ঢাকা, বৃহস্পতিবার ২৩, জুলাই ২০২৬ ১১:০১:১২ এএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

মালালাঃ নারী শিক্ষা বিস্তারে যুগান্তকারী একটি নাম

প্রকাশিত : ০৮:৫৫ এএম, ২৬ অক্টোবর ২০১৩ শনিবার | আপডেট: ০৫:৫৪ পিএম, ২৬ অক্টোবর ২০১৩ শনিবার

শুভাশিস ব্যানার্জি শুভMalala-E সম্প্রতি ইন্টারনেট ভিত্তিক একটি জরিপ সংস্থা পাকিস্তানের ঘৃণিত দশ ব্যক্তির খোঁজ করেছিল। এতে সাংবাদিক,অভিনেত্রী থেকে শুরু করে উঠে এসেছে রাজনীতিবিদদের নামও। ঘৃণ্য দশজনের তালিকায় উঠে এসেছে ‘সোয়াত-কন্যা’ মালালা ইউসুফজাই এর নাম! এখানে উল্লেখ্য,যে দশ ব্যক্তির নাম জরিপে উঠে এসেছে তারা কোন না কোনভাবে বিশ্বে নন্দিত,সমাদৃত। কিন্তু এই সমাদৃতগণই পাকিস্তানের কাছে নন্দিত হয়ে আছেন।   যুদ্ধবাজ এবং অস্ত্রের খেলা নিয়ে উৎসাহী ও ব্যস্ত বিশ্বনেতাদের বিবেককে কতটা নাড়া দিতে পেরেছে জানিনা তবে গোটা দুনিয়ায় ঝড় তুলেছে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে পাকিস্তানের তালেবানদের অস্ত্রের আঘাতে আক্রান্ত মালালা ইউসুফ জাই। নারী শিক্ষা প্রসারে ভুমিকা রাখার কারণে তালেবনাদের হাতে গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন  মালালা নামের এই কিশোরী। গত ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘে  বিশ্বনেতাদের কাতারে দাড়িয়ে বিশ্বের সন্ত্রাস কবলিত দেশগুলোতে অস্ত্রের বদলে বই আর সৈন্যের পরিবর্তে শিক্ষক পাঠানোর আহ্বান জানিয়েছেন। মালালা গত বছর অক্টোবরে প্রতিদিনের মতো স্কুলে যাওয়ার পথে তালেবান এক বন্দুকধারীর হাতে, মাথায় গুলিবিদ্ধ হন। কি দোষ মালালার? সে স্কুলে যায়, সে শিক্ষা গ্রহন করে সমাজকে আলোকিত করতে চায়। সে নারীদের শিক্ষিত দেখতে চায়। তালেবান কিসের প্রতিনিধিত্ব করছে? সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে,না অন্ধকারের বিরুদ্ধে না কি আলোর বিরুদ্ধে? বুঝে উঠা কঠিন। কারন তারা ধর্মের লেবাস পড়া অথচ নারীদের শিক্ষিত দেখতে চায়না। এ কেমন কথা? কোন ধর্ম কি নারীদের অবহেলার কথা বলেছে?   মালালা  জাতিসংঘের সদর  দফতরে ‘গ্লোবাল এডুকেশন ফার্স্ট ইনিশিয়েটিভের’ প্রথম বার্ষিকীতে  অংশ নিয়ে গোটা বিশ্ববাসীর কাছে বিশেষ করে বিশ্বের প্রভাবশালী নেতৃবৃন্দের কাছে আহবান জানিয়েছে যে,আফগানিস্তানসহ বিশ্বের সন্ত্রাস কবলিত দেশগুলোতে  অস্ত্র ও ট্যাংক পাঠানোর পরিবর্তে  বই ও কলম পাঠান। চমৎকার কথা,অমূল্য প্রস্তাব। বিশ্বের হাজার হাজার জ্ঞানী,বুদ্ধিজীবি,শত শত নেতা যে কথা বুঝতে চান না বা চাচ্ছেন না তাদের উদ্দেশ্যে মালাল বললো যে,ট্যাংক,অস্ত্র আর সৈন্য বিশ্বে শান্তি আনতে পারেনা । তারা পারে শুধু অশান্তিকে দীর্ঘায়িত করতে,এক অশান্তি থেকে আর অশান্তির দিকে বিশ্বকে ধাবিত করছে। বিশ্বের বিভিন্ন স্থানের যুদ্ধ ও ধ্বংসলীলা আমাদের সে সাক্ষ্যই দিচ্ছে,অথচ কোন শিক্ষাই আমরা গ্রহন করছি না। মালালা বলছে, “আমার স্বপ্ন  হলো সব শিশুকে শিক্ষিত হতে এবং সব মানুষের জন্য সাম্য প্রতিষ্ঠিত  হতে দেখা। আমার স্বপ্ন হলো নাইজেরিয়া,সিরিয়া,পাকিস্তান