ঢাকা, রবিবার ১৮, অক্টোবর ২০২৬ ২১:০৭:৪৬ পিএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

আজ মহাসপ্তমী

নিজস্ব প্রতিবেদক

উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ০৯:৪৮ এএম, ১৭ অক্টোবর ২০২৬ শনিবার

সংগৃহীত ছবি

সংগৃহীত ছবি

মহালয়ায় চণ্ডীপাঠের মধ্য দিয়ে যে দেবীপক্ষের সূচনা হয়েছিল, ষষ্ঠীতে কল্পারম্ভ ও বিহিত পূজার মাধ্যমে শুরু হলো তার মূল আনুষ্ঠানিকতা। মর্ত্যলোকে দেবীর নিদ্রাভঙ্গের পর এখন মণ্ডপে মণ্ডপে চলছে মহামায়ার আবাহন। বৃহস্পতিবার রাতে বেলতলায় ত্রিনয়নী দেবীর নিদ্রাভঙ্গের আবাহন—অর্থাৎ বোধনের মাধ্যমে এবারের দুর্গোৎসবের আচারপর্ব শুরু হয়। শুক্রবার সকালে বেলতলায় শুরু হওয়া বন্দনা পূজার সমাপন হয় বিহিত পূজায়।

গতকাল সন্ধ্যায় অধিবাসের মাধ্যমে মূল মণ্ডপে মাতৃত্ব ও শক্তির প্রতীক দুর্গতিনাশিনী দেবী দুর্গাকে আমন্ত্রণ জানান ভক্তরা। শুক্রবার সকালে ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির প্রাঙ্গণে বেলতলায় দুর্গাদেবীর ষষ্ঠ্যাদি কল্পারম্ভ ও ষষ্ঠী বিহিত পূজা হয়। এরপর ভক্তবৃন্দ মন্ত্রপাঠের মাধ্যমে দেবীকে পুষ্পাঞ্জলি অর্পণ করেন। চণ্ডীপাঠে মুখরিত ছিল পুরো মন্দির এলাকা। মন্দিরের পুরোহিত ধর্মদাস চট্টোপাধ্যায় গণমাধ্যমকে বলেন, “গতকাল ষষ্ঠী বিহিত পূজা হলো, যেহেতু এবার ষষ্ঠী দীর্ঘায়িত হয়েছে—এ কারণে দুইদিন ষষ্ঠী পূজা হয়েছে। গতকাল বোধন এবং বিহিত পূজা হয়েছে। “সন্ধ্যায় আরেক বিশেষ অনুষ্ঠান আছে, সেটা হলো আমন্ত্রণ অধিবাস। মাকে আমন্ত্রণও জানানো হবে মন্দিরে। আজ শনিবার সপ্তমী পূজা এবং চক্ষুদানের মাধ্যমে প্রতিমায় প্রাণপ্রতিষ্ঠা হবে, তখন দেবী দুর্গা প্রতিমায় প্রতিষ্ঠিত হবেন। পুরোহিত বলেন, “আজ সন্ধ্যার সময় দেবী নবপত্রিকায় অধিষ্ঠিত হবেন। এই নবপত্রিকাটা নিয়ে আমরা কলাগাছসহ নয়টা পত্রিকা দিয়ে মা সাজিয়ে সেখানে পূজা করব। এটা প্রকৃতির প্রতিরূপ, নয়টা পত্রিকা নেওয়া হয়, সেখানে বিশেষ করে কলা গাছ। “কলা গাছটা এত দ্রুত বৃদ্ধি পায় বিধায় আমাদের সংসারে সমৃদ্ধির কামনায় এই কলা গাছটা দেওয়া হয়। সন্ধ্যার সময় এই আমন্ত্রণ অধিবাসের সময় নবপত্রিকাটা এই বিল্ল্যবৃক্ষের কাছে আনা হবে। কাল মন্দিরে প্রতিষ্ঠা পাবে।” তিনি বলেন, “আমাদের প্রত্যাশা মঙ্গল শান্তি এবং আমাদের জীবন থেকে যেন সমস্ত অপশক্তি দূর হয়ে যায়।”

বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকা মতে, বুধবার বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে এবারের দুর্গোৎসবের শেষ হবে। আবার এক বছরের জন্য ‘দুর্গতিনাশিনী’ দেবী ফিরে যাবেন কৈলাসের দেবালয়ে। হিন্দু আচার অনুযায়ী, মহালয়া, বোধন আর সন্ধিপূজা—এই তিন পর্ব মিলে দুর্গোৎসব। আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষের ষষ্ঠ দিনে মহাষষ্ঠী থেকে শুরু হয়ে দশমী, অর্থাৎ বিজয়া দশমী পর্যন্ত দুর্গাপূজার মূল আনুষ্ঠানিকতা থাকে পাঁচ দিন। তবে এবার মহাসপ্তমী তিথি শনি ও রোববার দুই দিন বিস্তৃত হওয়ার এবারের এই আনন্দোৎসব চলবে ছয় দিন। ষষ্ঠীর দিন শুক্রবার ষোড়শ উপচারে দেবী দুর্গাকে মর্ত্যে আবাহন জানানো হয়। ষষ্ঠ্যাদি কল্পারম্ভ ও বিহিত পূজার মাধ্যমে শুরু হলো মূল আচার।

