এক হাতে মাটি অন্য হাতে রং-তুলি, দম ফেলার ফুরসত নেই কনিকার
নিজস্ব প্রতিবেদক
উইমেননিউজ২৪
প্রকাশিত : ১০:২৫ এএম, ১৯ অক্টোবর ২০২৬ সোমবার
সংগৃহীত ছবি
এক হাতে কাদামাটি, অন্য হাতে রংতুলি। সকাল থেকে রাত— দম ফেলার ফুরসত নেই কনিকা রানী পালের। দুর্গাপূজার মেলা সামনে রেখে মাটির খেলনা ও তৈজসপত্র তৈরিতে ব্যস্ত তিনি। মেলার দোকানিরা আগেই দিয়েছেন পাইকারি অর্ডার। নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ করতে দিন-রাত কাজ করছেন কনিকা। কারণ, মাটির তৈরি এসব পণ্য বিক্রির আয়ই তার ছয় সদস্যের পরিবারের একমাত্র ভরসা।
কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার মামাবাড়ি কালীর মেলা গ্রামের বাসিন্দা কনিকা রানী। বংশপরম্পরায় মৃৎশিল্পের সঙ্গে যুক্ত তার পরিবার। স্বামী শিবু চন্দ্র পাল ও শ্বশুর খগেন্দ্রনাথ পাল মেলা ও হাটবাজারে তৈরি পণ্য বিক্রি করেন। আর বাড়িতে বসে মাটি ছেনে বিভিন্ন আকৃতির পণ্য তৈরির প্রধান কাজটি করেন কনিকা। পরিবারের নারী-পুরুষ সদস্যরাও তাকে সহযোগিতা করেন।
খগেন্দ্রনাথ পাল জানান, সারা বছর কমবেশি মাটির কাজ করলেও তারা দুর্গাপূজার সময়ের জন্য অপেক্ষা করেন। এ সময় মাটির পণ্যের চাহিদা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। দোকানিরা আগে থেকেই অর্ডার দিয়ে রাখায় এখন দিন-রাত কাজ করতে হচ্ছে।
কনিকা রানীর উঠানে এখন মাটির গন্ধ আর রঙের মেলা। তৈরি হচ্ছে শিশুদের আকর্ষণ মাটির হাতি, ঘোড়া, বাঘ, পুতুল ও টাকা জমানোর ব্যাংক। পাশাপাশি তৈরি হচ্ছে হাঁড়ি, পাতিল, কলস, কুলা, ধূপদানি, সানকি ও সানাইসহ নানা সামগ্রী। কাঁচামাটির পণ্য শুকিয়ে পোড়ানোর পর তাতে লাল, নীল, হলুদ ও সবুজ রঙের ছোঁয়া দিচ্ছেন কারিগরেরা।
রাজারহাটের পাশাপাশি কুড়িগ্রাম সদর, উলিপুর ও চিলমারীর বিভিন্ন পালপাড়াতেও এখন একই ব্যস্ততা। কুড়িগ্রাম সদরের কাঠালবাড়ী ইউনিয়নের কুমারপাড়া গ্রামেও দিন-রাত চলছে মৃৎশিল্পীদের কর্মযজ্ঞ।
তবে উৎসবের এই ব্যস্ততার মধ্যেও রয়েছে দুশ্চিন্তা। মাটি, লাকড়ি ও রঙের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচ বেড়েছে। অথচ মেলায় মাটির পণ্যের ন্যায্য দাম পাওয়া কঠিন। তার ওপর রয়েছে প্লাস্টিকের পণ্যের দাপট। তবু ঐতিহ্যের এই পেশা আঁকড়ে ধরে আছেন কনিকা রানীরা। পূজার মৌসুমের আয় দিয়ে বছরের সংসার খরচের বড় একটি অংশ মেটাতে হয় তাদের।
কনিকা রানী পাল বলেন, বাবার বাড়িতে মৃৎশিল্পের কাজ করতেন তিনি। বিয়ের পর স্বামীর বাড়িতেও সেই কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। মাটি দিয়ে হাঁড়ি, পাতিল, ধূপদানি, ঘটসহ বিভিন্ন ধরনের সামগ্রী তৈরি করতে পারেন তিনি। পূজার মৌসুমের আয় দিয়েই বছরের সংসার খরচের বড় একটি অংশ মেটাতে হয়।
স্থানীয় বাসিন্দা ও মৃৎশিল্পের প্রবীণ কারিগর ব্রজেন্দ্রনাথ পাল বলেন, প্লাস্টিকের জিনিসপত্রের ব্যবহার বন্ধ হলে মাটির পণ্যের চাহিদা আবার বাড়বে। এতে তারা ভালোভাবে চলতে পারবেন।
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) কুড়িগ্রাম জেলা কার্যালয়ের উপব্যবস্থাপক শাহ মোহাম্মদ জোনায়েদ বলেন, রাজারহাট উপজেলার নাজিমখাঁন ইউনিয়নের কনিকা রানী বিভিন্ন ধরনের মৃৎশিল্পের কাজ করছেন। তিনি হাঁড়ি, পাখি, টাকা রাখার ব্যাংক, পুতুল ও খেলনাসহ নানা পণ্য তৈরি করেন। এটি একটি ভালো উদ্যোগ। তার মাধ্যমে বেশ কয়েকজন মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে। কনিকা আবেদন করলে বিসিকের পক্ষ থেকে তাকে সহযোগিতা করা হবে।
