রাজধানীর ফুটপাত হকারমুক্ত করা এক বিরাট চ্যালেঞ্জ
জোসেফ সরকার
উইমেননিউজ২৪
প্রকাশিত : ১১:৩২ এএম, ১৬ অক্টোবর ২০২৬ শুক্রবার
ছবি: সংগ্রহিত।
রাজধানী ঢাকার ফুটপাত কার? পথচারীর, নাকি হকারদের? প্রশ্নটি শুনতে সহজ হলেও এর উত্তর বাস্তবে বেশ জটিল। নগরীর ফুটপাত দিয়ে নির্বিঘ্নে হাঁটতে পারা নাগরিকের অধিকার। অথচ ঢাকা শহরের বহু এলাকায় সেই অধিকার কার্যত কেড়ে নেওয়া হয়েছে। ফুটপাতজুড়ে দোকান, পসরা, খাবারের স্টল, কাপড়চোপড় ও নানা পণ্যের সমারোহ। কোথাও ফুটপাতের ওপর স্থায়ী কাঠামো, কোথাও রাস্তার একাংশ পর্যন্ত বিস্তৃত ব্যবসা। বাধ্য হয়ে পথচারীদের নামতে হয় মূল সড়কে। আর সড়কে নামলেই ঝুঁকি—দুর্ঘটনা, যানজট ও প্রাণহানির আশঙ্কা।
রাজধানীর ফুটপাত হকারমুক্ত করা যে একটি বিরাট চ্যালেঞ্জ, তা দীর্ঘদিনের বাস্তবতাই প্রমাণ করে। বিভিন্ন সময়ে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছে, ফুটপাত উদ্ধারের ঘোষণা এসেছে, জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার পক্ষ থেকে নানা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কিছুদিন যেতে না যেতেই অনেক স্থানে আবারও ফুটপাত দখল হয়ে যায়। কোথাও আগের হকার ফিরে আসেন, কোথাও নতুন করে বসে দোকান। ফলে উচ্ছেদ অভিযান যেন একটি নিয়মিত আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়েছে—দখল, উচ্ছেদ, পুনর্দখল। এই চক্র ভাঙতে না পারলে পথচারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়।
প্রশ্ন হলো, এত অভিযান, এত প্রশাসনিক তৎপরতার পরও ফুটপাত কেন দখলমুক্ত রাখা যাচ্ছে না?
এর প্রথম কারণ, ফুটপাত দখলকে কেবল হকারদের সমস্যা হিসেবে দেখার প্রবণতা। বাস্তবে এটি নগর ব্যবস্থাপনা, কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য, রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং অবৈধ অর্থনৈতিক লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত একটি বহুমাত্রিক সমস্যা। ফুটপাতে যাঁরা পণ্য বিক্রি করেন, তাঁদের একটি বড় অংশের জীবিকা এই ব্যবসার ওপর নির্ভরশীল। তাঁদের অনেকেরই স্থায়ী দোকান নেওয়ার সামর্থ্য নেই। কম পুঁজিতে ব্যবসা শুরু করা যায় বলে ফুটপাত তাঁদের কাছে জীবিকা নির্বাহের সহজলভ্য ক্ষেত্র। অন্যদিকে, রাজধানীতে বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থানের চাহিদার তুলনায় আনুষ্ঠানিক ও নিরাপদ কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত। এই বাস্তবতা উপেক্ষা করে শুধু উচ্ছেদ চালালে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না।
কিন্তু হকারদের জীবিকার প্রশ্ন সামনে এনে ফুটপাত দখলের বৈধতা দেওয়ারও কোনো সুযোগ নেই। একজন মানুষের জীবিকার অধিকার যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি অন্য নাগরিকের নিরাপদে চলাচলের অধিকারও সমান গুরুত্বপূর্ণ। একজনের জীবিকা নির্বাহের ব্যবস্থা করতে গিয়ে লাখো মানুষের চলাচল বাধাগ্রস্ত করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নগরনীতি হতে পারে না। বিশেষ করে শিশু, প্রবীণ, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও অসুস্থ মানুষের জন্য ফুটপাত দখল হয়ে থাকা আরও বেশি দুর্ভোগের কারণ। অনেক সময় তাঁদের চলন্ত যানবাহনের মধ্য দিয়ে পথ চলতে হয়। সামান্য অসতর্কতায় ঘটে যেতে পারে বড় দুর্ঘটনা।
