ঢাকা, মঙ্গলবার ০৩, নভেম্বর ২০২৬ ১৫:৫৬:২৫ পিএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

কুমিল্লার ব্লু ওয়াটার পার্কে দুই দিনের আনন্দভ্রমণ

আইরীন নিয়াজী মান্না

উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ১২:৪৮ পিএম, ৩ নভেম্বর ২০২৬ মঙ্গলবার

ছবি: উইমেননিউজ২৪.কম।

ছবি: উইমেননিউজ২৪.কম।

কিছু ভ্রমণ থাকে ইতিহাসের টানে, কিছু ভ্রমণ প্রকৃতির কাছে যাওয়ার জন্য। আর কিছু ভ্রমণ আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যায় শৈশবের আনন্দে। কুমিল্লার ব্লু ওয়াটার পার্কে আমাদের এবারের ভ্রমণ ছিল তেমনই এক অভিজ্ঞতা।যেখানে ছিল ঝুলন্ত সেতুর রোমাঞ্চ, সুইমিং পুলের জলকেলি, প্যাডেল বোটে ঘোরার আনন্দ, নাগরদোলার উচ্ছ্বাস আর ছোট্ট টয় ট্রেনে চড়ার মজা। আছে বিশাল সেমিনার রুম। ইনডোর ও আউটরোডে ব্যাডবিন্টন খেলায় দারুণ আয়োজন। আর একশ’র অধিক কবুতরের ছোটাছুটি, উড়ে চলা আর বাকুম বাকুম ডাক। সবুজে ঘেরা এই পার্কে রয়েছে নানা রকমের ফুল ও ফলের গাছ। এর সঙ্গে আছে একজন মানুষের স্বপ্ন দিয়ে গড়ে তোলা একটি বিনোদনকেন্দ্রকে কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতা।

 

গত বৃহস্পতিবার সকালে আমরা পরিবারের ৭ সদস্য গেলাম কুমিল্লার কোটবাড়ি-শালমানপুর এলাকার ব্লু ওয়াটার পার্কে। ঢাকার ব্যস্ত জীবন থেকে বেরিয়ে কুমিল্লায় কয়েকটি দিন কাটানোর পরিকল্পনা ছিল। শহরটির ইতিহাস, ঐতিহ্য আর স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলো দেখার পাশাপাশি এবার আমাদের গন্তব্য ছিল আনন্দের এক ভিন্ন জগৎ। শনিবার রাতে ঢাকায় ফিরে মনে হলো, এই সফর শুধু ঘোরাঘুরির স্মৃতি নয়, নতুন কিছু দেখা এবং মানুষের স্বপ্নের সঙ্গে পরিচিত হওয়ারও অভিজ্ঞতা।

ঝুলন্ত সেতু—রোমাঞ্চের এক অন্য নাম:
ব্লু ওয়াটার পার্কের অন্যতম আকর্ষণ এর বিশাল ঝুলন্ত সেতু। পার্ক কর্তৃপক্ষের পরিচিতিতে এটিকে দেশের সবচেয়ে বড় ঝুলন্ত সেতু হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এমন একটি সেতুতে হাঁটার অভিজ্ঞতা নিঃসন্দেহে আলাদা। সেতুর ওপর দিয়ে এগিয়ে যাওয়া, নিচের দিকে তাকানো, চারপাশের দৃশ্য উপভোগ করা—সবকিছুতেই রয়েছে একটু শিহরণ, একটু রোমাঞ্চ।

ঝুলন্ত সেতু শুধু এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যাওয়ার পথ নয়; এটি দর্শনার্থীদের জন্য একটি বিশেষ অভিজ্ঞতা। ছবি তোলা, প্রকৃতির কাছাকাছি থাকা এবং ভ্রমণের স্মৃতি ধরে রাখার জন্যও এমন জায়গা আকর্ষণীয়। 

একাধিক সুইমিং পুল—জলে আনন্দের আয়োজন:
পার্কটির আরেকটি বড় আকর্ষণ একাধিক সুইমিং পুল। যারা সাঁতার কাটতে কিংবা পানিতে সময় কাটাতে ভালোবাসেন, তাঁদের জন্য এটি বাড়তি আনন্দের সুযোগ। গরমের দিনে পানিতে নেমে শরীর ও মনকে সতেজ করার অনুভূতি অন্য রকম।

