সাংবাদিকের কলমে ভয় দেখানোর অধিকার কারও নেই
অনু সরকার
উইমেননিউজ২৪
প্রকাশিত : ০৯:৪৮ পিএম, ২৭ অক্টোবর ২০২৬ মঙ্গলবার
ছবি: সংগ্রহিত।
আইজিপির বক্তব্য শুধু দায়িত্বজ্ঞানহীন নয়, স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্যও উদ্বেগজনক। এই মন্তব্য দেশের সমগ্র সাংবাদিক সমাজের জন্য হতাশা ও লজ্জার।
রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সর্বোচ্চ পদে আসীন একজন ব্যক্তির মুখ থেকে যখন সাংবাদিকদের পেশাগত সততা নিয়ে ঢালাও অভিযোগ উচ্চারিত হয়, তখন সেটিকে নিছক কথার ভুল বলে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। কারণ, একজন সাধারণ নাগরিকের বক্তব্য আর পুলিশের মহাপরিদর্শকের বক্তব্যের গুরুত্ব, প্রভাব ও পরিণতি এক নয়। তাঁর প্রতিটি কথা দায়িত্বশীল হওয়া প্রয়োজন। অথচ সেই দায়িত্বশীলতার জায়গা থেকেই যদি সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে এমন একটি গুরুতর ইঙ্গিত ছুড়ে দেওয়া হয়, তাহলে প্রশ্ন ওঠে—তিনি কি সাংবাদিকতার ভূমিকা ও দায়িত্ব সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতন?
পুরান ঢাকার চকবাজারে এক অনুষ্ঠানে আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকিরের বক্তব্যের মর্মার্থ হলো, মাদকের টাকা না পেলে সাংবাদিকেরা পুলিশকে অকার্যকর বলে সংবাদ প্রকাশ করেন। এই বক্তব্যের মধ্যে শুধু সাংবাদিকদের পেশাগত সততা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়নি; বরং সংবাদ প্রকাশের পেছনে আর্থিক অসততার একটি সাধারণীকৃত ইঙ্গিতও রয়েছে। একজন দায়িত্বশীল পুলিশ কর্মকর্তার কাছ থেকে এমন বক্তব্য কোনোভাবেই প্রত্যাশিত নয়।
প্রশ্ন হচ্ছে, আইজিপির কাছে কি এমন কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ রয়েছে, যার ভিত্তিতে তিনি সাংবাদিকদের সম্পর্কে এই মন্তব্য করেছেন? যদি থাকে, তাহলে তিনি তা যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন করুন। সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নিন। অপরাধের প্রমাণ থাকলে অপরাধীকে ছাড় দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। কিন্তু প্রমাণ ছাড়া একটি গোটা পেশার মানুষের সততা নিয়ে প্রশ্ন তোলা কোন ধরনের দায়িত্বশীলতা?
পুলিশের সমালোচনা মানেই কি পুলিশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র?
পুলিশের কাজ অপরাধ দমন করা, মাদক কারবার বন্ধ করা, নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখা। এই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা থাকলে তা তুলে ধরবে গণমাধ্যম। কোথাও মাদকের বিস্তার ঘটলে, অপরাধীরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ালে, দুর্নীতি বা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠলে সাংবাদিকেরা প্রশ্ন করবেন। সেটিই তাঁদের পেশাগত দায়িত্ব।
কোনো এলাকায় মাদক কারবার বাড়ছে, অথচ পুলিশ কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছে না—এমন অভিযোগের সংবাদ প্রকাশিত হলে তার জবাব হওয়া উচিত তথ্য দিয়ে। পুলিশ কী ব্যবস্থা নিয়েছে, কতজনকে গ্রেপ্তার করেছে, কতটি অভিযান চালিয়েছে, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কী অগ্রগতি হয়েছে—এসব তথ্য সামনে আনতে হবে। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অসততার অভিযোগ তুলে মূল প্রশ্ন থেকে সরে যাওয়া কোনো সমাধান নয়।
পুলিশের কাজের সমালোচনা হতে পারে। সেই সমালোচনা সঠিকও হতে পারে, ভুলও হতে পারে। সংবাদে ভুল থাকলে সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যমের কাছে প্রতিবাদ পাঠানো যায়, তথ্য-প্রমাণ দিয়ে ভুল সংশোধনের দাবি জানানো যায়। কোনো সাংবাদিক অপরাধে জড়িত থাকলে তাঁর বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যায়। কিন্তু সংবাদ প্রকাশের কারণ হিসেবে মাদক কারবারিদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার ইঙ্গিত দেওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। এর জন্য প্রমাণ প্রয়োজন, দায়িত্বশীলতা প্রয়োজন।