ও আফগানিস্তানসহ বিশ্বের সব স্থানে শান্তি দেখতে পাওয়া। আমরা চাই নারীরা আত্মনির্ভরশীল হোক,তারাও পুরুষের সমান অধিকার পাক। আমারা সমতায় বিশ্বাস করি এবং আরও বিশ্বাস করি যে,নারীদের  সমান অধিকার দেয়া ন্যায়বিচার। আমরা এসব সমস্যার সম্মুখীন হয়ে তার একটি সমাধান খুঁজতে এসেছি। মালালার এই বক্তব্য বিশ্বজুড়ে  লাখো-কোটি মানুষের প্রেরণা জুগিয়েছে । মালালা আরও বলছে, “শিক্ষার কোন বিকল্প নেই। একটি মেয়ের  জন্মের পর  পরিবারের অধীনে থাকে। বিয়ে হলে  স্বামীর অধীনে চলে যায়। আর সন্তান বড় হলে  সন্তানের  কথামতো  চলতে হয়। এটাই আমাদের সমাজে একজন নারীর জীবন। এই জীবন থেকে আমারা মুক্তি চাই। আমি চাই বিশ্বের প্রত্যোক মানুষ  প্রত্যোক নারী শিক্ষিত হিসেবে গড়ে উঠুক। আর এই গড়ে ওঠা আমাদের জন্য কোন স্বপ্ন নয়। এটা সাধারণভাবেই সম্ভব”। অবশ্যই সেটি সম্ভব,অবশ্যই নারীকে শিক্ষিত হতে হবে। আমরা জানি অফগানিস্তান ও পাকিস্তানে তালেবানদের দৌরাত্ব। কিন্তু কেন? একটি কারণ হতে পারে পাকিস্তানে অনেক মাদ্রাসা রয়েছে এবং এখানে শিক্ষার্থীরা শুধু ধমীয় বিষয়ে পড়াশুনা করে। ফলে তাদের মধ্যে ইসলাম সম্পর্কে একটি ভ্রান্ত ধারণার সৃষ্টি হয়। তারা মনে করে নারীরা থাকবে ঘরে,বাইরে বের হওয়া তাদের জন্য পাপ। আর তাই তারা নারী শিক্ষার বিরুদ্ধাচারণ করছে। আসলে ইসলাম কি তাই বলে? এখানে উল্লেখ্য যে,পশ্চিম বঙ্গেও ছয়’শও বেশী সনাতন মাদ্রাসায় গত এক দশক ধরে প্রধান ধারার স্কুলের পাঠ্যসূচি চালু রয়েছে। ফলে এসব  মাদ্রাসা  আধুনিক  শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভুমিকা পালন করতে পারছে। মাদ্রাসাগুলো হাজার হাজার শিক্ষার্থীকে প্রাগ্রসর পর্যায়ের শিক্ষা প্রদান করছে। পাকিস্তান, বাংলাদেশ,যুক্তরাষ্ট্র ও আরও কয়েকটি দেশের বিশেষজ্ঞরা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পশ্চিমবঙ্গের আধুনকিায়িত মাদ্রাসা সফর করেছেন এবং এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আধুনিকায়নের প্রশংসা করেছেন। ওয়াশিংটনের ব্রুকিং ইনস্টিটিউশন পশ্চিমবঙ্গের  মাদ্রাসাগুলোকে আধুনিক শিক্ষার মডেল হিসেবে উল্লেখ করেছে এবং পাকিস্তানকে  তারা এই পদ্ধতি অনুসরণের পরামর্শ  দিয়েছে। তাদের রিপোর্টে পশ্চিমবঙ্গের মাদ্রাসগুলোকে উচ্চতর বৈশিষ্টপূর্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা পালনের জন্য প্রশংসা করা হয়েছে। হিন্দু,মুসলিম,খ্রীস্টান শিক্ষার্থীরা এখানে ইংরেজি,পদার্থবিদ্যা,রসায়ণশাস্ত্র,জীববিদ্যা,ভূগোলবিদ্যা,গণিত,কম্পিউটার,আরবী ও ইসলামিক স্টাডিস বিষয়ে পড়াশুনা করে থাকে। কিছু হিন্দু শিক্ষার্থী বলেছে,মাদ্রাসায় পড়ার কারনে তারা ইসলাম ও মুসলমান সম্পর্কে  ভালোভাবে  জানতে পেরেছে এবং এতে  মুসলমানদের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। এখানকার শিক্ষার্থীরা আরও বলেছে,মাদ্রাসায় কয়েক বছর পড়ার সুবাদে তারা জানতে পেরেছে যে,ইসলাম মুসলমানদের অন্য ধর্মকে সম্মান করতে শিক্ষা দেয়। পাকিস্তানসহ বাংলাদেশের মাদ্রাসাগুলোকে আধুনিক