যুদ্ধের ময়দানে এক নারী রিপোর্টার: মার্থা গেলহর্নের জন্মদিন আজ
অনলাইন ডেস্ক
উইমেননিউজ২৪
প্রকাশিত : ০৩:০২ পিএম, ৮ নভেম্বর ২০২৬ রবিবার
যুদ্ধের ময়দানে কলম হাতে এক নারী: আজ মার্থা গেলহর্নের ১১৮তম জন্মবার্ষিকী
বিশ্বের অন্যতম সাহসী নারী যুদ্ধ সাংবাদিক মার্থা গেলহর্ন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা থেকে শুরু করে স্পেনের গৃহযুদ্ধ, ভিয়েতনাম যুদ্ধ—বিশ্বের নানা প্রান্তে সংঘাত ও যুদ্ধের খবর সংগ্রহ করেছেন তিনি। যুদ্ধক্ষেত্রে নারীদের প্রবেশ যখন ছিল প্রায় অসম্ভব, তখন সব বাধা অতিক্রম করে তিনি পৌঁছে গেছেন রণাঙ্গনে। শুধু যুদ্ধের খবর নয়, যুদ্ধের আড়ালে হারিয়ে যাওয়া সাধারণ মানুষের কান্না, বেদনা ও বেঁচে থাকার সংগ্রাম তুলে ধরেছেন তাঁর লেখায়। আজ ৮ নভেম্বর তাঁর ১১৮তম জন্মবার্ষিকী।
১৯০৮ সালের ৮ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের মিসৌরি অঙ্গরাজ্যের সেন্ট লুইসে জন্মগ্রহণ করেন মার্থা গেলহর্ন। তাঁর পুরো নাম মার্থা এলিস গেলহর্ন। বাবা জর্জ গেলহর্ন ছিলেন চিকিৎসক এবং মা এডনা ফিশেল গেলহর্ন ছিলেন নারী ভোটাধিকার ও সামাজিক সংস্কার আন্দোলনের সক্রিয় সমর্থক। মায়ের কাছ থেকেই ছোটবেলায় নারীর অধিকার ও সামাজিক ন্যায়বিচার সম্পর্কে ধারণা পান মার্থা।
কৈশোর থেকেই লেখালেখির প্রতি আগ্রহ ছিল তাঁর। উচ্চশিক্ষার জন্য ভর্তি হয়েছিলেন ব্রিন মাওর কলেজে। তবে প্রথম বর্ষের পরই পড়াশোনা ছেড়ে সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন। তাঁর স্বপ্ন ছিল বিদেশি সংবাদদাতা হওয়া। সেই স্বপ্ন পূরণে পাড়ি জমান ইউরোপে। ১৯৩০-এর দশকে প্যারিসে কাজ শুরু করেন সাংবাদিক হিসেবে। পরে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে লেখালেখি করেন।
সাংবাদিকতার শুরুতেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান
কর্মজীবনের শুরুতেই কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানির শিকার হন মার্থা। বিষয়টি নিয়ে প্রতিবাদ ও প্রতিবেদন প্রকাশের পর তাঁকে পেশাগত প্রতিকূলতার মুখে পড়তে হয়। কিন্তু অন্যায়ের সঙ্গে আপস করেননি তিনি। বরং এই অভিজ্ঞতা তাঁকে আরও দৃঢ় করে তোলে।
১৯৩০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রে মহামন্দার সময় সাধারণ মানুষের দুর্দশা তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। সে সময় তিনি তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্টের প্রশাসনের একটি ত্রাণসংক্রান্ত কর্মসূচিতে মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানী কর্মী হিসেবে কাজ করেন। বিখ্যাত আলোকচিত্রী ডরোথি ল্যাঞ্জের সঙ্গে কাজ করে দরিদ্র, গৃহহীন ও কর্মহীন মানুষের জীবনযাত্রার চিত্র তুলে ধরেন।
তাঁর লেখায় উঠে আসে অর্থনৈতিক সংকটে বিপর্যস্ত মানুষের জীবন, ক্ষুধা, বেকারত্ব ও সামাজিক বৈষম্যের বাস্তব চিত্র। সাংবাদিকতা তাঁর কাছে শুধু তথ্য পরিবেশনের কাজ ছিল না, মানুষের জীবনকে কাছ থেকে দেখা ও সেই বাস্তবতা অন্যদের সামনে তুলে ধরার মাধ্যম ছিল।
স্পেনের গৃহযুদ্ধ বদলে দেয় তাঁর সাংবাদিকতা
১৯৩৭ সালে স্পেনের গৃহযুদ্ধের সংবাদ সংগ্রহ করতে ইউরোপে যান মার্থা। সে সময় স্পেনে জেনারেল ফ্রান্সিসকো ফ্রাঙ্কোর নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহী বাহিনী ও প্রজাতন্ত্রী সরকারের সমর্থকদের মধ্যে ভয়াবহ সংঘাত চলছিল।