একটি পার্কে একাধিক পুল থাকলে বিভিন্ন বয়সের দর্শনার্থীদের জন্য সুবিধা তৈরি হয়। পুলের গভীরতা, শিশুদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা, প্রশিক্ষিত তত্ত্বাবধায়ক এবং নিরাপত্তার ব্যবস্থা রয়েছে। 

প্যাডেল বোটে জলের বুকে:
জলের ওপর ধীরে ধীরে এগিয়ে চলার আনন্দ পেতে রয়েছে প্যাডেল বোট। নিজের পায়ের চাপে বোট এগিয়ে নেওয়া, জলের ওপর দিয়ে ঘুরে বেড়ানো আর চারপাশের দৃশ্য উপভোগ করা—এ এক শান্ত অথচ আনন্দদায়ক অভিজ্ঞতা।

যাঁরা খুব রোমাঞ্চকর রাইড পছন্দ করেন না, তাঁদের জন্যও প্যাডেল বোটে চড়া উপভোগ্য হতে পারে। পরিবার কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে এমন সময় কাটানোর মধ্যে থাকে এক ধরনের স্বস্তি। ব্যস্ত জীবনের তাড়াহুড়ো ভুলে কিছুক্ষণ ধীরে চলার সুযোগ মেলে।

নাগরদোলায় আকাশ ছোঁয়ার আনন্দ:
নাগরদোলা যেন মেলার চিরচেনা আনন্দকে ফিরিয়ে আনে। ধীরে ধীরে ওপরে ওঠা, চারপাশকে উঁচু থেকে দেখা, আবার নিচে নেমে আসা—এই ওঠানামার মধ্যেই লুকিয়ে আছে নাগরদোলার মজা।

শিশুদের কাছে এটি রোমাঞ্চকর, আর বড়দের কাছে শৈশবের স্মৃতি ফিরে পাওয়ার উপলক্ষ। নাগরদোলায় চড়ে নিচের দৃশ্য দেখতে দেখতে মনে হতে পারে, পরিচিত পৃথিবীটাকেও যেন নতুন করে দেখা হচ্ছে।

টয় ট্রেনে ছোট্ট এক সফর:
পার্কে রয়েছে টয় ট্রেনও। বিশেষ করে শিশুদের জন্য এটি আনন্দের একটি আকর্ষণ। ছোট্ট ট্রেনে চড়ে পার্কের ভেতর ঘুরে বেড়ানোর অভিজ্ঞতা তাদের কাছে হতে পারে ভ্রমণের অন্যতম প্রিয় অংশ। এমন কি বড়দের জন্যও এই আনন্দ কম নং।

সব শিশুর পছন্দ এক নয়। কেউ পানিতে আনন্দ পায়, কেউ নাগরদোলায়, কেউ আবার ছোট্ট ট্রেনে বসে চারপাশ দেখতে ভালোবাসে। তাই বিভিন্ন ধরনের বিনোদনের ব্যবস্থা একটি পার্ককে সব বয়সের মানুষের কাছে আকর্ষণীয় করে তুলেছে।

আরও কত রকম বিনোদন:
ঝুলন্ত সেতু, সুইমিং পুল, প্যাডেল বোট, নাগরদোলা ও টয় ট্রেন ছাড়াও পার্কে রয়েছে নানা ধরনের রাইড ও বিনোদনের আয়োজন। কোথাও ছবি তোলার সুযোগ, কোথাও পরিবার নিয়ে সময় কাটানোর পরিবেশ, আবার কোথাও বন্ধুদের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার উপলক্ষ।

একটি বিনোদন পার্কের সার্থকতা শুধু তার আকারে নয়; সেখানে গিয়ে মানুষ কতটা আনন্দ পাচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারের কেউ রাইডে চড়বেন, কেউ পুলের পাশে সময় কাটাবেন, কেউ ছবি তুলবেন, আবার কেউ হেঁটে পুরো পরিবেশ ঘুরে দেখবেন—সব মিলিয়েই তৈরি হবে একটি দিনের স্মৃতি।

তবে কোন রাইড চালু আছে, কোনটির জন্য আলাদা টিকিট লাগে এবং প্রবেশমূল্যের সঙ্গে কী কী সুবিধা অন্তর্ভুক্ত—এসব তথ্য যাওয়ার আগে জেনে নেওয়া ভালো।

