ঢাকা, মঙ্গলবার ০৩, ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৫:৫০:৩৩ পিএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

শবে বরাত: ক্ষমা, প্রার্থনা ও আত্মশুদ্ধির রজনী

মওলানা আব্দুর রহমান

উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ১২:৫০ পিএম, ৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ মঙ্গলবার

প্রতীকী ছবি।

প্রতীকী ছবি।

হিজরি বর্ষপঞ্জির অষ্টম মাস শাবানের মধ্যরজনী—১৪ ও ১৫ শাবানের মধ্যবর্তী রাত—মুসলিম সমাজে পরিচিত ‘শবে বরাত’ নামে। আরবি ‘লাইলাতুল বরাআত’ অর্থাৎ মুক্তির রজনী—যে রাতে মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাদের জন্য ক্ষমা ও রহমতের দরজা উন্মুক্ত করে দেন বলে বিশ্বাস করা হয়। উপমহাদেশে এই রাতটি বিশেষ গুরুত্ব ও আবেগের সঙ্গে পালিত হয়ে আসছে শতাব্দীর পর শতাব্দী।

শবে বরাতের তাৎপর্য:

ইসলামি পরিভাষায় ‘বরাত’ শব্দের অর্থ নিষ্কৃতি, মুক্তি কিংবা দায়মুক্তি। হাদিসের বর্ণনায় এসেছে, এই রাতে আল্লাহ তায়ালা অসংখ্য বান্দাকে ক্ষমা করে দেন এবং পরবর্তী এক বছরের জন্য মানুষের রিজিক, জীবন-মৃত্যু ও ভাগ্যের নানা বিষয় নির্ধারণ করেন। এ কারণে মুসলমানরা এই রাতকে আত্মসমালোচনা, তওবা ও দোয়ার মাধ্যমে কাটানোর চেষ্টা করেন।

শবে বরাত কেবল একটি আনুষ্ঠানিক ইবাদতের রাত নয়; এটি মানুষের ভেতরের অন্ধকার দূর করে আলোর পথে ফিরে আসার আহ্বান। জীবনের ভুল, অবহেলা ও গুনাহ থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষাই এই রাতের মূল শিক্ষা।

ইবাদত ও আমলের ধারা:

এই রাতে মুসলমানরা নফল নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত, জিকির ও দোয়ার মাধ্যমে সময় কাটান। অনেকেই কবরস্থানে গিয়ে মৃত আত্মীয়দের জন্য মাগফিরাত কামনা করেন। রোজা রাখাও অনেকে সুন্নত আমল হিসেবে পালন করেন—বিশেষত ১৫ শাবানের দিনে।

তবে আলেমরা মনে করিয়ে দেন, শবে বরাতের ইবাদত হতে হবে লোক দেখানো বা কুসংস্কারমুক্ত। ইবাদতের মূল উদ্দেশ্য আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর নৈকট্য লাভ।

সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট:

বাংলাদেশসহ উপমহাদেশে শবে বরাত একটি সামাজিক রূপও পেয়েছে। ঘরে ঘরে হালুয়া, রুটি, পায়েসসহ নানা খাবার তৈরি করে আত্মীয়-প্রতিবেশীদের মধ্যে বিতরণ করা হয়। মসজিদে মসজিদে বিশেষ দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়।

এই সাংস্কৃতিক চর্চা মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সৌহার্দ্য বাড়ায়। তবে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে এসব কাজ তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা অহংকার বা প্রদর্শনীর বদলে আন্তরিকতার প্রকাশ হয়।

আত্মসমালোচনা ও মানবিক শিক্ষা:

শবে বরাতের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—নিজেকে প্রশ্ন করা। আমরা কি আমাদের দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করছি? মানুষের হক নষ্ট করছি কি না? সমাজে অন্যায়, হিংসা ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে আমরা কতটা সচেতন?

এই রাতে শুধু নিজের গুনাহ মাফের দোয়া নয়, বরং সমাজের শান্তি, নিপীড়িত মানুষের মুক্তি এবং মানবতার কল্যাণ কামনাও হওয়া উচিত। তবেই শবে বরাত ব্যক্তি ও সমাজ—উভয়ের জন্য কল্যাণের বার্তা বয়ে আনতে পারে।

শেষ কথা:

শবে বরাত আমাদের মনে করিয়ে দেয়—জীবন ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু ক্ষমা ও কল্যাণের সুযোগ অফুরন্ত। এই রাত আমাদের জন্য নতুনভাবে শুরু করার এক মহামুহূর্ত। আত্মশুদ্ধির পথে হাঁটার সংকল্প নিয়ে যদি আমরা শবে বরাতকে বরণ করি, তবে তা কেবল একটি রাত নয়—বরং সারা বছরের জন্য আলোর দিশা হয়ে উঠতে পারে।

শবে বরাত হোক আত্মশুদ্ধি, ক্ষমা ও মানবিকতার দীপ্তিময় বার্তা।