শিক্ষার আওতায় আনা হলে ইসলাম সম্পর্কে যাদের ভুল ধারনা আছে তা কেটে যাবে। বিশ্ববাসীর স্মরণ আছে যে, মালালার ওপর হামলার পর   বিশ্বজুড়ে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। গুলিতে মারাত্মক আহত মালালার অবস্থা সংকটাপন্ন হয়ে পড়লে তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য যুক্তরাজ্যে পাঠানো হয়। চিকিৎসার ফলে মালালা  ধীরে ধীরে  সুস্থ হয়ে ওঠে এবং গত মার্চ থেকে সে যুক্তরাজ্যের  একটি স্কুলে পড়া শুরু করছে। মালালা তার গভীর এবং বাস্তব দৃষ্টি দিয়ে দেখে বলছে যে,পড়াশুনার চর্চা,বাই-পুস্তক এবং শিক্ষক হচ্ছে এসব সমস্যার সমাধান। গুলি,সামরিক বাহিনী এর সমাধান নয়। নারী শিক্ষার অগ্রদূত হিসেবে  অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল  মালালাকে ‘বিবেকর দূত’ করা হবে বলে ঘোষণা দিয়েছে। টাইম ম্যাগাজিন বিশ্বের  সবচেয়ে প্রভাবশালী ১০০ ব্যাক্তির মধ্যে মালালাকে তালিকাভুক্ত করেছে। সর্বশেষ তাকে ইউরোপীয় পার্লামেনেট শাখারও পুরস্কাকের জন্য  তকে মনোনীত করেছে। এই অক্টোবরে ‘আমি মালালা’ নামে তার বই প্রকাশিত হতে যাচ্ছে। নিজের অন্যতম  নায়ক মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের ধরনে মালালা বলেন,“প্রতিটি শিশু শিক্ষিত হবে,এটা আমার স্বপ্ন। সব মানুষের মধ্যে সমতা দেখা আমার স্বপ্ন”। জাতিসংঘে  দেয়া তথ্যমতে সারা বিশ্বের পাঁচ কোটি ৭০ লাখ শিশু প্রাথমিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়। এর মধ্যে  ৫২ শতাংশই মেয়ে শিশু। এই মেয়ে শিশুদের শিক্ষিত হতে হবে। মালালার মাধ্যমে ‘অস্ত্রের নয়,শিক্ষার বিস্তৃতি’ ঘটানোর শ্লোগান উঠল জাতিসংঘে যা সংঘাতপূর্ন বিশ্বের জন্য এক শান্তির প্রেসক্রিপশন। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী  শেখ হাসিনাও মালালার  এ ডাকে পুরো সমর্থন জানিয়েছেন। তিনি তার কন্ঠে কন্ঠ মিলিয়ে বলেছেন,“একটি শক্তি শালী রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং অস্ত্রের  পরিবর্তে  শিক্ষাখাতে অর্থ বরাদ্দই বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রকৃত পন্থা। আর কোন অস্ত্রের খেলা নয়,এবার আসুন শিক্ষার খেলা খেলি। মানসম্মত শিক্ষা সবার জন্য নিশ্চিত করি”। তিনি আরও বলেন, “মালালাই আমাদের কন্ঠস্বর। তার বক্তব্যই আমার বক্তব্য। শিক্ষাহীন নারীর ভোগান্তি আমি জানি,আসুন আমরা শিক্ষার প্রতি জোর দিই”। অনুষ্ঠানটি  সঞ্চালনা করেন গর্ডন ব্রাউন,সাবকে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী। দক্ষিন আফ্রিকার  আর্চবিশপ ডেসমন্ড টুটু ও ধনকুবের আলিকো দাগোটেসহ বেশ কয়েকজন সরকার প্রধান উপস্থিত ছিলেন। মালালা গোটা দুনিয়ার শান্তিকামী মানুষদের কথা বলেছেন। আমরা তারঁ আহবানের সাথে সম্পূর্ন একাত্মতা ঘোষণা করছি এবং বিশ্বনেতৃবৃন্দকে আহবান জানাচ্ছি অস্ত্রের খেলা বন্ধ করে শিক্ষা,শান্তি এবং সমতার খেলা শুরু করুন। শুভাশিস ব্যানার্জি শুভ: জাতিসংঘ পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিক ও কলামিষ্ট।। [email protected]