ঢাকা, বৃহস্পতিবার ২৩, জুলাই ২০২৬ ১১:০১:১৭ এএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

কন্যাশিশু এডভোকেসি ফোরাম: এক যুগের পথচলা

প্রকাশিত : ০৫:০৩ পিএম, ২৫ অক্টোবর ২০১৩ শুক্রবার | আপডেট: ০৬:৩৫ পিএম, ২৬ অক্টোবর ২০১৩ শনিবার

আল-আমিন, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, উইমেননিউজ২৪.কম ঢাকা : ‘দি হাঙ্গার প্রজেক্ট-বাংলাদেশ’ কন্যাশিশুর অধিকার রক্ষা ও বিকাশের সমস্যাটিকে বৃহত্তর সামাজিক আন্দোলনে রূপ দেয়ার লক্ষ্যে ২০০০ সালের ৪ জুন, ‘কন্যাশিশু দিবস’ পালনের প্রস্তাব করে। বেশ কিছু বেসরকারি সংস্থা, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি যারা কন্যাশিশুর অধিকার রক্ষায় কাজ করছিলেন, তারা এ প্রস্তাবকে সমর্থন করেন। দিবসটি পালনের ফলে কন্যাশিশুর অধিকার রক্ষায় সামাজিক সচেতনতা অনেক বেশি বৃদ্ধি পেতে থাকে। এই চেতনা ছড়িয়ে দেওয়া ও আন্দোলনকে সামাজিক রূপ দেবার জন্য সংগঠকরা নতুন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। তারা মনে করেন, তৈরি হওয়া এই আন্দোলনকে স্থায়ী রূপ দেয়া প্রয়োজন। এই ভাবনা থেকেই ২০০২ সালের ১২ জুন ‘জাতীয় কন্যাশিশু এডভোকোসি ফোরাম’ গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। প্রায় এক যুগ ধরে কন্যাশিশুদের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব ও তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় গণসচেতনতা সৃষ্টি ও নীতিনির্ধারর্ণী পর্যায়ে এডভোকেসির জন্য ধারাবাহিক উদ্যোগ গ্রহণ করার লক্ষ্যে কাজ করে চলেছে সংগঠনটি।DSC_0542-2 সংগঠনটির উদ্দেশ্যগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো-পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র-সর্বস্তরে কন্যাশিশুর প্রতি প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গী পরিবর্তনে জনমত গঠন ও গণসচেতনতা সৃষ্টি করা; কন্যাশিশুর সার্বিক জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় অনুকূল নীতি-কাঠামো প্রণয়নে ধারাবাহিক এডভোকেসি করা; এবং সরকারি-বেসরকারি সুযোগ ও সেবায় কন্যাশিশু এবং নারীর অভিগম্যতা বৃদ্ধির জন্য সময়োপযোগী ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৪৫ শতাংশই হলো ১৮ বছরের কম বয়সি শিশু। আর এর ৪৮ শতাংশই কন্যাশিশু। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো এদের অধিকাংশই জন্ম থেকে নানা বঞ্চনা ও বৈষম্যকে সঙ্গি করেই বেড়ে উঠছে। এতে তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ যেমন রুদ্ধ হচ্ছে; তেমনি স্বাস্থ্য, শিক্ষায়, দক্ষতায়, আত্মবিশ্বাসে ও সক্ষমতায় তারা পিছিয়ে পড়ছে সমবয়সী ছেলেদের তুলনায়। এছাড়াও কন্যাশিশুরা ব্যাপকভাবে যৌন সহিংসতার শিকার হচ্ছে। এই পরিস্থিতি বদলানোর জন্য প্রয়োজন কন্যাশিশুর প্রতি প্রচলিত মানসিকতার পরিবর্তন ঘটানো। কন্যাশিশুরা শুধু ভবিষ্যত মা-ই নয়, তারা জাতির সম্পদ। তাদের সুস্থ ও সুন্দরভাবে  বেঁচে থাকা, তাদের বিকাশ ও সুরক্ষা এবং তাদের সমঅংশগ্রহণের অধিকার