ফুটপাত দখলের পেছনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে—দখলদারত্ব টিকে থাকে কীভাবে? একজন ক্ষুদ্র হকার একা একটি ব্যস্ত সড়কের দীর্ঘ ফুটপাত দখল করে দিনের পর দিন ব্যবসা চালাতে পারেন না, যদি নিয়মিত তদারকি না থাকে কিংবা দখল ঠেকানোর কার্যকর ব্যবস্থা অনুপস্থিত থাকে। কোথাও কোথাও হকারদের কাছ থেকে নিয়মিত অর্থ আদায়ের অভিযোগও দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত। এসব অভিযোগের সত্যতা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তে যাচাই করা জরুরি। তবে যদি অবৈধ অর্থ আদায়, প্রভাবশালী মহলের প্রশ্রয় কিংবা দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের যোগসাজশের কারণে ফুটপাত দখল টিকে থাকে, তাহলে শুধু ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের উচ্ছেদ করে কোনো লাভ হবে না। দখলের সুবিধাভোগী ও পৃষ্ঠপোষকদেরও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
এখানে রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ। ফুটপাতের হকাররা অনেক সময় সংগঠিত গোষ্ঠীর অংশ হিসেবে কাজ করেন। তাঁদের নিয়ে রাজনৈতিক দর-কষাকষি, প্রভাব বিস্তার কিংবা স্বার্থসংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডের অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে সামনে আসে। ফলে উচ্ছেদ অভিযান শুরু হলেও তা দীর্ঘস্থায়ী হয় না—এমন অভিযোগ রয়েছে। নগর ব্যবস্থাপনায় যদি রাজনৈতিক বিবেচনা আইনের প্রয়োগকে নিয়ন্ত্রণ করে, তাহলে কোনো উদ্যোগই টেকসই হবে না। ফুটপাত উদ্ধারের প্রশ্নে দল, ব্যক্তি কিংবা গোষ্ঠীর পরিচয় নয়, আইন ও জনস্বার্থই হতে হবে প্রধান বিবেচনা।
ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ—দুই সিটি করপোরেশনেরই এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। তবে শুধু সিটি করপোরেশনের ওপর দায় চাপিয়ে দিলেও চলবে না। পুলিশ, ট্রাফিক বিভাগ, স্থানীয় প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। কোন ফুটপাত কতটা প্রশস্ত, কোথায় পথচারীদের চলাচলের জায়গা সম্পূর্ণ বন্ধ, কোথায় অস্থায়ী দোকান বসছে এবং কোথায় স্থায়ী স্থাপনা তৈরি হয়েছে—এসব তথ্য নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ জরিপ করা দরকার। তারপর এলাকাভিত্তিক পরিকল্পনা অনুযায়ী ফুটপাত পুনরুদ্ধার ও তা রক্ষার ব্যবস্থা নিতে হবে।
তবে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনার আগে হকারদের পুনর্বাসন ও বিকল্প কর্মসংস্থানের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। নির্দিষ্ট স্থানে পরিকল্পিত হকার মার্কেট, স্বল্পমূল্যের দোকান বা নিয়ন্ত্রিত অস্থায়ী বাজারের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। প্রয়োজন অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময় ও নির্দিষ্ট এলাকায় ব্যবসার অনুমতি দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে এসব ব্যবস্থা এমন জায়গায় হতে হবে, যেখানে ব্যবসায়ীরা ক্রেতা পাবেন এবং পথচারীদের চলাচল ব্যাহত হবে না। লোকচক্ষুর আড়ালে কিংবা ক্রেতাশূন্য স্থানে হকারদের সরিয়ে দিলে তাঁরা আবার আগের জায়গায় ফিরে আসবেন—এটাই স্বাভাবিক।
পুনর্বাসনের নামে আবার নতুন করে দখলদারত্বের সুযোগ তৈরি করা যাবে না। কারা প্রকৃত হকার, কারা অন্যের নামে জায়গা নিয়ে ব্যবসা করছেন, কারা একাধিক দোকানের নিয়ন্ত্রণে রয়েছেন—এসব বিষয় যাচাই করে স্বচ্ছ তালিকা তৈরি করতে হবে। বরাদ্দে রাজনৈতিক প্রভাব, অনিয়ম কিংবা অর্থের বিনিময়ে জায়গা দেওয়ার সুযোগ বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে হকারদেরও নির্ধারিত নিয়ম মেনে ব্যবসা পরিচালনা করতে হবে। পুনর্বাসনের সুযোগ পাওয়ার পর কেউ আবার ফুটপাত দখল করলে তাঁর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।
আরেকটি বিষয় মনে রাখা জরুরি, ফুটপাত হকারমুক্ত করা মানে কেবল দোকান সরিয়ে দেওয়া নয়। ফুটপাতকে প্রকৃত অর্থে পথচারীবান্ধব করে তুলতে হবে। অনেক স্থানে ফুটপাত ভাঙাচোরা, কোথাও নির্মাণসামগ্রী পড়ে থাকে, কোথাও বিদ্যুতের খুঁটি বা অন্যান্য স্থাপনা চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে। কোথাও ফুটপাতের ওপর গাড়ি ও মোটরসাইকেল রাখা হয়। হকার সরিয়ে এসব বাধা রেখে দিলে নাগরিকের কোনো লাভ হবে না। ফুটপাত হতে হবে পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ, প্রতিবন্ধীবান্ধব এবং নিরবচ্ছিন্নভাবে হাঁটার উপযোগী।
এ জন্য প্রয়োজন নিয়মিত তদারকি। শুধু অভিযান চালিয়ে ছবি তোলা কিংবা সাময়িকভাবে রাস্তা পরিষ্কার দেখানোকে সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। কোন এলাকায় কতটুকু ফুটপাত উদ্ধার করা হয়েছে, এক মাস বা ছয় মাস পর তা কতটা দখলমুক্ত রয়েছে, কতজন হকারকে বিকল্প ব্যবস্থা দেওয়া হয়েছে—এসব সূচকের ভিত্তিতে উদ্যোগের সাফল্য মূল্যায়ন করতে হবে। নাগরিকদের অভিযোগ জানানোর সহজ ব্যবস্থা এবং অভিযোগের ভিত্তিতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার কার্যকর পদ্ধতিও চালু করা প্রয়োজন।
ঢাকা একটি জনবহুল মহানগর। এখানে যানজট, বায়ুদূষণ, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও জনপরিসরের সংকট এমনিতেই তীব্র। এর মধ্যে ফুটপাত দখল নগরজীবনকে আরও দুর্বিষহ করে তুলছে। একটি আধুনিক নগরীর পরিচয় শুধু উঁচু ভবন, প্রশস্ত সড়ক কিংবা আলোকসজ্জায় নয়; নাগরিকেরা কতটা নিরাপদে ও স্বাচ্ছন্দ্যে চলাচল করতে পারেন, তার ওপরও নির্ভর করে। ফুটপাত দখলমুক্ত রাখা তাই নিছক সৌন্দর্যবর্ধনের বিষয় নয়, এটি জনস্বাস্থ্য, সড়কনিরাপত্তা, নাগরিক অধিকার ও সুশাসনের প্রশ্ন।
রাজধানীর ফুটপাত উদ্ধার করতে হলে একদিকে হকারদের জীবিকার বাস্তবতা বুঝতে হবে, অন্যদিকে পথচারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় কোনো আপস করা যাবে না। মানবিক পুনর্বাসন ও কঠোর আইন প্রয়োগ—দুটিই পাশাপাশি চলতে হবে। দখলদারদের পৃষ্ঠপোষকতা বন্ধ করতে হবে, দায়িত্বে অবহেলার জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে এবং উদ্ধার করা ফুটপাত পুনর্দখল ঠেকাতে স্থায়ী ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
সবচেয়ে বড় কথা, ফুটপাত কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী কিংবা প্রতিষ্ঠানের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। এটি নগরবাসীর চলাচলের জন্য নির্ধারিত জনপরিসর। সেই পরিসর রক্ষা করা রাষ্ট্র ও নগর কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। হকারদের জীবিকার ব্যবস্থা করা যেমন সরকারের দায়িত্ব, তেমনি পথচারীদের নিরাপদে হাঁটার অধিকার নিশ্চিত করাও সরকারেরই দায়িত্ব। একটি দায়িত্ব পালনের অজুহাতে অন্য দায়িত্ব উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
ঢাকার ফুটপাত উদ্ধার করা কঠিন হতে পারে, কিন্তু অসম্ভব নয়। প্রয়োজন ধারাবাহিক রাজনৈতিক সদিচ্ছা, স্বচ্ছ প্রশাসন, মানবিক পুনর্বাসন এবং আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ। সাময়িক উচ্ছেদ নয়, স্থায়ী সমাধানই হোক নগর কর্তৃপক্ষের লক্ষ্য।
