পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় আজও কোণঠাসা নারী
জারা আলম
উইমেননিউজ২৪
প্রকাশিত : ০৮:৪৪ পিএম, ৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ রবিবার
প্রতীকী ছবি।
সভ্যতার অগ্রযাত্রার গল্প যতই বলা হোক, বাস্তবতায় নারীর জীবন আজও বহু ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ এক অদৃশ্য দেয়ালের মধ্যে আবদ্ধ। রাষ্ট্রীয় নীতিমালা, উন্নয়নের সূচক কিংবা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির আড়ালে প্রতিদিনের বাস্তবতায় নারীকে লড়াই করতে হয় পরিবার, সমাজ ও কর্মক্ষেত্রের নানা স্তরে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা তাকে মানুষ হিসেবে নয়, বরং নিয়ন্ত্রিত সত্তা হিসেবে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে।
শৈশব থেকেই এই বৈষম্যের বীজ বোনা হয়। ছেলেশিশুর ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার প্রস্তুতি নেওয়া হয় যত্ন ও প্রত্যাশার সঙ্গে, আর মেয়েশিশুকে শেখানো হয় মানিয়ে নেওয়ার পাঠ। কোথায় হাসবে, কী পরবে, কখন কথা বলবে—এই সব নির্দেশনার মধ্য দিয়ে নারীর স্বাধীনতা ধীরে ধীরে সংকুচিত হতে থাকে। তার স্বপ্নের চেয়ে সমাজের চোখ বড় হয়ে ওঠে।
শিক্ষার ক্ষেত্রেও নারীর অগ্রযাত্রা সহজ নয়। পরিসংখ্যান বলছে, বিদ্যালয়ে ভর্তির হারে নারীরা অনেক দেশে পুরুষের কাছাকাছি পৌঁছালেও ঝরে পড়ার হার এখনো বেশি। দারিদ্র্য, বাল্যবিবাহ, গৃহস্থালি দায়িত্ব আর নিরাপত্তাহীনতা—সব মিলিয়ে শিক্ষাজীবন মাঝপথে থমকে যায় অসংখ্য মেয়ের। যে মেয়েটি পড়তে চায়, তাকে প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়—“এত পড়ে কী হবে?”
কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের পরও চ্যালেঞ্জ কমে না। সমান কাজ করেও সমান মজুরি পাওয়া যায় না। পদোন্নতিতে নারীর পথ আটকে যায় অদৃশ্য দেয়ালে—যাকে বলা হয় ‘গ্লাস সিলিং’। অনেক নারী কাজের জায়গায় হয়রানি, কটুক্তি ও অবমূল্যায়নের শিকার হন। আবার ঘরে ফিরে তাকে বহন করতে হয় গৃহস্থালির পুরো বোঝা। কর্মজীবী হয়েও তার শ্রমকে ‘সহযোগিতা’ হিসেবে দেখা হয়, দায়িত্ব হিসেবে নয়।
আইন ও নীতিমালায় নারীর অধিকার স্বীকৃত হলেও বাস্তব প্রয়োগে বড় ফাঁক রয়ে গেছে। নির্যাতন, ধর্ষণ, পারিবারিক সহিংসতা—এসব অপরাধের বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘসূত্রতা ও সামাজিক চাপের কারণে অনেক সময় থমকে যায়। ভুক্তভোগী নারীকে অপরাধীর আসনে দাঁড় করানো হয় প্রশ্নের মাধ্যমে—কেন বাইরে গিয়েছিল, কেন কথা বলেছিল, কেন পোশাক এমন ছিল। অপরাধের দায় গিয়ে পড়ে নারীর আচরণের ওপর, অপরাধীর ওপর নয়।
গ্রাম ও শহরের চিত্রে পার্থক্য থাকলেও মূল সুর একই। গ্রামে নারীর শ্রম কৃষিকাজে অদৃশ্য থেকে যায়, শহরে তা অফিসের পরিসংখ্যানে ঠাঁই পায় না। কোথাও সে গৃহবধূ, কোথাও গৃহকর্মী, কোথাও শ্রমিক—কিন্তু সর্বত্রই তার পরিশ্রমকে স্বাভাবিক ও অবশ্যম্ভাবী হিসেবে ধরে নেওয়া হয়।
রাজনীতি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রেও নারীর অংশগ্রহণ সীমিত। সংসদ, মন্ত্রিসভা কিংবা স্থানীয় সরকার—সবখানেই পুরুষের আধিপত্য স্পষ্ট। নারী প্রতিনিধিত্ব থাকলেও অনেক সময় তা প্রতীকী হয়ে থাকে। নারীর কণ্ঠ সেখানে পৌঁছালেও সিদ্ধান্তের টেবিলে তার প্রভাব কম।
তবে এই চিত্রের মধ্যেও পরিবর্তনের ইঙ্গিত আছে। শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে নারীরা নিজেদের জায়গা তৈরি করছে। পোশাকশিল্পের শ্রমিক থেকে শুরু করে চিকিৎসক, শিক্ষক, সাংবাদিক, প্রশাসক—সবখানেই নারীর উপস্থিতি বাড়ছে। তারা প্রশ্ন তুলছে, প্রতিবাদ করছে, নিজেদের গল্প নিজেই লিখতে চাইছে।
তবু প্রশ্ন থেকে যায়—এই অগ্রযাত্রা কি যথেষ্ট? পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার মূল কাঠামো না বদলালে নারীর মুক্তি কি সত্যিই সম্ভব? পরিবারে সিদ্ধান্তের অধিকার, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও সমতা, আইনের কঠোর প্রয়োগ—এই তিন স্তরে একসঙ্গে পরিবর্তন না এলে নারীর অবস্থান বদলাবে না।
নারীকে কোণঠাসা করে রেখে কোনো সমাজ প্রকৃত অর্থে এগোতে পারে না। কারণ, জনসংখ্যার অর্ধেককে পিছনে ফেলে রেখে উন্নয়ন কেবল সংখ্যার খেলাই থেকে যায়। নারী কেবল ভুক্তভোগী নয়, সে সমাজের চালিকাশক্তিও। তার শ্রম, চিন্তা ও নেতৃত্ব ছাড়া কোনো রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ টেকসই হতে পারে না।
পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার দেয়াল ভাঙতে হলে প্রয়োজন মানসিকতার পরিবর্তন। আইন দিয়ে পথ দেখানো যায়, কিন্তু সংস্কার আসে পরিবার ও শিক্ষার ভেতর দিয়ে। ছেলে-মেয়েকে আলাদা করে নয়, মানুষ হিসেবে বড় করে তুলতে পারলেই সমাজ বদলাবে।
আজ নারী কোণঠাসা। কিন্তু সেই কোণেই জন্ম নিচ্ছে প্রশ্ন, প্রতিবাদ আর পরিবর্তনের ভাষা। এই ভাষাকে জায়গা দিতে না পারলে সমাজের অগ্রযাত্রা থেমে যাবে। নারীকে সামনে আনাই এখন সময়ের দাবি—দয়া করে নয়, অধিকার হিসেবে।
