ঢাকা, রবিবার ০১, নভেম্বর ২০২৬ ১৯:৩১:১০ পিএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

আজ শিশুসাহিত্যিক ফারুক নওয়াজের জন্মদিন

রাতুল মাঝি

উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ০৫:১৬ পিএম, ১ নভেম্বর ২০২৬ রবিবার

দেশের বিশিষ্ট শিশুসাহিত্যিক ও ছড়াকার ফারুক নওয়াজ।

দেশের বিশিষ্ট শিশুসাহিত্যিক ও ছড়াকার ফারুক নওয়াজ।

দেশের বিশিষ্ট শিশুসাহিত্যিক, ছড়াকার, কবি ও কথাসাহিত্যিক ফারুক নওয়াজের জন্মদিন আজ। ১৯৫৮ সালের ১ নভেম্বর তিনি খুলনা শহরে তাঁর নানাবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। শিশু-কিশোরদের জন্য ছড়া, কবিতা, গল্প, উপন্যাস, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সাহিত্য ও ইতিহাসনির্ভর রচনাসহ বিপুলসংখ্যক বই লিখে বাংলা শিশুসাহিত্যে নিজের স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেছেন তিনি। তাঁর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা সাড়ে তিন শতাধিক।

ফারুক নওয়াজের পৈতৃক নিবাস মাগুরা জেলার শ্রীপুর উপজেলার মুজদিয়া গ্রামে। তাঁর বাবা কাজী মাবুদ নওয়াজ এবং মা কাজী জাহানারা। তিনিই ছিলেন তাঁদের চতুর্থ সন্তান। পরিবারে সাহিত্য ও সংস্কৃতিচর্চার পরিবেশ ছিল। কবি কাজী কাদের নেওয়াজ তাঁর বড় চাচা। পরিবারের অন্য সদস্যদেরও লেখালেখির অভ্যাস ছিল। ছোটবেলা থেকেই সেই পরিবেশে তাঁর সাহিত্যচর্চার সূচনা।

মাত্র ১০ বছর বয়সে, ১৯৬৯ সালে পত্রপত্রিকার ছোটদের পাতায় তাঁর লেখা প্রকাশিত হতে শুরু করে। এর আগে পরিবারের সদস্যদের উদ্যোগে প্রকাশিত দেয়ালিকায় তাঁর লেখা ও আঁকা ছাপা হতো। বড় ভাইয়ের উৎসাহ এবং বিশিষ্ট শিশুসাহিত্যিক রোকনুজ্জামান খানের পৃষ্ঠপোষকতা তাঁর লেখক হয়ে ওঠার পথকে আরও সহজ করে। কবি আহসান হাবীবের সহযোগিতাও পেয়েছেন তিনি।

শুরুতে বড়দের জন্য কবিতা লিখতেন ফারুক নওয়াজ। ১৯৭৭ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'আগুনের বৃষ্টি'। পরবর্তী সময়ে জীবনের এক গভীর ব্যক্তিগত শোক তাঁকে শিশু-কিশোর সাহিত্যের দিকে আরও নিবিড়ভাবে টেনে নেয়। নিজের শিশু সন্তান আকাশের মৃত্যুর পর সন্তানকে ঘিরে লেখা 'আমার একটা আকাশ ছিল' গ্রন্থটি ১৯৮৮ সালে মুক্তধারা থেকে প্রকাশিত হয়। বইটি তাঁর শিশুসাহিত্য রচনার ক্ষেত্রে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। গ্রন্থটি দুবার অগ্রণী ব্যাংক শিশুসাহিত্য পুরস্কার অর্জন করে।

ফারুক নওয়াজ খুলনা, মাগুরা, যশোর ও ঢাকার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করেছেন। তিনি ইসলামের ইতিহাস ও বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। পেশাগত জীবনে বাংলাদেশ শিশু একাডেমির সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। তিনি শিশু একাডেমির প্রোগ্রাম অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। পাশাপাশি মাসিক 'শিশু' পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক হিসেবেও কাজ করেছেন।

বহুমাত্রিক সাহিত্যকর্ম

ফারুক নওয়াজের সাহিত্যকর্মের বড় একটি অংশজুড়ে রয়েছে শিশু-কিশোরদের উপযোগী ছড়া, কবিতা, গল্প ও উপন্যাস। তাঁর লেখায় শৈশবের আনন্দ, প্রকৃতি, পাখি, পরিবার, সমাজ, দেশপ্রেম, ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধের নানা অনুষঙ্গ উঠে এসেছে। শিশুদের কল্পনাশক্তি ও মনন বিকাশের পাশাপাশি ইতিহাস ও দেশ সম্পর্কে জানার আগ্রহ তৈরি করাও তাঁর লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