এই যুদ্ধের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে তাঁর পরিচয় হয় বিখ্যাত মার্কিন লেখক আর্নেস্ট হেমিংওয়ের সঙ্গে। দুজনেই স্পেনের যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিবেদন করছিলেন। যুদ্ধের ময়দান, সাধারণ মানুষের দুর্দশা এবং রাজনৈতিক সংঘাত তাঁদের লেখার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে ওঠে।
স্পেনের গৃহযুদ্ধ নিয়ে মার্থার প্রতিবেদনগুলো তাঁকে আন্তর্জাতিক সাংবাদিকতার জগতে পরিচিত করে তোলে। যুদ্ধের রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের চেয়ে সাধারণ মানুষের জীবনে যুদ্ধের প্রভাবকে তিনি বেশি গুরুত্ব দিতেন। বোমা হামলায় বিধ্বস্ত শহর, ঘরহারা পরিবার, আহত শিশু এবং মৃত্যুভয়ে দিন কাটানো মানুষের গল্প তাঁর প্রতিবেদনে বিশেষ স্থান পেত।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অসাধারণ সাহসিকতা
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে মার্থা গেলহর্ন ইউরোপের বিভিন্ন রণাঙ্গনে সংবাদ সংগ্রহ করেন। নাৎসি জার্মানির আগ্রাসন, লন্ডনে বোমাবর্ষণ, ফিনল্যান্ডে যুদ্ধ এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশের পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেন।
১৯৪৪ সালের ৬ জুন। ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অভিযান ‘ডি-ডে’। মিত্রবাহিনী নাৎসি অধিকৃত ফ্রান্সের নরম্যান্ডি উপকূলে অবতরণ করে। এই অভিযান দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
সেই সময় নারী সাংবাদিকদের যুদ্ধের সম্মুখভাগে যাওয়ার অনুমতি ছিল না। সামরিক কর্তৃপক্ষ মার্থাকে নরম্যান্ডিতে যাওয়ার অনুমতি দেয়নি। কিন্তু তিনি দমে যাননি। একটি হাসপাতাল জাহাজে লুকিয়ে উঠে পড়েন। পরে চিকিৎসাকর্মীদের সহায়তা করে আহত সৈন্যদের সঙ্গে উপকূলে পৌঁছান।
এভাবে সামরিক নিষেধাজ্ঞা ও লিঙ্গবৈষম্যের বাধা অতিক্রম করে তিনি ডি-ডে অভিযানের প্রত্যক্ষদর্শী সাংবাদিক হন। যুদ্ধক্ষেত্রে নারীদের প্রবেশাধিকার নিয়ে তাঁর এই অবস্থান সাংবাদিকতার ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয়।
১৯৪৫ সালে জার্মানির দাখাউ বন্দিশিবির মিত্রবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে আসার পর সেখানে উপস্থিত হন মার্থা। বন্দিশিবিরের ভয়াবহ দৃশ্য, বন্দিদের দুর্দশা এবং নাৎসি বাহিনীর নির্মমতার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি প্রতিবেদন লেখেন। তাঁর সেই প্রতিবেদন যুদ্ধের নিষ্ঠুরতা ও মানবিক বিপর্যয়ের গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে বিবেচিত হয়।
হেমিংওয়ের স্ত্রী পরিচয়ের আড়ালে ঢাকা পড়তে চাননি
মার্থা গেলহর্নের জীবনের আরেকটি বহুল আলোচিত অধ্যায় আর্নেস্ট হেমিংওয়ের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক।
১৯৩৬ সালে ফ্লোরিডার কি ওয়েস্টে তাঁদের পরিচয় হয়। পরবর্তী সময়ে স্পেনের গৃহযুদ্ধের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়। ১৯৪০ সালের ২১ নভেম্বর তাঁরা বিয়ে করেন। ১৯৪৫ সালে তাঁদের বিবাহবিচ্ছেদ হয়।
তবে হেমিংওয়ের স্ত্রী হিসেবে পরিচিত হওয়ার বিষয়টি কখনোই স্বস্তির সঙ্গে নেননি মার্থা। তিনি নিজের সাংবাদিকতা ও লেখক পরিচয়কে স্বতন্ত্রভাবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। তাঁর কাছে নিজের কাজ ও অর্জনই ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
একবার নিজের পরিচয় প্রসঙ্গে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছিলেন, হেমিংওয়ের সঙ্গে পরিচয়ের আগে থেকেই তিনি লেখক ছিলেন। পরবর্তী দীর্ঘ সময়ও নিজের লেখালেখির মধ্য দিয়ে পরিচিতি তৈরি করেছেন। তাহলে কেন তাঁকে অন্য একজনের জীবনের পাদটীকা হয়ে থাকতে হবে?
এই বক্তব্য থেকেই বোঝা যায়, একজন স্বতন্ত্র নারী হিসেবে নিজের পরিচয় প্রতিষ্ঠার বিষয়ে তিনি কতটা সচেতন ছিলেন।
যুদ্ধ থামেনি, থামেনি মার্থার কলমও
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরও সাংবাদিকতা ছেড়ে দেননি মার্থা। বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ অঞ্চল ঘুরে সংবাদ সংগ্রহ করেছেন। ভিয়েতনাম যুদ্ধ, ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ এবং মধ্য আমেরিকার বিভিন্ন সংঘাত নিয়ে লিখেছেন।
১৯৬৬ সালে ভিয়েতনাম যুদ্ধের সংবাদ সংগ্রহ করতে যান তিনি। মার্কিন সামরিক নীতির সমালোচনা করে প্রতিবেদন প্রকাশ করায় তাঁর কাজ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। তবু নিজের অবস্থান থেকে সরে আসেননি।
১৯৮৯ সালে ৮১ বছর বয়সেও পানামায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান নিয়ে সংবাদ সংগ্রহ করেন। বয়স ও শারীরিক সীমাবদ্ধতা তাঁর সাংবাদিকতার আগ্রহকে থামাতে পারেনি।
তাঁর উল্লেখযোগ্য বইয়ের মধ্যে রয়েছে The Face of War, The Trouble I've Seen, A Stricken Field এবং Travels with Myself and Another। এসব বইয়ে যুদ্ধ, ভ্রমণ, রাজনীতি ও মানুষের জীবন নিয়ে তাঁর অভিজ্ঞতা উঠে এসেছে।
প্রায় ছয় দশকের সাংবাদিকতা জীবনে তিনি বিংশ শতাব্দীর বহু গুরুত্বপূর্ণ সংঘাতের প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন। তাঁর লেখার শক্তি ছিল সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতাকে সামনে নিয়ে আসা।
শেষ জীবন ও সাংবাদিকতায় অমর উত্তরাধিকার
জীবনের শেষদিকে মার্থা গেলহর্ন ক্যানসারে আক্রান্ত হন। পাশাপাশি দৃষ্টিশক্তিও ক্রমে ক্ষীণ হয়ে আসে। একসময় লেখালেখি চালিয়ে যাওয়া তাঁর জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।
১৯৯৮ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি লন্ডনে নিজের বাসায় ৮৯ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়।
মৃত্যুর পরও সাংবাদিকতায় তাঁর অবদান স্মরণীয় হয়ে আছে। ১৯৯৯ সালে তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘মার্থা গেলহর্ন প্রাইজ ফর জার্নালিজম’। এই পুরস্কার মূলত এমন সাংবাদিকতাকে স্বীকৃতি দেয়, যা ক্ষমতাবানদের কর্মকাণ্ড, প্রচারণা ও প্রতিষ্ঠিত বয়ানের বাইরে গিয়ে সত্য তুলে ধরে।
২০১৯ সালে লন্ডনে তাঁর বসবাসের বাড়িতে ইংলিশ হেরিটেজের উদ্যোগে একটি স্মারক নীল ফলক স্থাপন করা হয়। তাঁর সাংবাদিকতা ও সাহসিকতার স্বীকৃতি হিসেবেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়।
মার্থা গেলহর্নের জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সাংবাদিকতা শুধু সংবাদ সংগ্রহ বা প্রতিবেদন প্রকাশের পেশা নয়; এটি সত্যের অনুসন্ধান, অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান এবং মানুষের না-বলা কথাগুলো সামনে নিয়ে আসার দায়িত্ব।
যে সময়ে যুদ্ধক্ষেত্র ছিল পুরুষ সাংবাদিকদের একচ্ছত্র জায়গা, সে সময়ে একজন নারী হয়ে তিনি সেখানে নিজের অবস্থান তৈরি করেছিলেন। হেমিংওয়ের স্ত্রী হিসেবে নয়, নিজের কাজের মধ্য দিয়ে ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছেন মার্থা গেলহর্ন।
আজ তাঁর ১১৮তম জন্মবার্ষিকীতে তাঁকে স্মরণ করার অর্থ শুধু একজন কিংবদন্তি সাংবাদিককে শ্রদ্ধা জানানো নয়; বরং সেই সাহস, স্বাধীনতা ও সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিকতার আদর্শকে নতুন করে মনে করা।
