ঢাকা, মঙ্গলবার ২৪, নভেম্বর ২০২০ ৩:২০:৪৬ এএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

বিউটি বোর্ডিংয়ে আড্ডার গল্প : কাজী রফিক

কাজী রফিক

উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ০৪:৪২ পিএম, ৯ অক্টোবর ২০২০ শুক্রবার

বিউটি বোর্ডিংয়ে আড্ডার গল্প : কাজী রফিক

বিউটি বোর্ডিংয়ে আড্ডার গল্প : কাজী রফিক

তুমি বলেল চলো যাই,
পুরান ঢাকার শ্রীশ দাস লেনের
বৃক্ষঘেরা ছায়া সুনিবিড় সেই হলুদ
বাড়িটিতে।
আজও আছে সেই ঘর, আস্তর খসে
পড়া দেয়াল, সবুজ চত্তর,
ঝরেপড়া অনেক স্মৃতির সাক্ষী,
অনুভবে খুঁজে পাই তুমুল আড্ডাবাজ
কবি কন্ঠের ধ্বনি প্রতিধ্বনি,
রেখে যাওয়া পদস্পর্শ
রথি মহারথির...............।

বিউটি বোর্ডিং নিয়ে আমার কবিতার কয়েকটি লাইন দিয়ে শুরু করলাম বিউটি বোর্ডিং আড্ডার গল্প।গত শুক্রবার হঠাৎ গেলাম আমরা কয়েকজন ।এক বছর পর, তারপর লকডাউন, অবরুদ্ধতা থেকে বেরিয়ে এলাম অতীতের বাংলা সাহিত্য,সংস্কৃতি ও রাজনীতির মহীরুহদের আড্ডার উজ্জ্বল স্মৃতিময় অঙ্গনে।

বিউটি বোর্ডিং এর সংক্ষিপ্ত কিছু কথা:
১৯৪৯ সালে প্রাহ্লাদ সাহা ও তার ভাই নলিনী মোহন সাহা জমিদার সুধীর চন্দ্র দাসের কাছ থেকে ১১কাঠা জমি কিনে গড়ে তোলেন বানিজ্যিকভাবে বিউটি বোর্ডিং। নলিনী সাহার মেয়ে বিউটির নামেই রাখেন “বিউটি বোর্ডিং”। এখানেই ছিলো নলিনী কিশোর গুহ সম্পাদিত ’সাপ্তাহিক সোনার বাংলা ’পত্রিকা অফিস। যে পত্রিকায় কবি শামসুর রাহমানের প্রথম কবিতা ছাপা হয়। কবি শহীদ কাদরীই প্রথম আড্ডা শুরু করেন বিউটি বোর্ডিং এ ।শহীদ কাদরী খুব কাছেই থাকতেন, বাংলাবাজারের ভেতরের দিকে। আসতেন আরও তিন কবি লক্ষীবাজার থেকে সৈয়দ শামসুল হক. আসেক লেন থেকে শামসুর রাহমান, ইসলামপুর থেকে বেলাল চৌধুরী। এই তিনজনকেই নিয়ে শুরু হয় আড্ডা। ধীরে ধীরে আড্ডার পরিধি বাড়তে লাগলো। আড্ডায় যেতেন কবি, লেখক, শিল্পী, সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ।

বিউটি বোর্ডিং -এ যেতেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান, তাজউাদ্দন আহমদ, আব্দুর রাজ্জাক । ৪৭ এর আগে সোনার বাংলা পত্রিকা আফিসে এসেছিলেন নেতাজী সুভাস চন্দ্র বোসও।

বিউটি বোর্ডিং আড্ডায় যারা নিয়মিত আসতেন তাদের মধ্যে ছিলেন.চিত্রশিল্পী মোহাম্মদ কিবরিয়া,আমিনুল ইসলাম,মুর্তজা বশীর,কাইয়ুম চৌধুরী,দেবদাস চক্রবর্তী,মুস্তফা মনোয়ার,নিতুন কুন্ড,সমরজিৎ রায় চৌধুরী,রফিকুন নবী, সঙ্গীতের ওস্তাদ মমতাজ আলী খান,ওস্তাদ রাজা হোসেন খান, সুরকার সমর দাস, আনোয়ার পারভেজ, লেখক সাংবাদিক সঞ্জীব দত্ত, নির্মল সেন, এবিএম মুসা,সন্তোষ গুপ্ত, ফয়েজ আহমেদ, ইমরুল চৌধুরী, কবি ও কথা শিল্পীদের মধ্যে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, জহির রায়হান, ফজলে লোহানী, রনেশ দাশগুপ্ত , খালেদ চৌধুরী, আল মাহমুদ, বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, আব্দুল মান্নান সৈয়দ, এখলাস উদ্দিন আহমদ, হায়াৎ মাহমুদ, আবু হেনা সোস্তফা কামাল, ড,অনিসুজ্জামান, রফিকুল ইসলাম, আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী, আলাউদ্দিন আল আজাদ,আখতারুজ্জামান ইলিয়স,রফিক আজাদ,সিকদার আমিনুল হক.ফজল শাহাবুদ্দিন,আবুল খায়ের মোসলেউদ্দিন,মহাদেব সাহা,আহমদ ছফা,আবুল হাসান.আসাদ চৌধুরী,আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ,নির্মলেন্দু গুন,অসীম সাহা,কায়সুল হক,সমুদ্র গুপ্ত, সাজ্জাদ কাদির।নাট্য ও চলচ্চিত্র শিল্পীদের মধ্যে, নায়ক রাজ্জাক,সুমিতা দেবী,খান আতাউর রহমান,আব্দুল জাব্বার খান, ফাতেহ লোহানী,আসতেন অভিনেতা ভানু বন্দ্যোপধ্যায়।

আরও অনেক প্রখ্যাত ব্যক্তি আসতেন এই বিউটি বোর্ডিং আড্ডায়। এই বোর্ডিংয়ের একটি কক্ষে বসে আব্দুল জাব্বার খান লিখেছিলেন বাংলার প্রথম সবাক চলচ্চিত্র ”মুখ ও মুখোশ’এর চিত্র গল্প। এই বোর্ডিং এর কক্ষে বসে সৈয়দ হক লিখেছিলেন, এক মহিলার ছবি, রক্তগোলাপ, জনক ও কালো কফির মতো কবিতার বই। জহির রায়হান লিখেছেন কাঁচের দেয়াল।

৭১-এর মার্চে হানাদাবাহিনীর নির্মম হত্যাকান্ডে শহীদ হন বিউটি বোর্ডিং এর সত্বাধিকারী প্রাহ্লাদ চন্দ্র সাহাসহ আরও ১৩জন শিল্পী,প্রকাশক,শিক্ষক ব্যাবসীসহ এলাকাবাসী। শহীদদের স্মরণে বিউটি বোর্ডিং প্রাঙ্গনে গড়ে তোলা হয় একটি স্মারক-সৌধ। শ্রদ্ধা জানাই শহীদদের প্রতি।

কবি শামসুর রাহমানের কয়েকটি কবিতার লাইন দিয়ে আজ শেষ করছি-
‘কতকাল যাইনা সেখানে আর বিউটি বোর্ডিংয়ে।
সেখানে যেতাম যারা আড্ডার সুরায়
চুর হতে,তারা কবে ছিটকে পড়েছে দশদিকে,
যেন ভালুকের থাবা
হঠাৎ ফেলেছে ভেঙ্গে তন্ময় মৌচাক। আমি আর দূর দূর বুকে ঈষৎ কম্পিত হাতে সদ্যলেখা কবিতা কারোকে
শোনাই না,বরং নিজেই শুনি কোন কোন তরুণ কবির
আবেগার্ত পদাবলি কখনো-সখনো...।’

কাজী রফিক: সিনিয়র সাংবাদিক