প্রতিষ্ঠার ওপরই বহুলাংশে নির্ভর করছে আমাদের জাতীয় অগ্রগতি। তাই তাদের প্রতি বিনিয়োগই অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিনিয়োগ। এই বিশ্বাসবোধ থেকে ‘দি হাঙ্গার প্রজেক্ট-বাংলাদেশ কন্যাশিশুর অধিকার রক্ষা ও তাদের বিকাশের বিষয়টিকে বৃহত্তর সামাজিক আন্দোলনে রূপ দেয়ার লক্ষ্যে কন্যাশিশু দিবস পালনের প্রস্তাব করে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০০০সালের ৪ জুন বাংলাদেশ সরকারের মহিলা ও শিশু  বিষয়ক মস্ত্রণালয়ে শিশু অধিকার সপ্তাহের দ্বিতীয় দিনটিকে কন্যাশিশু দিবস হিসেবে ঘোষণা প্রদানের জন্য লিখিত প্রস্তাব করা হয়। পরবর্তীতে তৎকালীন সরকার ৩০ সেপ্টেম্বর‘কে জাতীয় কন্যাশিশু দিবস’ হিসেবে পালনের ঘোষণা দেয়। এই চেতনাকে আরো তৃণমূলে নিয়ে যাওয়া ও দীর্ঘস্থায়ী রূপ দেয়ার লক্ষ্যে সংগঠকরা ২০০২ সালে ‘জাতীয় কন্যাশিশু এডভোকোসি ফোরাম’ গড়ে তোলে। সাধারণ পরিষদ এবং কার্যনির্বাহী পরিষদের মাধ্যমে জাতীয় কন্যাশিশু এডভোকেসি ফোরামের সাংগঠনিক কাঠামো পরিচালিত হয়ে থাকে। প্রতি দুই বছর পর সাধারণ সদস্যদের সরাসরি ভোটে ফোরামের কার্যনির্বাহী পরিষদ গঠিত হয়। জাতীয় কন্যাশিশু এডভোকেসি ফোরাম পরিচালনা এবং এর সব কার্যক্রম হয়ে থাকে ফোরামের সদস্য সংগঠন, সহযোগী সংগঠন এবং ফোরামের ব্যক্তিগত সদস্যদের আর্থিক সহযোগিতায়। নারী ও কন্যাশিশুর অধিকার নিয়ে কর্মরত সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান/সংগঠনের সাথে কার্যকর যোগাযোগ গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে সমন্বয় সাধনপূর্বক বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়।NGCD-07-015-2 ফোরাম তৃণমূল ও জাতীয় পর্যায়ে যে সকল কার্যক্রমে সফলতা অর্জন করেছে তা হলো : কন্যাশিশু ও নারীর অনুকূল আইন, নীতি ও বিধিবিধান প্রণয়ন, সংস্কার ও বাস্তবায়নে ধারাবাহিক ও পদ্ধতিগত এডভোকেসি কার্যক্রম পরিচালনায়। এই কার্যক্রমের অংশ হিসেবে বিভিন্ন ইস্যুভিত্তিক রাউন্ড টেবিল, সভা, সেমিনার, মানববন্ধন ও কর্মশালা পরিচালনা করার মাধ্যমে। জাতীয় কন্যাশিশু এডভোকেসি ফোরাম কেন্দ্রিয় থেকে তৃণমূল পর্যায়ে নেটওয়ার্কের মাধ্যমে কন্যাশিশুর প্রতি অধিক যত্নশীল হওয়া এবং তাদের প্রতি বঞ্চনা ও বৈষম্য নিরসনের লক্ষ্যে দেশব্যাপী ‘কন্যাশিশুর অধিকার ও আমাদের করণীয়’ শীর্ষক কর্মশালা পরিচালনার দ্বারা। ২০০১ সাল থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত ফোরাম ২৭৫টি কর্মশালা পরিচালনা করেছে। কন্যাশিশুদের জীবনভিত্তিক দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়, যাতে তারা নিজেদের সমস্যা মোকাবেলায় দক্ষ ও আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠে। ২০১২ সাল পর্যন্ত কেন্দ্রিয় থেকে তৃণমূল পর্যায়ে ফোরামের নিজস্ব উদ্যোগে প্রায় ৮০০ কিশোরী এবং সদস্য সংগঠন ও নেটওয়ার্কের মাধ্যমে প্রায় ২৫০০ কিশোরীকে প্রশিক্ষণ প্রদান করে আত্মবিশ্বাসী ও দক্ষ করে গড়ে তোলা হয়েছে। সংগঠনটি জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে  দিবস পালন, পোষ্টার, লিফলেট ছাপানো, বিভিন্ন প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। যেমন, রচনা প্রতিযোগিতা, চিত্রাঙ্কণ প্রতিযোগিতা, বিতর্ক প্রতিযোগিতা, উপস্থিত বক্তৃতা প্রতিযোগিতা প্রভৃতি। এছাড়া তৃণমূলে উঠান বৈঠক, র‌্যালি, পথনাটক, গান, অভিভাবক সমাবেশ পরিচালনা করে থাকে। এসিড সন্ত্রাসসহ বিভিন্নমুখী নির্যাতনের শিকার কন্যাশিশুদেরকে ফোরামের সদস্য সংগঠনসমূহের সহযোগিতায় প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা, আইনী পরামর্শ ও সহায়তা প্রদান করা হয়। ২০১২ সাল পর্যন্ত সরাসরি ফোরাম সচিবালয় কর্তৃক সদস্য সংগঠনের সহায়তায় প্রায় ১৭০ জন কিশোরী এবং সদস্য সংগঠন নিজস্ব কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে অগণিত নির্যাতিত কিশোরীকে আইনী সহায়তা প্রদান করে চলেছে। আন্তর্জাতিক নারীদিবস, জাতীয় কন্যাশিশু দিবসকে কেন্দ্র করে ফোরাম বিভিন্ন ধরণের প্রকাশনা বের করে থাকে এবং দিবস পালনের প্রতিবেদন সম্বলিত বুকলেট প্রকাশ করা হয়। এর মধ্যে প্রতিবছর কন্যাশিশু দিবস উপলক্ষে দেশের বিশিষ্ট খ্যাতনামা লেখকদের প্রবন্ধ নিয়ে ‘কন্যাশিশু’ জার্নাল প্রকাশ করা হয়। এছাড়া ফোরামের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ফোরামের দৃশ্যমান ও উল্লেখযোগ্য কিছু অর্জন রয়েছে। ফোরামটি সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে বড় ধরণের ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়েছে। যেমন:- নারী উন্নয়ন নীতি-২০১১ এবং জাতীয় শিশুনীতি-২০১১ তৈরিতে গঠিত কমিটিতে ফোরামকে সদস্য হিসেবে রাখা এবং ফোরামের সুপারিশসমূহ অন্তর্ভুক্ত করা এবং পূর্বের নীতিসমূহে উল্লেখিত মেয়েশিশুর স্থলে সকল স্থানে কন্যাশিশু নামে অন্তর্ভুক্ত করা; ইউনিসেফ কর্তৃক শিশু অধিকার সম্পর্কিত পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়নে ফোরামের সুপারিশসমূহ অন্তর্ভুক্ত করা; কন্যাশিশুদের নিয়ে সরকারি পর্যায়ের কার্যক্রমে কন্যাশিশু এডভোকেসি ফোরামকে সর্বক্ষেত্রে সম্পৃক্ত করা হয়; ২০১১ সালে প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল এর সাথে কাজ করার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে; ২০১১ সালের সবচেয়ে বড় অর্জন জাতিসংঘ কর্তৃক ‘আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস’ ঘোষণা করা। এছাড়াও প্রতিবছর ফোরাম ইউনিসেফ, ইউনেস্কো, প্ল্যান ইন্ট্যারন্যাশনাল, সেভ দ্য চিলড্রেনস, সামাজিক প্রতিরোধ কমিটি, বাংলাদেশ শিশু একাডেমী এবং সরকারের মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সাথে আরও নিবিড়ভাবে কাজ করার সুযোগ পেয়ে থাকে। ফোরামের ঠিকানা : জাতীয় কন্যাশিশু এডভোকেসি ফোরাম, কার্যালয়: দি হাঙ্গার প্রজেক্ট-বাংলাদেশ, ৩/৭, আসাদ এভিনিউ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭, ফোন- ৮১১২৬২২, ৮১২৭৯৭৫, মোবাইল - ০১৭১৩০৪০৮৫২। ফ্যাক্স- ৮১১৬৮১২, ইমেইল: [email protected],ওয়েব: www.girlchildforum.org