ঢাকা, রবিবার ১৫, ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ৭:১৭:৪৪ এএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

ফুলে ফুলে বসন্তের গান: রঙ, গন্ধ আর জীবনের উৎসব

রাতুল মাঝি

উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ১২:৪৯ এএম, ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ রবিবার

ফাইল ছবি।

ফাইল ছবি।

শীতের কুয়াশা ধীরে ধীরে সরে গেলে প্রকৃতি যেন নতুন করে শ্বাস নেয়। রুক্ষতা ঝরিয়ে মাঠ-ঘাট, বন-ঝোপ, রাস্তার ধারে আর বাগানের কোণে কোণে জন্ম নেয় রঙের ভাষা। সেই ভাষার নাম—ফুল। বসন্ত এলেই প্রকৃতি কথা বলে ফুলে ফুলে। লাল, হলুদ, সাদা আর গোলাপি রঙে লেখা হয় ঋতুরাজের আগমনী বার্তা।

গ্রামবাংলার পথে হাঁটলে চোখে পড়ে শিমুল আর পলাশের আগুনরঙা হাসি। শহরের পার্ক আর ছাদবাগানে ফুটে ওঠে গোলাপ, গাঁদা আর রজনীগন্ধা। বাতাসে মিশে থাকে জুঁই ও বকুলের মিষ্টি সুবাস। বসন্ত যেন শুধু একটি ঋতু নয়—একটি অনুভূতি, যা ফুল হয়ে চোখে পড়ে, গন্ধ হয়ে নাকে আসে, আর রঙ হয়ে মনের ভেতরে ঢুকে যায়।

শিমুল: আগুনরঙা বসন্ত

মাঠের ধারে কিংবা নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা শিমুল গাছগুলো বসন্তে লাল ফুলে ঢেকে যায়। পাতাহীন ডালে ঝুলে থাকা শিমুল ফুল দূর থেকে আগুনের মতো জ্বলতে থাকে। গ্রামবাংলার শিশুরা শিমুল তুলো দিয়ে খেলনা বানায়, আর প্রকৃতি নিজের মতো করে সাজায় দিগন্ত।

পলাশ: বনের আগুন

পাহাড়ি অঞ্চল কিংবা উন্মুক্ত প্রান্তরে পলাশ ফুল ফুটলে মনে হয়, বন যেন রঙিন চাদর গায়ে দিয়েছে। লালচে কমলা রঙের পলাশ বসন্তের সাহসী রং। লোককথায় পলাশকে বলা হয় বনের আগুন—কারণ সে নীরবে জ্বলে ওঠে প্রকৃতির বুকে।

কৃষ্ণচূড়া: আগাম বার্তা

যদিও কৃষ্ণচূড়ার রাজত্ব গ্রীষ্মে, বসন্তের শেষভাগেই তার কুঁড়ি দেখা দেয়। সবুজ পাতার ফাঁকে লাল কুঁড়িগুলো জানান দেয়—আর কিছুদিন পর রাস্তার দুই পাশ আগুনরঙা হয়ে উঠবে।

গাঁদা: উৎসবের হলুদ

হলুদ আর কমলা রঙের গাঁদা বসন্তের সবচেয়ে সহজলভ্য ফুল। গ্রামীণ বাগান থেকে শহরের ফুলের বাজার—সবখানেই গাঁদার আধিপত্য। বিয়ে, পূজা, মেলা কিংবা বসন্ত উৎসবে গাঁদা ফুল হয়ে ওঠে আনন্দের প্রতীক।

রজনীগন্ধা: সন্ধ্যার সুগন্ধ

দিনের আলো ফুরোলেই রজনীগন্ধার সুবাস বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। সাদা রঙের এই ফুল যেন সন্ধ্যার নীরব কবিতা। অনেকের ঘরের বারান্দায় বা উঠোনে রজনীগন্ধার ঘ্রাণ বসন্তের রাতকে আরও মধুর করে তোলে।

গোলাপ: রঙের গল্প

লাল, সাদা, গোলাপি, হলুদ—গোলাপের প্রতিটি রং যেন আলাদা ভাষা। বসন্তে গোলাপ গাছগুলো বেশি ফুল দেয়। ভালোবাসা, সৌন্দর্য আর অনুভূতির প্রতীক হয়ে ওঠে গোলাপ।

জুঁই ও বকুল: গ্রামের সুবাস

গ্রামবাংলার উঠোনে কিংবা পথের ধারে ফুটে থাকা জুঁই ও বকুল ছোট হলেও গন্ধে বড়। বাতাসে মিশে থাকা এই ফুলের সুবাস বসন্তকে করে তোলে আরও গভীর, আরও ঘরোয়া।

প্রকৃতি ও জীবনের সম্পর্ক

প্রকৃতিবিদরা বলছেন, বসন্তকালে সূর্যালোক ও তাপমাত্রার পরিবর্তনের কারণে গাছগুলো দ্রুত বেড়ে ওঠে। ফুল ফোটে, মৌমাছি আসে, প্রজাপতি ডানা মেলে। ফুলের সঙ্গে সঙ্গে জীববৈচিত্র্যও জেগে ওঠে।

ফুলচাষিরা জানান, বসন্ত এলেই তাদের ব্যস্ততা বাড়ে। ফুল ওঠে মাঠ থেকে, যায় শহরের বাজারে। উৎসব, বিয়ে, সাংস্কৃতিক আয়োজন—সবখানেই ফুলের চাহিদা বাড়ে। ফলে এই মৌসুমি ফুল অনেক পরিবারের জীবিকার অংশ হয়ে ওঠে।

ফুল শুধু প্রকৃতিতে নয়, মানুষের মনেও

বসন্তের ফুল শুধু গাছেই ফোটে না—মানুষের মনেও ফোটে। ক্লান্ত জীবনে একটু রঙ, একটু ঘ্রাণ এনে দেয় এই ফুলগুলো। পথচলার ক্লান্তিতে হঠাৎ চোখে পড়া একগুচ্ছ পলাশ কিংবা রাস্তার ধারে ফুটে থাকা গাঁদা—মনকে মুহূর্তে হালকা করে দেয়।

সব মিলিয়ে, এই মৌসুমে শিমুল, পলাশ, কৃষ্ণচূড়া, গাঁদা, রজনীগন্ধা, গোলাপ, জুঁই আর বকুলের রঙে-গন্ধে প্রকৃতি হয়ে উঠেছে এক বিশাল ফুলের বাগান। বসন্ত যেন ফুলের মাধ্যমে মানুষকে বলে দেয়—পুরোনো দুঃখ ঝরিয়ে নতুন করে বাঁচার সময় এসেছে।