শনিবার সপ্তমীতে নবপত্রিকা প্রবেশ ও স্থাপনের পর শুরু হবে সপ্তমীর পূজা; রোববার সপ্তমীতে বিহিত অধিক পূজা। সোমবার অষ্টমীতে হবে সন্ধিপূজা। মঙ্গলবার বিহিত পূজার মাধ্যমে হবে নবমী পূজা। আর বুধবার দর্পণ বিসর্জনের পর প্রতিমা বিসর্জনের মাধ্যমে শেষ হবে দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিকতা। দুর্গোৎসব চলাকালে রোজই অঞ্জলি, প্রসাদ বিতরণ ও ভোগ-আরতির আয়োজন থাকবে। এ ছাড়া দেশজুড়ে মণ্ডপে মণ্ডপে আলোকসজ্জা, আরতি প্রতিযোগিতা, স্বেচ্ছায় রক্তদান, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, আলোচনা সভা, নাটক, নৃত্যনাট্যসহ বিভিন্ন কর্মসূচির আয়োজন করা হবে। শারদীয় দুর্গোৎসব উপলক্ষে পৃথক বাণীতে প্রেসিডেন্ট মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান হিন্দু ধর্মাবলম্বীসহ দেশবাসীকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন। হিন্দু বিশ্বাস অনুযায়ী, দশভূজা দেবী দুর্গা অসুর বধ করে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রতি শরতে কৈলাস ছেড়ে কন্যারূপে মর্ত্যলোকে আসেন। সন্তানদের নিয়ে পক্ষকাল পিতার গৃহে কাটিয়ে আবার ফিরে যান দেবালয়ে।


আশ্বিন শুক্লপক্ষের এই ১৫টি দিন দেবীপক্ষ, যা গেল শনিবার মহালয়ার দিনে মণ্ডপে মণ্ডপে চণ্ডীপাঠ, মঙ্গলঘট স্থাপন, ঢাক-কাঁসর ও শঙ্খ বাজিয়ে দেবীকে আহ্বান জানিয়ে শুরু হয়েছিল। এর মধ্যে ষষ্ঠ দিন, অর্থাৎ ষষ্ঠীতে বোধন; আর দশম দিন, অর্থাৎ দশমীতে বিসর্জনে দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিকতা শেষ হবে। আর দেবীপক্ষের সমাপ্তি হবে পঞ্চদশ দিনে—কোজাগরী পূর্ণিমায় লক্ষ্মীপূজার মধ্য দিয়ে। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, ত্রেতাযুগে ভগবান রাম তাঁর স্ত্রী সীতাকে উদ্ধার করতে দেবী দুর্গার অকালবোধন করেন। ব্রহ্মার নির্দেশ অনুযায়ী দুর্গার সাহায্যে রাবণ বধ করে সীতাকে উদ্ধার করেন তিনি। দেবীর সেই আগমনের সময়ই দুর্গোৎসব।

রাম শরৎকালে দেবীকে আহ্বান করেছিলেন বলে এ পূজা শারদীয় দুর্গাপূজা নামেও পরিচিত। আর মর্ত্যলোকে আসতে দেবীর সেই ঘুম ভাঙানোকে বলা হয় অকালবোধন। পুরোহিতরা বলছেন, দুর্গাদেবীর প্রকৃত আগমনের সময় চৈত্র মাস, অর্থাৎ বসন্তকাল। চৈত্র মাসে যে দুর্গাপূজা হয়, তাকে বলা হয় বাসন্তী পূজা। তবে বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চলে শারদীয় পূজাই সবচেয়ে বড় উৎসব। শাস্ত্র বলছে, এবার দেবী দুর্গার আগমন ঘোটকে (ঘোড়ায়) এবং গমন নৌকায়। শাস্ত্রমতে, ঘোড়ায় আগমন ছত্রভঙ্গ বা অস্থিতিশীলতা ও যুদ্ধের আশঙ্কার ইঙ্গিত দেয়। আর নৌকায় গমনকে শুভ বলে মনে করা হয়, যা সাধারণত বন্যা বা শস্যবৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়। বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ জানিয়েছে, এ বছর সারা দেশে ৩৩ হাজার ৮৫১টি পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজা হচ্ছে। গত বছর পূজা হয়েছিল ৩৩ হাজার ৩৫৫টি মণ্ডপে। অর্থাৎ এবার ৪৯৬টি পূজামণ্ডপ বেড়েছে। অন্যদিকে, ঢাকা মহানগরীতে এবার ২৫৮টি মণ্ডপে পূজার আয়োজন থাকছে, যা গতবার ছিল ২৬১টি। রাস্তার মধ্যে পূজা আয়োজনের অনুমতি না মেলায় ঢাকা মহানগরীতে এবার পূজামণ্ডপের সংখ্যা তিনটি কমে গেছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সরাসরি প্রত্যক্ষ নির্দেশনার মাধ্যমে প্রতিটি পূজামণ্ডপের নিরাপত্তার দায়িত্ব বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তরফে নিশ্চিত করতে ইতোমধ্যে নানা প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে। ঢাকাসহ সারা দেশের প্রতিটি পূজামণ্ডপের নিরাপত্তা রক্ষায় পুলিশ, আনসার, এসআরবি ও বিজিবি সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি প্রায় প্রতিটি মণ্ডপে স্বেচ্ছাসেবকেরা দায়িত্ব পালন করছেন। ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির মেলাঙ্গনে মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির উদ্যোগে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণকক্ষ খোলা হয়েছে। রাজধানীতে কেন্দ্রীয় পূজা উৎসব বলে পরিচিত ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরের পূজামণ্ডপে শুক্রবার ছয় দিনের শারদীয় দুর্গোৎসবের সূচনা হলো। এর মধ্যে পূজার পাশাপাশি ভক্তিমূলক সংগীতানুষ্ঠান, দুস্থদের মধ্যে বস্ত্র বিতরণ, মহাপ্রসাদ বিতরণ, আরতি প্রতিযোগিতা, স্বেচ্ছায় রক্তদান ও শেষ দিনে বিজয়া শোভাযাত্রা হবে।