বাবার স্মৃতির পথে, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ প্রাঙ্গণে
আইরীন নিয়াজী মান্না
উইমেননিউজ২৪
প্রকাশিত : ০৭:২২ পিএম, ৩০ অক্টোবর ২০২৬ শুক্রবার
কলেজের প্রধান গেটের সামনে লেখক।
দুর্গাপূজার ছুটিতে ঢাকা থেকে কুমিল্লায় বেড়াতে গেছিলাম। এক বিকেলে আমরা তিন বোন ঘুরতে গিয়েছিলাম কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজে। বহু বছরের ইচ্ছে ছিল ঐতিহ্যবাহী এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি নিজের চোখে দেখব। অবশেষে সেই ইচ্ছে পূরণ হলো। তবে অন্য জায়গায় বেড়াতে যাওয়ার পরিকল্পনা থাকায় আমাদের বাকি তিন ভাইবোন কুমিল্লা ভ্রমণে আমাদের সঙ্গী হতে পারেনি। তাই তিন বোনের ছোট্ট দল নিয়েই শুরু হয়েছিল আমাদের বহুদিনের প্রতীক্ষিত কলেজ দর্শন।রানীর দিঘির পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা ইতিহাসের সাক্ষী এই প্রাচীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক কেবল একটি কলেজকে ঘিরে নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের জীবনের সবচেয়ে শ্রদ্ধার, সবচেয়ে ভালোবাসার একটি নাম— আমাদের আব্বা।
আমাদের আব্বা ছিলেন এই কলেজের একজন মেধাবী ছাত্র। যে প্রাঙ্গণে একদিন তিনি ছাত্র হিসেবে হেঁটেছেন, যে আঙিনায় হয়তো বন্ধুদের সঙ্গে কাটিয়েছেন কত বিকেল, যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আলোয় নিজের জ্ঞান ও স্বপ্নকে সমৃদ্ধ করেছেন, এত বছর পর সেই কলেজের সামনে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছিল, সময় বুঝি এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেছে। অতীত আর বর্তমানের মাঝখানে তৈরি হয়েছে এক অদৃশ্য সেতু। সেই সেতু ধরে আমরা যেন ফিরে যাচ্ছিলাম আব্বার তারুণ্যের দিনগুলোতে।
আমরা তিন বোন পাশাপাশি হাঁটছিলাম, অথচ প্রত্যেকের মনের ভেতর হয়তো চলছিল আলাদা আলাদা স্মৃতির মিছিল। আমাদের সঙ্গে আব্বা ছিলেন না, কিন্তু তাঁকে ঘিরেই ছিল আমাদের এই আসা। তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে, তাঁর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সঙ্গে নিজেদের আরেকবার মিলিয়ে নিতে আমরা গিয়েছিলাম সেখানে।
মানুষ চলে যায়। সময়ের নিয়মে একদিন থেমে যায় তার পথচলা। কিন্তু তার জীবনের কিছু চিহ্ন থেকে যায়— কোনো বাড়িতে, কোনো রাস্তায়, কোনো গাছের ছায়ায়, কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পুরোনো প্রাঙ্গণে। সেই চিহ্নগুলোই কখনো কখনো আমাদের কাছে অমূল্য হয়ে ওঠে। মনে হয়, এই তো সেই পথ, এই তো সেই জায়গা, যেখানে একদিন হেঁটেছিলেন আমাদের প্রিয় মানুষটি। তাঁর পায়ের শব্দ আজ আর শোনা যায় না, কিন্তু স্মৃতির ভেতর সেই শব্দ যেন হারিয়ে যায়নি।
কলেজ প্রাঙ্গণে রানীর দিঘির পাড়ে দাঁড়িয়ে আমার বারবার মনে হচ্ছিল, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কেবল পাঠ্যবই, পরীক্ষা আর সনদের সমষ্টি নয়। এটি মানুষের জীবন গড়ার জায়গা, স্বপ্ন দেখার জায়গা, ভবিষ্যতের পথে নিজেকে তৈরি করার জায়গা। এই কলেজও একদিন আমাদের আব্বার জীবনের অংশ ছিল। এখানকার শিক্ষা, অভিজ্ঞতা আর তারুণ্যের দিনগুলো তাঁর জীবনের সঙ্গে মিশে আছে। সেই ইতিহাসের কাছে দাঁড়িয়ে আমাদের মনে হচ্ছিল, আমরা যেন আব্বার জীবনের একটি হারিয়ে যাওয়া দরজা খুঁজে পেয়েছি।
কী অদ্ভুত, তাই না! যে মানুষটির হাত ধরে আমাদের পৃথিবী চেনা, যাঁর ভালোবাসা আর আদর্শের ছায়ায় আমাদের বেড়ে ওঠা, তাঁর জীবনের এমন অনেক অধ্যায় থাকে, যেখানে আমরা কখনো উপস্থিত ছিলাম না। তাঁর শৈশব, কৈশোর, ছাত্রজীবন— সবই আমাদের জন্মের আগের গল্প। অথচ একদিন সেই গল্পের কোনো একটি জায়গায় এসে দাঁড়ালে মনে হয়, এও তো আমাদেরই ইতিহাস। বাবার অতীতের ভেতর দিয়েই তো আমাদের শিকড়ের সন্ধান।
সেই বিকেলটি তাই আমাদের কাছে নিছক কোথাও বেড়াতে যাওয়া ছিল না। ছিল শিকড়ের কাছে ফিরে যাওয়া, বাবার স্মৃতির কাছে নীরবে মাথা নত করা। আমরা হয়তো তাঁর ছাত্রজীবনের দিনগুলো ফিরে পাব না, তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে কলেজের গল্প শোনার সুযোগও আর নেই। তবু তাঁর স্মৃতিবিজড়িত এই প্রাঙ্গণে এসে মনে হলো, ভালোবাসার মানুষকে স্মরণ করার জন্য সব সময় তাঁর কাছে থাকা লাগে না। কখনো কখনো তাঁর জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা কোনো একটি জায়গাই হয়ে ওঠে তাঁর কাছে পৌঁছানোর পথ।
আব্বা, তুমি আজ আমাদের সঙ্গে নেই। কিন্তু তোমার স্মৃতি আছে, তোমার জীবন আছে, আছে তোমার রেখে যাওয়া ভালোবাসা আর আদর্শ। গতকাল তোমার সেই পুরোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছিল, তোমাকে আরেকবার নতুন করে চিনলাম। তোমার জীবনের একটি অধ্যায়কে ছুঁয়ে দেখলাম আমরা তিন বোন।
ফিরে আসার সময় রানীর দিঘির পাড়ে ফেলে এলাম না আমাদের স্মৃতি। বরং সঙ্গে নিয়ে এলাম এক টুকরো অতীত, কিছু নীরব অনুভূতি আর বুকের গভীরে জমে থাকা অগাধ ভালোবাসা।
বাবার স্মৃতি কখনো পুরোনো হয় না। সময় শুধু সেই স্মৃতির ওপর আরও একটু মমতার প্রলেপ দিয়ে যায়।
