ঢাকা, বৃহস্পতিবার ২৯, জানুয়ারি ২০২৬ ০:১০:৫৭ এএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

হুতং: বেইজিংয়ের হারানো সময়ের নীরব গল্প

আইরীন নিয়াজী মান্না

উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ১০:৩৬ এএম, ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ বুধবার

হুতংয়ের একটি দৃশ্য।

হুতংয়ের একটি দৃশ্য।

বেইজিং—চীনের রাজধানী। এই শহরের নামে মনে পড়ে আধুনিক উঁচু ভবন, বুলকন্ঠ গাড়ির শব্দ এবং ব্যস্ততার বন্যা। কিন্তু শহরের এই আধুনিক ছাপের মধ্যে লুকিয়ে আছে একটি ছোট, শান্ত এবং মন ছোঁয়া এলাকা—হুতং। হুতং শব্দের অর্থ “ছোট গলি” বা “প্রাচীন রাস্তা”, যা প্রাচীন চীনের শহুরে জীবন ও সংস্কৃতির ইতিহাস বহন করে।

হুতংয়ের উৎপত্তি মূলত যিং রাজবংশের (Yuan Dynasty) সময়। তখনকার মানুষরা শহরের মাঝখানে নিজেদের বাসস্থান তৈরি করত, যেখানে পরিবার এবং প্রতিবেশীর জীবন একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত ছিল। এই ছোট গলিগুলো চারপাশে তৈরি সিয়হে ইউয়ান (Siheyuan) ধাঁচের বাড়ি দিয়ে পরিপূর্ণ ছিল। সিয়হে ইউয়ান মানে চারপাশে ঘেরা উঠোন—মধ্যখানে ছোট উঠোন যেখানে পরিবারের সকলে মিলিত হতো। এই স্থাপত্য শুধু বাড়ি নয়, এটি মানবিক সম্পর্কের এক জীবনধারা।

হুতং আজও প্রাচীন ছন্দ বজায় রেখেছে। সকালে বয়স্করা উঠে তাইচি করে, গলায় চা আর মুখে হাসি। রাস্তায় ছোট শিশুরা খেলতে নেমে পড়ে, সাইকেলের হুইল ঘুরতে থাকে। প্রতিটি কোণ, ছোট দরজা, পুরোনো দেয়াল যেন নিজস্ব গল্প বলে। হুতংয়ের এই ছোট রাস্তা-ঘর, উঠোন আর গলি শুধু স্থাপত্য নয়—এটা মানব জীবনের সময়ঘণ্টা, যেখানে প্রতিটি মুহূর্তের ছাপ ধরা আছে।

হুতংয়ের সৌন্দর্য শুধু স্থাপত্যে সীমাবদ্ধ নয়। এখানে দৈনন্দিন জীবন ও সাংস্কৃতিক চিহ্ন চোখে পড়ে। ছোট দোকান, বেকারি, নকশীর দোকান—সবই রাস্তায় ছড়িয়ে। স্থানীয় লোকেরা এখানে বছরের বহুদিন ধরে বসবাস করে। তারা শুধু বাস করে না, বরং তাদের জীবনধারার মাধ্যমে সংস্কৃতি সংরক্ষণ করে। হুতংয়েতে বসে মানুষদের সঙ্গে কথাবার্তা, তাদের খেলা, উৎসব—সবকিছু পর্যবেক্ষণ করলে বোঝা যায়, এখানে ইতিহাস শুধুমাত্র বইয়ে নয়, জীবন্ত অবস্থায় আছে।

পর্যটকদের জন্য হুতং একটি মননশীল স্থান। এখানে হাঁটাহাঁটি ধীর হতে হয়। রাস্তার প্রতিটি কোণে পুরোনো ঘর, নকশা করা দরজা, ছাদের কাঠের খুঁটি—সবকিছুই চোখে পড়ে। গাইডসহ ভ্রমণ করলে পর্যটকরা সিয়হে ইউয়ান, উঠোন, স্থানীয় জীবনধারা এবং চীনা পরিবারের সংস্কৃতি সম্পর্কে আরও গভীর ধারণা পেতে পারেন। হুতংয়ের ছোট বাজারে গেলে চীনা স্ট্রিট ফুডের স্বাদ নিতে পারা যায়—স্টিমড বান (Baozi), নুডলস, চা এবং স্থানীয় মিষ্টি। ছোট রেস্তোরাঁগুলোও ইতিহাসের ছোঁয়া বহন করে।

হুতংয়ের বিশেষত্ব হলো এখানে কম জায়গায় ঘনিষ্ঠ সম্প্রদায় গড়ে ওঠা। এটি আধুনিক শহরের ব্যস্ততা থেকে একটি বিরাম—যেখানে মানুষ একে অপরকে চেনে, সাহায্য করে এবং গল্প শোনে। শিশুদের জন্যও শিক্ষণীয়—সহমর্মিতা, সামাজিক বন্ধন এবং সংস্কৃতির সংরক্ষণ। এছাড়া, হুতংয়ের প্রতিটি রাস্তায় প্রকৃতির নিঃশব্দ ছোঁয়া অনুভূত হয়—একটি নীরবতা, যা শহরের অন্যান্য অংশে পাওয়া কঠিন।

হুতং শুধু দেখা যায় না; এটি অনুভব করা যায়। এখানে বসে চুপচাপ ভাবা যায়, চারপাশের মানুষ, জীবনের ছন্দ, এবং সময়কে মনোযোগ সহকারে বোঝা যায়। এটি এমন এক জায়গা, যেখানে ইতিহাস, সংস্কৃতি, প্রকৃতি এবং মানব জীবন একত্রিত হয়ে একটি মনোরম নীরবতা তৈরি করে।

হুতং এলাকা আজও বেইজিংয়ের হৃদয়। আধুনিকতার ঝলক, বুলকন্ঠ গাড়ির শব্দ, উঁচু ভবনের আকাশচুম্বী ধ্বনি—সব মিলিয়ে শহর চমক দেখায়। কিন্তু হুতং দেখলেই বোঝা যায়, এই শহরের আসল গল্প কোথায় লুকিয়ে আছে। ছোট গলি, উঠোন, হাসি, আড্ডা—সবই এই শহরের প্রাণ, যা বেইজিংকে শুধু একটি শহর না করে, একটি জীবন্ত ইতিহাস বানিয়ে রেখেছে।