পথশিশু : পথেই বেড়ে উঠছে ওরা
প্রকাশিত : ০৭:১৮ পিএম, ১১ জুন ২০১৫ বৃহস্পতিবার | আপডেট: ০৩:৩২ পিএম, ১৩ জুন ২০১৫ শনিবার
অনন্যা হাসান, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, উইমেননিউজ২৪.কম, ঢাকা : মাত্র আট বছর বয়সে শিশু দোলন বাবার সাথে গ্রাম থেকে ঢাকায় আসে। মা হারা দোলনের বাবা গার্মেন্টসে কাজ করে। ঢাকায় এসে তাকে থাকতে হয় সৎ মায়ের সংসারে। বাবা বাড়িতে না থাকলেই তাকে সহ্য করতে হতো সৎ মায়ের শারীরিক নির্যাতন। নির্যাতনের যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে সে বাড়ি থেকে বের হয়ে আসে। এখন অন্যান্য পথশিশুদের সাথে সে কাগজ কুড়ায় রাস্তায় রাস্তায়। সৎ মায়ের সংসারে আর ফিরে যায়নি সে। রাজধানীর রাজপথেই থাকে সে।
এলাকার এক মহিলার সঙ্গে প্রথম ঢাকায় আসে ১০ বছরের কল্পনা। মায়ের দ্বিতীয় বিয়ে হয়ে যাওয়ায় সে তার মায়ের নতুন সংসারে থাকতে পারেনি। ভাল কাজ দেবে বলে ঢাকায় নিয়ে এলেও তাকে মিরপুরের এক বাড়িতে তাকে কাজ দেয় সেই মহিলা। কিন্তু সেই বাড়ির ছেলে সবসময় তাকে উত্যক্ত করত। আর সুযোগ পেলেই শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করত। শারীরিক ও মানসিক এই অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে পালিয়ে চলে আসে কল্পনা। তরকারি টোকানো, ফুল বেচা যখন যে কাজ পায় সেটাই করে। আজ এখানে তো কাল আরেক জায়গায় চলে যায়।
১২ বছরের রুবেল জানে না তার পরিচয় কী, কোথায় তার আসল ঠিকানা। ছোটবেলায় ঢাকায় এসে হারিয়ে যায় শিশু রুবেল। কমলাপুর স্টেশনে এক দম্পতি তাকে কুড়িয়ে নিয়ে লালনপালন করে। কিন্তু সেই দম্পতি এখন আর তাকে নিজেদের কাছে রাখতে চায়না। বাসা থেকে বের করে দেয় রুবেলকে। স্টেশন কুলির কাজ করা, পলিথিন কুড়ানো এসব কাজ করে সে নিজের পেট চালায়। স্টেশনেই রাতে ঘুমিয়ে থাকে সে। নিজের অজান্তেই তার নাম ওঠে পথশিশুর তালিকা।
শুধু দোলন, কল্পনা কিংবা রুবেলই নয় বর্তমানে পুরো ঢাকা শহরেই এমন শিশুর সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৩ লাখ। বর্তমানে ওদের সবার ঠিকানা রাজধানীর রাজপথ। রাজধানীর পথে পথে এমন শিশুর সংখ্যা আশংকাজনক হারে প্রতিনিয়তই বাড়ছে। ওদেরকে সহজেই ডাকা হয় ‘টোকাই’, ‘পথকলি’ ‘ছিন্নমূল’ কিংবা ‘পথশিশু’ বলে। যে নামেই ডাকা হোক না কেন ওরা এখন বেঁচে আছে নিরাশ্রয়, অসহায় ও নির্যাতিত অবস্থায়।
জানা গেছে, বাংলাদেশে এধরনের আরো প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ শিশুর ঠিকানা এখন পথ। ট্রাইপার্টাইট ডেভেলপমেন্ট কাউন্সিলের (টিডিসি) এক হিসাবে দেখা যায়, শুধু ঢাকা শহরেই ৩ লাখ ৩৪ হাজার ৮০৭টি পথশিশু রয়েছে। সবচেয়ে কম রয়েছে সিলেট শহরে। সেখানে ৬ হাজার ৩৩টি পথশিশু রয়েছে।
খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে নানান নামে ডাকা হলেও পথের এই শিশুদের সমস্যা একই। দু’বেলা পেট ভরে খাবার, রাতে মাথা গোঁজার একটু নিরাপদ আশ্রয়, অসুস্থ হলে একটু চিকিৎসা সেবা কোনোটাই পায় না ওরা। সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা বঞ্চিত এই শিশুরা বেঁচে থাকে শুধু নিজেদের ওপর নির্ভর করে।
বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে দারিদ্র, বাবা-মায়ের বিবাহ-বিচ্ছেদ বা একাধিক বিয়ে, বাবা-মায়ের মৃত্যু, পারিবারিক অশান্তি, যৌন নির্যাতন, ক্ষুধা, অসুস্থতা, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, নদীভাঙন, হারিয়ে যাওয়া ইত্যাদি নানা কারণে গৃহ থেকে বিচ্ছিল্পু হয়ে গৃহের শিশুরাই পরিণত হয় পথশিশুতে।
সমাজসেবা অধিদফতরের এক সমীক্ষায় দেখা যায়, দেশের ৬টি বিভাগীয় শহরে প্রায় সাড়ে ৪ লাখ পথশিশু রয়েছে। সরকারের এপ্রোপ্রিয়েট রিসোর্স ফর ই¯ক্স্রভিং ¯িদ্ব্রট চিলড্রেন্স এনভায়রনমেন্ট (এরাইজ) প্রকল্পের অধীনে পরিচালিত এক জরিপে বলা হয়েছে, বর্তমানে বাংলাদেশে ১৮ বছর বয়সের নিচে প্রায় সাড়ে ৫ কোটি শিশু রয়েছে। এদের মধ্যে পথশিশুর সংখ্যা ৪ লাখ ৪৫ হাজার ২২৬। এদের শতকরা ৭৫ ভাগ রাজধানীতে, ৯ দশমিক ৯ ভাগ চট্টগ্রাম বিভাগে, ২ দশমিক ৫ ভাগ সিলেটে বাস করে। পথশিশুদের মধ্যে শতকরা ৫৩ ভাগ ছেলে এবং ৪৭ ভাগ মেয়ে রয়েছে।
বাংলাদেশ ইন্সটিটিউশন অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) ২০০৫ সালের এক গবেষণায় জানা গেছে, বাংলাদেশে বর্তমানে ৫ লাখ ২৫ হাজার পথশিশু রয়েছে। গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০১৪ সাল নাগাদ এ সংখ্যা দাড়াবে ৯ লাখ ৩০ হাজারে।
উন্নয়ন সংস্থা অপরাজেয় বাংলাদেশের দেয়া তথ্য মতে বর্তমানে বাংলাদেশে ৫ লাখ ২৫ হাজার পথশিশু রয়েছে। এদের মধ্যে শুধু ঢাকা শহরেই রয়েছে ৩ লাখ ৮০ হাজার।
সমাজ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পথশিশুরা কোথাও স্থির থাকে না। অধিকাংশই এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ভেসে বেড়ায়। যেখানে রাত হয় সেখানেই ঘুমিয়ে পড়ে। তবে সহজে কাজ পাওয়া যায় এমন জায়গা, বিশেষ করে বাজার, রেল স্টেশন, বাস স্টেশন, লঞ্চঘাট এলাকাতেই তাদের বেশি দেখা যায়। ঢাকা শহরের পথ শিশুরা রমনা পার্ক, ওসমানী, সোহরাওয়ার্দী ও চন্দ্রিমা উদ্যানের মতো উম্মুক্ত পার্ক, স্টিডিয়াম, মসজিদের বারান্দা, মাজার এলাকায় রাত কাটায় বেশি। কেউ থাকে খোলা আকাশের নিচে রাজধানীর সড়ক ও ফুটপাতগুলোতেও রাত কাটায়। আবার এদের কেউ থাকে বিভিন্ন এলাকায় গড়ে ওঠা বস্তিতে।
শিশু ফাউন্ডশেনরে সভাপতি আফসারা আনসারী বলেন, শতকরা ১০০ ভাগ পথশিশুই শহরমুখী। এর মুল কারণ গ্রামাঞ্চলের চরম দারিদ্র্য। দরিদ্রতা, কাজের অভাবসহ বিভিন্ন প্রতিকূলতার কারণে গ্রাম থেকে শিশুরা শহরে চলে আসে। শহরে এসে এদের একটি বিশাল অংশ নানা রকম অপরাধমূলক কাজে জড়িয়ে পড়ে। দুঃখজনক হলেও সত্য, জীবনধারণের প্রয়োজনে এদের একটি বড় অংশ ঝুঁকিপূর্ণ কাজে জড়িত থাকতে বাধ্য হচ্ছে। কিন্তু এদেরকে এই অবস্থা থেকে সরিয়ে আনতে তেমন কোন উদ্যোগ সরকারের নেই। তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে শিশুদের উন্নয়নের বিষয়টি রয়েছে। সরকার এই অঙ্গীকারটি বাস্তবায়ন করলেই শিশুদের সব রকম সমস্যা নিরসন সফল হবে।
১২.০৬.২০১৫ 