মিজানুর রহমানের স্বপ্ন দিয়ে গড়ে ওঠা পার্ক:
একটি বিনোদন পার্কে ঘুরতে গিয়ে আমরা সাধারণত তার সেতু, রাইড, সুইমিং পুল কিংবা সাজানো পরিবেশ দেখি। কিন্তু এর পেছনে যে একজন মানুষের স্বপ্ন, পরিকল্পনা, শ্রম ও বিনিয়োগ রয়েছে, সে কথা সব সময় মনে আসে না।

ব্লু ওয়াটার পার্কের কর্ণধার মিজানুর রহমান অনেক স্বপ্ন নিয়ে এটি গড়ে তুলেছেন। একটি বিনোদনকেন্দ্র নির্মাণ করা সহজ কাজ নয়। পরিকল্পনা, অবকাঠামো তৈরি, নানা ধরনের রাইডের ব্যবস্থা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং দর্শনার্থীদের চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রয়োজন ধৈর্য, শ্রম ও দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা।

বাংলাদেশের জেলা শহরগুলোতে পরিবার নিয়ে আনন্দে সময় কাটানোর মতো ভালো বিনোদনকেন্দ্রের গুরুত্ব অনেক। মানুষ সব সময় দূরে কোথাও বেড়াতে যেতে পারে না। রাজধানীর কাছাকাছি একটি জায়গায় গিয়ে যদি পরিবারের সবাই মিলে আনন্দ করতে পারে, শিশুদের হাসি উপভোগ করতে পারে, তবে সেটিও জীবনের এক মূল্যবান প্রাপ্তি।

মিজানুর রহমানের উদ্যোগকে তাই শুধু একটি পার্ক নির্মাণের ঘটনা হিসেবে দেখলে হবে না। এটি একটি স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার প্রচেষ্টা। সেই স্বপ্নকে আরও সফল করতে প্রয়োজন পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, নিরাপদ রাইড, প্রশিক্ষিত কর্মী, সুইমিং পুলের যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ এবং দর্শনার্থীদের জন্য উন্নত সেবা।

একজন উদ্যোক্তার স্বপ্ন তখনই পূর্ণতা পায়, যখন তাঁর তৈরি জায়গা মানুষের জীবনে আনন্দ যোগ করে, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে এবং একটি অঞ্চলের পরিচিতি বাড়াতে সাহায্য করে।

এ প্রসঙ্গে মিজানুর রহমান বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ থেকে পড়াশোনা শেষ করে কিছুদিন বিভিন্ন জায়গায় চাকরি করেছি। এরপর স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে লন্ডনে চলে যাই। ভেবেছিলাম, বিদেশে হয়তো নতুনভাবে জীবন গুছিয়ে নিতে পারব। কিন্তু লন্ডনে থেকেও মন পড়ে থাকত দেশে। নিজের মাটি, নিজের মানুষ, দেশের প্রকৃতি—সবকিছুর জন্য ভীষণ মন কেমন করত। একটা সময় বুঝতে পারলাম, বিদেশে থাকা হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু মনটা সেখানে নেই।

ভাবতে শুরু করলাম, দেশে ফিরে এমন কী করা যায়, যেখানে নিজের কাজও হবে, আবার নিজের মাটি, মানুষ আর প্রকৃতির সঙ্গেও থাকা যাবে। এমন কিছু করতে চেয়েছিলাম, যা শুধু আমার জীবিকার মাধ্যম হবে না, মানুষের আনন্দেরও কারণ হবে। প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের একটা সুন্দর সম্পর্ক তৈরি হবে।

তিনি বলেন, কুমিল্লায় আমাদের পৈতৃক কিছু জমি ছিল। জমিগুলো অনেকটা পতিত অবস্থায় পড়ে ছিল। সেই জমিকে ঘিরেই স্বপ্ন দেখতে শুরু করি। ভাবলাম, এখানে যদি এমন একটি জায়গা তৈরি করা যায়, যেখানে মানুষ পরিবার নিয়ে বেড়াতে আসবে, শিশুরা আনন্দ করবে, প্রকৃতির সান্নিধ্য পাবে, তাহলে কেমন হয়! সেই ভাবনা থেকেই ব্লু ওয়াটার পার্কের যাত্রা শুরু।