তাঁর উল্লেখযোগ্য ছড়া ও কিশোর কবিতার বইয়ের মধ্যে রয়েছে 'আমার একটা আকাশ ছিল', 'নাম ছিল তার টুই', 'একাত্তরের বর্গি', 'মায়ের ছড়া ভাষার ছড়া', 'ওই পাখি নীল পাখি', 'আমি একদিন গল্প হয়ে যাবো', 'পাখিরা যখন ঘুমায়', 'আজব মানুষ' ও 'সোনার টুকরো ছেলে'।

কিশোর গল্প ও উপন্যাসের মধ্যে উল্লেখযোগ্য 'মধ্যরাতের আগন্তুক', 'আঁধারবাড়ির আতঙ্ক', 'বল্টু ইজ এ গুড বয়', 'মাই নেম ইজ হিরুমিয়া', 'স্বাধীনতার সাঁকো', 'ভুতুড়ে শহর', 'একাত্তরের পাখি', 'আমাদের একটি পাখি আছে', 'ঝুমঝুমপুর রহস্য' এবং 'বঙ্গবন্ধু ও একটি সুন্দর সকাল'।

মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক কিশোর সাহিত্য রচনায়ও তাঁর বিশেষ আগ্রহ রয়েছে। এ বিষয়ে তাঁর ২৮টি কিশোর উপন্যাস রয়েছে বলে ২০২৫ সালে এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধ, শহীদ বুদ্ধিজীবী এবং বাংলাদেশের ইতিহাস নিয়ে তিনি গল্প, উপন্যাস ও কবিতা লিখেছেন। তাঁর রচনায় ইতিহাসকে শিশু-কিশোরদের কাছে সহজবোধ্য ও আকর্ষণীয় করে উপস্থাপনের প্রয়াস লক্ষ করা যায়।

পুরস্কার ও স্বীকৃতি

সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতিস্বরূপ ফারুক নওয়াজ পেয়েছেন বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কার ও সম্মাননা। এর মধ্যে রয়েছে অগ্রণী ব্যাংক শিশুসাহিত্য পুরস্কার, এম. নুরুল কাদের শিশুসাহিত্য পুরস্কার, মধুসূদন একাডেমি পুরস্কার, ড. শহীদুল্লাহ পাঠাগার সম্মাননা, পূরবী সম্মাননা, প্রিয়জন অ্যাওয়ার্ড, পালক অ্যাওয়ার্ড, ছোটদের মেলা সম্মাননা ও নজরুল সাহিত্য পরিষদ পুরস্কার। 

শিশুসাহিত্যে দীর্ঘ পথচলা

শৈশব থেকেই লেখালেখিকে নেশা হিসেবে গ্রহণ করেছেন ফারুক নওয়াজ। কয়েক দশকের সাহিত্যজীবনে তিনি শিশু-কিশোরদের জন্য যেমন বিপুলসংখ্যক বই লিখেছেন, তেমনি বড়দের জন্যও কবিতা ও অন্যান্য সাহিত্য রচনা করেছেন। তাঁর লেখালেখির ব্যাপ্তি এবং বিষয়বৈচিত্র্য তাঁকে বাংলাদেশের শিশুসাহিত্যের পরিচিত ও উল্লেখযোগ্য লেখকদের একজন করে তুলেছে।

এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন, বই পড়া তাঁর প্রিয় শখ। লেখালেখির পাশাপাশি বই পড়ার মধ্য দিয়েই তিনি নিজের সাহিত্যজগৎকে সমৃদ্ধ করার চেষ্টা করেন। তাঁর প্রথম শিশুসাহিত্যগ্রন্থ 'আমার একটি আকাশ ছিল' লেখার পেছনে রয়েছে সন্তানের প্রতি গভীর ভালোবাসা ও বেদনার স্মৃতি। 

জন্মদিনে শিশুসাহিত্যিক ফারুক নওয়াজের প্রতি রইল শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। তাঁর সাহিত্যকর্ম নতুন প্রজন্মের পাঠকদের বই পড়তে, ভাবতে এবং নিজেদের ইতিহাস ও দেশকে জানতে অনুপ্রাণিত করুক।