একটি কথা মনে রাখা দরকার—পুলিশের কাজের মূল্যায়ন করার একমাত্র মাপকাঠি পুলিশের নিজস্ব বক্তব্য হতে পারে না। জনগণের অভিজ্ঞতা, অপরাধের বাস্তব চিত্র, ভুক্তভোগীর বক্তব্য এবং স্বাধীন গণমাধ্যমের অনুসন্ধানও সেই মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সাংবাদিকতা কারও দয়ার দান নয়
সাংবাদিকেরা রাষ্ট্রের কোনো বাহিনীর অধস্তন কর্মচারী নন। তাঁদের কাজ পুলিশের প্রশংসা করা নয়, আবার অকারণে পুলিশের সমালোচনা করাও নয়। তাঁদের দায়িত্ব সত্য অনুসন্ধান করা, জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট তথ্য প্রকাশ করা এবং ক্ষমতাবানদের জবাবদিহির আওতায় আনতে ভূমিকা রাখা।
এই দায়িত্ব পালনের পথ সব সময় মসৃণ নয়। মাঠপর্যায়ে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকেরা বাধার মুখে পড়েন, হুমকি পান, কখনো হামলার শিকার হন। অপরাধ ও দুর্নীতির সংবাদ প্রকাশ করতে গিয়ে নানা চাপের মুখোমুখি হতে হয়। এর মধ্যেও যাঁরা পেশাগত দায়িত্ব পালন করেন, তাঁদের কাজকে ঢালাওভাবে সন্দেহের চোখে দেখা শুধু অন্যায় নয়, সাংবাদিকতার স্বাধীনতার জন্যও ক্ষতিকর।
অবশ্য সাংবাদিক সমাজও সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। এই পেশায় অনিয়ম, দুর্নীতি কিংবা অপেশাদার আচরণের অভিযোগ উঠলে তার তদন্ত হওয়া উচিত। সাংবাদিকতার নাম ব্যবহার করে কেউ অপরাধ করলে তাঁকে পেশাগত পরিচয়ের আড়ালে সুরক্ষা দেওয়ারও কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু বিচ্ছিন্ন অপরাধের দায় পুরো সাংবাদিক সমাজের ওপর চাপানো যেমন অন্যায়, তেমনি পুলিশের কোনো সদস্যের অপরাধের দায় দিয়ে গোটা বাহিনীকে অসৎ বলা হলেও তা হবে একই ধরনের অন্যায্য সাধারণীকরণ।
যে নীতি সাংবাদিকদের জন্য প্রযোজ্য, সেই নীতি পুলিশের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। অভিযোগের ভিত্তি হতে হবে তথ্য-প্রমাণ, আর জবাবদিহির পথ হতে হবে আইনসম্মত।
আইজিপির বক্তব্য আরও বেশি উদ্বেগজনক কেন?
পুলিশের মহাপরিদর্শক শুধু একটি বাহিনীর প্রশাসনিক প্রধান নন; তাঁর বক্তব্য রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান থেকে আসে। তাঁর কথায় পুলিশের সদস্যরা প্রভাবিত হতে পারেন, সাধারণ মানুষও সাংবাদিকদের সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা পেতে পারেন। ফলে তাঁর অসতর্ক মন্তব্যের প্রভাব একজন সাধারণ বক্তার বক্তব্যের চেয়ে অনেক বেশি।
এমন বক্তব্যের মাধ্যমে যদি জনমনে এই ধারণা তৈরি হয় যে মাদক কারবারিদের কাছ থেকে অর্থ না পেলে সাংবাদিকেরা পুলিশের বিরুদ্ধে লেখেন, তাহলে স্বাধীন সাংবাদিকতার বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশকারী সাংবাদিকেরাও অযথা সন্দেহের মুখে পড়তে পারেন। একই সঙ্গে দুর্নীতি বা দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ নিয়ে সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের ওপর পরোক্ষ চাপ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
এখানেই বিষয়টির গভীরতা। সাংবাদিকতার স্বাধীনতা কেবল সাংবাদিকদের পেশাগত সুবিধার প্রশ্ন নয়; এটি নাগরিকের জানার অধিকার, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা এবং গণতান্ত্রিক জবাবদিহির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
পুলিশের সঙ্গে গণমাধ্যমের সম্পর্ক হওয়া উচিত পারস্পরিক শ্রদ্ধা, তথ্যের আদান-প্রদান এবং পেশাগত দায়িত্বের প্রতি সম্মানের ভিত্তিতে। সংবাদ প্রকাশের কারণে কোনো পুলিশ কর্মকর্তা ক্ষুব্ধ হতে পারেন, কোনো প্রতিবেদনের তথ্য নিয়ে আপত্তিও তুলতে পারেন। কিন্তু সেই আপত্তির ভাষা হতে হবে যুক্তিনির্ভর, প্রমাণসমর্থিত ও শালীন। পুলিশের সর্বোচ্চ পদে থেকে পুরো সাংবাদিক সমাজের সততা নিয়ে প্রশ্ন তোলা সেই মানদণ্ডের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।
ক্ষমা চাওয়া দুর্বলতা নয়, দায়িত্বশীলতার পরিচয়
ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ) আইজিপির বক্তব্য প্রত্যাহার করে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানিয়েছে। সংগঠনটি জানিয়েছে, দাবি পূরণ না হলে কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে। সাংবাদিকদের পেশাগত মর্যাদা ও স্বাধীন সাংবাদিকতা রক্ষার প্রশ্নে এই প্রতিবাদ যৌক্তিক।
তবে এখানে মূল বিষয় কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনের সঙ্গে বিরোধ নয়। প্রশ্নটি নীতির, দায়িত্বের এবং স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিবেশ রক্ষার। আইজিপি যদি মনে করেন তাঁর বক্তব্য ভুলভাবে উপস্থাপিত হয়েছে, তাহলে তাঁর উচিত পূর্ণ বক্তব্য পরিষ্কার করা এবং বিভ্রান্তির অবসান ঘটানো। আর যদি বক্তব্যের ভাষায় সাংবাদিকদের সম্পর্কে অন্যায্য সাধারণীকরণ ঘটে থাকে, তাহলে সেটি স্বীকার করে প্রকাশ্যে প্রত্যাহার ও দুঃখ প্রকাশ করাই হবে দায়িত্বশীল পদক্ষেপ।
রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা ব্যক্তিদের ভুল স্বীকার করতে শেখা প্রয়োজন। ভুল স্বীকার করলে মর্যাদা কমে না; বরং দায়িত্ববোধের পরিচয় পাওয়া যায়। ক্ষমতার অবস্থান থেকে বলা কোনো কথা মানুষের মর্যাদায় আঘাত করলে তার দায়ও স্বীকার করতে হয়।
আইজিপির কাছে তাই প্রশ্ন—তিনি কি প্রমাণ ছাড়া সাংবাদিকদের পেশাগত সততা নিয়ে এমন মন্তব্য করার যৌক্তিকতা দেখাতে পারবেন? পারবেন কি তথ্য-প্রমাণ দিয়ে তাঁর বক্তব্যের ভিত্তি ব্যাখ্যা করতে? নাকি তিনি স্বীকার করবেন যে এমন মন্তব্য দায়িত্বশীল অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়?
সাংবাদিকদের ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদ জরুরি
এই ঘটনায় সাংবাদিক সংগঠনগুলোর প্রতিবাদ গুরুত্বপূর্ণ। তবে শুধু বিবৃতি দিয়ে দায়িত্ব শেষ করলে চলবে না। পেশাগত সততা, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা, স্বাধীনভাবে সংবাদ সংগ্রহের অধিকার এবং সংবাদমাধ্যমের ওপর চাপ মোকাবিলায় সংগঠনগুলোর আরও কার্যকর ভূমিকা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে সাংবাদিকদের নিজেদের পেশাগত মান ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার উদ্যোগও জোরদার করতে হবে। কোনো সাংবাদিকের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে তার নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানাতে হবে। কিন্তু অভিযোগের নামে পুরো পেশাকে হেয় করার প্রবণতার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নিতে হবে।
সাংবাদিকদের সঙ্গে পুলিশের মতপার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু সেই মতপার্থক্য কখনোই স্বাধীন সাংবাদিকতার মর্যাদা ক্ষুণ্ন করার হাতিয়ার হতে পারে না। পুলিশ অপরাধ দমন করবে, সাংবাদিক অপরাধ ও অনিয়মের খবর প্রকাশ করবেন—এই দুই দায়িত্বের মধ্যে বিরোধ নয়, বরং জনস্বার্থে সহযোগিতার সম্পর্ক থাকা প্রয়োজন।
আইজিপির বক্তব্য প্রত্যাহার ও প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার দাবি তাই নিছক একটি সংগঠনের আলটিমেটাম নয়; এটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্রীয় আচরণ ও স্বাধীন সাংবাদিকতার প্রতি সম্মান প্রদর্শনের দাবি।
মনে রাখতে হবে, সাংবাদিকের কলম কোনো বাহিনীর মুখপাত্র নয়। সেই কলম কখনো পুলিশের ব্যর্থতা তুলে ধরবে, কখনো পুলিশের সাফল্যও তুলে ধরবে। সংবাদ যদি তথ্যভিত্তিক হয়, তবে তা অস্বস্তিকর হলেও গ্রহণ করতে হবে। আর সংবাদে ভুল থাকলে তার প্রতিবাদ করতে হবে তথ্য দিয়ে, অভিযোগ দিয়ে নয়।
আইজিপির পদ তাঁকে জবাবদিহির ঊর্ধ্বে তুলে দেয় না। বরং যত বড় দায়িত্ব, তত বেশি সংযম, সতর্কতা ও জবাবদিহির প্রয়োজন। সাংবাদিকদের পেশাগত সততা নিয়ে ঢালাও মন্তব্যের বদলে তাঁর কাছ থেকে আমরা সেই দায়িত্বশীলতারই প্রত্যাশা করি।