কাজটি মোটেও সহজ ছিল না। শুরু থেকে নানা প্রতিবন্ধকতা এসেছে। অনেক সীমাবদ্ধতা, অর্থনৈতিক চাপ, পরিকল্পনার পরিবর্তন—সবকিছুর মধ্য দিয়েই এগোতে হয়েছে। কখনো মনে হয়েছে, এত বড় স্বপ্ন বাস্তবায়ন করা বোধ হয় সম্ভব হবে না। কিন্তু হাল ছাড়িনি। কারণ এটি আমার কাছে শুধু একটি পার্ক তৈরির প্রকল্প ছিল না; এটি ছিল নিজের মাটিতে নিজের মতো করে বেঁচে থাকার স্বপ্ন।

তিনি আরও বলেন, প্রায় ১৫ বছরের দীর্ঘ পথচলা, পরিশ্রম ও লড়াইয়ের পর আজ যখন দেখি মানুষ এখানে আসছে, পরিবার-পরিজন নিয়ে সময় কাটাচ্ছে, শিশুরা আনন্দে মেতে উঠছে, তখন সত্যিই ভালো লাগে। মনে হয়, এত দিনের পরিশ্রম সার্থক হয়েছে।

আমি বিশ্বাস করি, নিজের দেশেও অনেক কিছু করার সুযোগ রয়েছে। প্রয়োজন শুধু স্বপ্ন দেখার, সেই স্বপ্নের জন্য পরিশ্রম করার এবং লেগে থাকার। লন্ডনে বসে যে স্বপ্ন দেখেছিলাম, আজ কুমিল্লার মাটিতে দাঁড়িয়ে তার বাস্তব রূপ দেখতে পাচ্ছি। এর চেয়ে বড় তৃপ্তি আমার কাছে আর কিছু হতে পারে না।

বৃহস্পতিবারের সকাল থেকে শনিবারের রাত:
বৃহস্পতিবার সকালে শুরু হওয়া আমাদের ভ্রমণের পরিসমাপ্তি ঘটল শনিবার রাতে ঢাকায় ফিরে। কিন্তু ভ্রমণ শেষ হলেই কি তার গল্প শেষ হয়ে যায়? বরং ফিরে আসার পরই স্মৃতিগুলো নতুন করে সাজতে শুরু করে।

কুমিল্লার এই সফরে ছিল ইতিহাসের টান, পুরোনো স্থাপনার স্মৃতি, শহরের জলাশয়ের সৌন্দর্য, আর তার পাশাপাশি ব্লু ওয়াটার পার্কের আনন্দময় পরিবেশ। ঝুলন্ত সেতু, একাধিক সুইমিং পুল, প্যাডেল বোট, নাগরদোলা ও টয় ট্রেন—সব মিলিয়ে এটি ছিল আমাদের ভ্রমণের এক ভিন্ন অধ্যায়।

আরও একটি বিষয় মনে রয়ে গেল—মানুষের স্বপ্নের কথা। একজন মানুষ কোনো একটি উদ্যোগের কথা ভাবেন, তারপর ধীরে ধীরে সেটিকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেন। সেই উদ্যোগে যুক্ত হয় শ্রম, অর্থ, সময় এবং অনেক প্রত্যাশা। মিজানুর রহমানের স্বপ্ন দিয়ে গড়ে ওঠা ব্লু ওয়াটার পার্ক আমাদের সেই কথাই মনে করিয়ে দেয়।

শনিবার রাতে ঢাকায় ফিরে আবার শুরু হবে পরিচিত জীবনের ব্যস্ততা। কিন্তু ভ্রমণের কিছু দৃশ্য, কিছু ছবি আর কিছু অনুভূতি মনের মধ্যে থেকে যাবে। হয়তো কোনো একদিন ছবিগুলো দেখতে দেখতে আবার মনে পড়বে কুমিল্লার সেই সকাল, ঝুলন্ত সেতুর রোমাঞ্চ, জলের পাশে কাটানো সময় আর মানুষের স্বপ্ন দিয়ে গড়ে তোলা ব্লু ওয়াটার পার্কের কথা।

ভ্রমণ আমাদের শুধু নতুন জায়গা দেখায় না; মানুষের উদ্যোগ, স্বপ্ন ও আনন্দকে নতুন করে চিনতেও শেখায়। ব্লু ওয়াটার পার্কে আমাদের এই সফর তাই শুধু একটি বিনোদনকেন্দ্র ঘুরে দেখার গল্প নয়—এটি স্বপ্নকে বাস্তব করার চেষ্টার গল্পও।

লেখক: শিশুসাহিত্যিক ও সাংবাদিক। সম্পাদক- উইমেননিউজ২৪.কম