঔপনিবেশিক আমলে বাঙালির জনজীবন, সাহিত্য, শিল্পকলা ও সামষ্টিক পরিচয়বোধে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটছিল। সে সময় দুর্গাপূজা আরও বিস্তৃত সাংস্কৃতিক তাৎপর্য লাভ করে। ধর্মীয় সমাবেশ মানুষের মধ্যে অভিন্ন পরিচয় ও আত্মীয়তার অনুভূতি প্রকাশের ক্ষেত্র তৈরি করেছিল। তবে দুর্গাপূজার পুরো ইতিহাসকে শুধু জাতীয়তাবাদের উত্থানের সঙ্গে ব্যাখ্যা করা যায় না।

বাঙালির ঘরে ফেরা কন্যা দুর্গা

দুর্গাপূজা বাঙালির কাছে এত ব্যক্তিগত ও আবেগঘন হয়ে ওঠে কেন? এর একটি উত্তর রয়েছে দেবীকে ঘিরে বাঙালির সাংস্কৃতিক কল্পনায়। বাংলায় দুর্গা শুধু মহিষাসুরবধকারী যোদ্ধা নন। তিনি উমা স্বামীর গৃহ থেকে মা-বাবার কাছে ফিরে আসা আদরের কন্যা। তাঁর এই আগমন মাত্র অল্প ক’দিনের জন্য। তাই বিদায়ের মুহূর্তে বাঙালির মনে জাগে বিষণ্নতা। এই কাহিনির সঙ্গে বাঙালির পারিবারিক জীবন, ঘরে ফেরা, বিচ্ছেদ ও স্নেহের পরিচিত অভিজ্ঞতার মিল রয়েছে।

ফলে দুর্গাপূজা দুটি আবেগঘন স্তরে কাজ করে। ধর্মীয়ভাবে ভক্তরা দেবীকে মাতৃরূপে পূজা করেন। সাংস্কৃতিকভাবে তাঁরা উদযাপন করেন আদরের কন্যার ঘরে ফেরা এবং পরিবার ও সম্প্রদায়ের পুনর্মিলন। এই আবেগঘন সংযোগ ব্যাখ্যা করে কেন আনুষ্ঠানিক ধর্মীয় আচারের বাইরেও বহু বাঙালির কাছে দুর্গাপূজা অর্থবহ হয়ে রয়েছে।

আঞ্চলিক উৎসব থেকে আধুনিক সাংস্কৃতিক আয়োজনে

বিংশ শতাব্দীতে সর্বজনীন দুর্গাপূজা ক্রমে শিল্পকলার নতুন পরীক্ষা-নিরীক্ষা, সামাজিক সংগঠন এবং জনসম্পৃক্ত উৎসবের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে ওঠে। বর্তমানে এ আয়োজনে যুক্ত হন ভাস্কর, চিত্রশিল্পী, স্থপতি, আলোকসজ্জাবিদ, সংগীতশিল্পী, স্বেচ্ছাসেবক ও দর্শনার্থীরা।

ভারত ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা বাঙালি সম্প্রদায়ের মধ্যেও দুর্গাপূজার ঐতিহ্য বিস্তৃত হয়েছে। বাংলাদেশে দুর্গাপূজা বাঙালি হিন্দুদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উৎসব। দেশের নিজস্ব ইতিহাস ও সামাজিক বাস্তবতার আলোকে এ উৎসবের স্থানীয় ঐতিহ্যও গড়ে উঠেছে।

কোনো একটি রাজকীয় ঘোষণা, ধর্মীয় সংস্কার কিংবা একক ঐতিহাসিক ঘটনার মাধ্যমে দুর্গাপূজা বাঙালি হিন্দুদের প্রধান উৎসবে পরিণত হয়নি। বরং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণ ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এর বিকাশ ঘটেছে।

দুর্গাপূজা একই সঙ্গে একটি হিন্দু ধর্মীয় উৎসব এবং স্বতন্ত্র বাঙালি সাংস্কৃতিক পরিচয়ের বাহক। এটি পবিত্র উপাসনার উপলক্ষ্য, আবার ঘরে ফেরা, সৃজনশীলতা, সামাজিক বন্ধন ও আত্মপরিচয় উদযাপনেরও উৎসব। এ কারণেই অসংখ্য বাঙালির কাছে দুর্গার আগমন মানে শুধু দেবীর আগমন নয়, বরং উৎসবের ঋতুরও আগমন।