ঢাকা, শনিবার ৩১, অক্টোবর ২০২৬ ১৮:৪১:৫৬ পিএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

রানীর দিঘির পাড়: জমে আছে কত ইতিহাস, কত স্মৃতি

আইরীন নিয়াজী মান্না

উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ০৪:২৮ পিএম, ৩১ অক্টোবর ২০২৬ শনিবার

ছবি: লেখক।

ছবি: লেখক।

কুমিল্লা শহরের বুকে এমন কিছু জায়গা আছে, যেখানে দাঁড়ালে মনে হয়, সময় বুঝি তার সমস্ত ব্যস্ততা থামিয়ে অতীতের দরজা খুলে দিয়েছে। চারপাশের পরিচিত দৃশ্যের মধ্যেও তখন চোখের সামনে ভেসে ওঠে হারিয়ে যাওয়া দিনের ছবি। মনে হয়, এই পথ দিয়েই একদিন হেঁটে গেছেন কত মানুষ, এই গাছের ছায়ায় বসেই হয়তো কেউ ভেবেছেন জীবনের কথা, আর এই জলরাশির দিকে তাকিয়ে কেউ ডুব দিয়েছেন গভীর চিন্তায়। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের পাশের রানীর দিঘি তেমনই এক স্মৃতিবিজড়িত স্থান।

রানীর দিঘি কেবল একটি জলাশয় নয়; এটি কুমিল্লার ইতিহাস, শিক্ষা, সাহিত্য ও মানুষের স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি পরিচিত নাম। দিঘির শান্ত জল আর তার চারপাশের পরিবেশের দিকে তাকালে মনে হয়, কত যুগের কত গল্প নীরবে জমা হয়ে আছে এখানে! সময় বদলেছে, শহর বদলেছে, মানুষের জীবন বদলেছে; কিন্তু কিছু জায়গা তাদের অতীতের ছায়া বুকে ধারণ করে আজও দাঁড়িয়ে থাকে।

এই দিঘির পাড়ের কাছেই রয়েছে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজ। ১৮৯৯ সালে রায় বাহাদুর আনন্দচন্দ্র রায়ের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে কুমিল্লা অঞ্চলের শিক্ষা ও সংস্কৃতির বিকাশে ভূমিকা রেখে চলেছে। কত শিক্ষার্থী এই প্রাঙ্গণে এসে জ্ঞান অর্জন করেছেন, কত স্বপ্ন নিয়ে জীবনের পথে যাত্রা শুরু করেছেন, কত মানুষের ভবিষ্যৎ নির্মিত হয়েছে এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষায়! তাঁদের পদচারণা, আনন্দ-বেদনা, স্বপ্ন ও সাফল্যের অসংখ্য স্মৃতি যেন মিশে আছে এর পুরোনো ভবন, পথ আর প্রাঙ্গণের সঙ্গে।

রানীর দিঘির নামের উৎপত্তির বিষয়ে স্থানীয় ইতিহাস ও জনশ্রুতিতে নানা কথা প্রচলিত আছে। এগুলোর সঠিক কোনো যুক্তি আছে বলে মনে হয় না। দিঘিটি কে বা কারা খনন করেছিলেন, কোন সময়ে করেছিলেন এবং কোন রানির নাম অনুসারে এর নাম রাণীর দিঘি হয়েছে—এসব বিষয়ে নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক তথ্য নেই। তবে এই দিঘির পাড়ের সঙ্গে সাহিত্য ও সংস্কৃতির যে স্মৃতির যোগসূত্র রয়েছে, তার মধ্যে কাজী নজরুল ইসলামের কুমিল্লা-জীবন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ১৯২১ থেকে ১৯২৩ সালের মধ্যে কবি একাধিকবার কুমিল্লায় এসেছিলেন। এই শহরের মানুষের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক, তাঁর প্রেম, গান ও সাহিত্যচর্চার নানা অধ্যায় বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। রানীর দিঘির পাড়ে তাঁর সময় কাটানোর কথা স্থানীয় স্মৃতিচারণ ও সাহিত্যবিষয়ক লেখায় উঠে এসেছে। তবে সেই স্মৃতির নির্দিষ্ট ঘটনা ও সময়কাল নিয়ে আরও প্রামাণ্য তথ্যের প্রয়োজন রয়েছে।

ভাবতে ভালো লাগে, এক শতাব্দী আগে এই শহরের পথঘাট কেমন ছিল! কেমন ছিল দিঘির পাড়ের বিকেল, মানুষের চলাচল, কলেজের শিক্ষার্থীদের আড্ডা? সেই সময়ের কুমিল্লা আর আজকের কুমিল্লার মধ্যে কত ব্যবধান! অথচ ইতিহাসের কিছু চিহ্ন আমাদের কল্পনায় দুই সময়কে পাশাপাশি এনে দাঁড় করায়। তখন মনে হয়, অতীত কখনো পুরোপুরি হারিয়ে যায় না; স্মৃতি আর ইতিহাসের ভেতর দিয়ে সে বারবার ফিরে আসে।

রানীর দিঘির পাড়ের সঙ্গে আমার নিজের সম্পর্কটিও তেমনই এক আবেগের গল্প।

গতকাল বিকেলে আমি আমার দুই বোনকে নিয়ে গিয়েছিলাম কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজ দেখতে। আমাদের আব্বা ছিলেন এই কলেজের একজন মেধাবী ছাত্র। তাঁর ছাত্রজীবনের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতেই আমাদের এই যাওয়া। কলেজের প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছিল, আমরা যেন শুধু একটি পুরোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দেখতে আসিনি; এসেছি আব্বার জীবনের একটি অধ্যায়ের কাছে, তাঁর তারুণ্যের দিনগুলোর দিকে ফিরে তাকাতে।

যে প্রাঙ্গণে একদিন তিনি ছাত্র হিসেবে হেঁটেছেন, যে পরিবেশে তাঁর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় কেটেছে, সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে তাঁকে খুব কাছের মানুষ বলে মনে হচ্ছিল। সময়ের ব্যবধানে আমরা তাঁর সেই দিনগুলো দেখতে পাইনি, তাঁর ছাত্রজীবনের গল্পগুলোও হয়তো আমাদের জানা নেই। তবু তাঁর স্মৃতিবিজড়িত এই প্রাঙ্গণে এসে মনে হলো, ইতিহাস কেবল বইয়ের পাতায় লেখা থাকে না; কখনো কখনো তা আমাদের পরিবারের স্মৃতির সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িয়ে থাকে।

একটি দিঘির পাড়ে কত মানুষের কত রকম ইতিহাস জমা হতে পারে! কারও স্মৃতি সাহিত্যের, কারও শিক্ষার, কারও সংগ্রামের, কারও ভালোবাসার। রানীর দিঘির পাড়েও তেমন অসংখ্য গল্প ছড়িয়ে আছে। আর আমাদের কাছে এই জায়গার বিশেষ অর্থ হলো, এটি আমাদের আব্বার ছাত্রজীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই এই প্রাঙ্গণে দাঁড়ালে কুমিল্লার ইতিহাসের পাশাপাশি আমাদের নিজেদের পারিবারিক ইতিহাসও নতুন করে অনুভব করি।

সময়ের স্রোত বয়ে যায়, মানুষ একদিন চলে যায়, কিন্তু তার জীবনের কিছু চিহ্ন থেকে যায় পরিচিত কোনো স্থানে, কোনো পুরোনো প্রতিষ্ঠানে, কিংবা প্রিয় কোনো মানুষের মনে। সেই চিহ্নগুলোই একসময় হয়ে ওঠে ফিরে দেখার অবলম্বন। রানীর দিঘির পাড়ে দাঁড়িয়ে তাই মনে হয়, জলরাশির মতো স্মৃতিও বহমান। তার গভীরে লুকিয়ে থাকে কত না বলা কথা, কত হারিয়ে যাওয়া দিন, কত প্রিয় মুখ।

রানীর দিঘি আজও তার নিজস্ব ইতিহাস নিয়ে কুমিল্লার বুকে দাঁড়িয়ে আছে। তার পাড়ে এসে কেউ খুঁজে পান শহরের অতীত, কেউ সাহিত্যের স্মৃতি, কেউবা নিজের জীবনের হারিয়ে যাওয়া অধ্যায়। আর আমরা তিন বোন খুঁজে ফিরেছি আমাদের আব্বার তারুণ্যের দিনগুলো—যে দিনগুলো আমাদের চোখে দেখা নয়, অথচ আমাদের হৃদয়ের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

কিছু জায়গা শুধু মানচিত্রে চিহ্নিত থাকে না; তারা বেঁচে থাকে মানুষের স্মৃতিতে। রানীর দিঘির পাড় আমাদের কাছে তেমনই এক জায়গা—যেখানে কুমিল্লার ইতিহাসের সঙ্গে মিশে আছে আমাদের আব্বার স্মৃতি, শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা।