ঢাকা, শনিবার ২৮, ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ৬:৩০:২৮ এএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

হাসির আড়ালে সময়ের ভার—ববিতার একুশে পদকের দিন

ট্রেস জফি

উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ০৮:৫৪ পিএম, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ শুক্রবার

ববিতা

ববিতা

এক সময়ের চপলা-চঞ্চলা, পর্দা কাঁপানো ষোড়শী—আজ তিনি ধীর পায়ে হেঁটে উঠছেন মঞ্চে। পা টানটান, ব্যথায় ভারী। তবু ঠোঁটে সেই চেনা হাসি।

গতকাল বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান একুশে পদক গ্রহণ করলেন আমাদের চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি অভিনেত্রী ববিতা। এ পদক তিনি আরও বহু আগেই পেতে পারতেন। যাক, তবু যে জীবনদশায় পেলেন সেই শেষ সান্তনা। 

কাল ববিতার প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে পদক নেওয়ার সময় মঞ্চে ওঠার দৃশ্যটি যেন শুধু একটি আনুষ্ঠানিক মুহূর্ত ছিল না—ওটা ছিল সময়ের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এক শিল্পীর নীরব সাক্ষ্য।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি অভিনেত্রী ববিতার (ফরিদা আক্তার পপি)। তার সবচেয়ে বিখ্যাত ও আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত সিনেমা হলো সত্যজিৎ রায়ের 'অশনি সংকেত' (১৯৭৩)। এছাড়া, তার উল্লেখযোগ্য অন্যান্য সিনেমার মধ্যে রয়েছে 'সংসার', 'তিন কন্যা', 'সুন্দরী', 'নয়নমণি', 'বসুন্ধরা', এবং 'গোলাপী এখন ট্রেনে'সহ আর কত সিনেমা। 

যে নারী একদিন পর্দায় দৌড়েছেন, নেচেছেন, কেঁদেছেন, ভালোবেসেছেন— আজ তিনি হাঁটছেন ধীরে, খুব ধীরে। পায়ে ব্যথা। বয়স হয়েছে। চোখে জল আসে দর্শকের, অথচ তিনি নিজে হাসছেন।

যে মুখে ছিল তারুণ্যের ঝিলিক:
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে ববিতার আগমন ছিল ঝড়ের মতো। স্বচ্ছ চোখ, সাবলীল অভিনয়, স্বাভাবিক সৌন্দর্য—সব মিলিয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন মধ্যবিত্ত বাঙালি নারীর প্রতিচ্ছবি। প্রেম, বেদনা, প্রতিবাদ—সব আবেগেই তিনি ছিলেন বিশ্বাসযোগ্য।

পর্দায় তাকে দেখে দর্শক কেঁদেছে, আবার প্রেমেও পড়েছে। তিনি শুধু নায়িকা ছিলেন না—তিনি ছিলেন এক প্রজন্মের অনুভূতির ভাষা। আজ সেই মুখে বলিরেখা। চুলে রুপালি ছায়া। তবু মুখে হাসি—অভিনয়ের পুরনো অভ্যাস।

মঞ্চে ওঠার সেই দৃশ্য: 
পদক নিতে মঞ্চে ওঠার সময় তাকে একটু থামতে হলো। পা ঠিকমতো উঠছে না। হাত বাড়িয়ে দেওয়া হলো সহায়তা।

এই দৃশ্য দেখে মনে হলো— এটা শুধু একজন অভিনেত্রীর বয়স হওয়ার গল্প নয়, এটা আমাদের চলচ্চিত্রের সময় পার হয়ে যাওয়ার দৃশ্যমান রূপ।

আমরা যারা তাকে তরুণী হিসেবে দেখেছি, তারা হঠাৎ বুঝে গেলাম—আমরাও বয়সী হচ্ছি।

হাসিমুখে লুকানো ক্লান্তি:

ববিতা হাসলেন। ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে হাসলেন। পদক হাতে নিয়েও হাসলেন। কিন্তু সেই হাসির আড়ালে ছিল ক্লান্ত শরীর, আর জীবনের দীর্ঘ পথচলার ছাপ।

একসময় যিনি শুটিং সেটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে পারতেন, আজ তিনি মঞ্চে দাঁড়িয়ে থাকতেই কষ্ট পাচ্ছেন।

এটাই সময়ের নির্মমতা। এটাই জীবনের সত্য।

বোনদের ছায়ায় দাঁড়িয়ে থাকা শিল্পী:

ববিতার জীবনের গল্প শুধু তার একার নয়। তার পাশে ছিল তার বোনেরা—শিল্পের আরেক আলো। চলচ্চিত্রের আরেক জনপ্রিয় মুখ চম্পা, আর টেলিভিশন ও চলচ্চিত্রের শক্তিমান অভিনেত্রী সুচন্দা— এই তিন বোন মিলেই যেন এক সময়ের অভিনয়ভিত্তিক এক নীরব বিপ্লব।

এক পরিবারে তিনজন অভিনেত্রী—এটা কেবল কাকতাল নয়, এটা শিল্পের প্রতি এক অদ্ভুত টান।

ববিতা যখন নায়িকা হয়ে উঠছেন, তখন তার বোনেরাও নিজেদের মতো করে শিল্পের পথে হাঁটছেন। একজন রূপালি পর্দায়, অন্যজন ছোট পর্দায়— সবাই নিজের জায়গা তৈরি করেছেন।

তিন বোনের পথ আলাদা, কিন্তু শিকড় এক— সংগ্রাম আর শিল্পের ভালোবাসা।

একুশে পদক—শুধু পদক নয়:
এই পদক শুধু রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি নয়। এটা তার জীবনের দীর্ঘ অভিনয়যাত্রার একটি দাঁড়ি। এই পদক মানে—বাংলাদেশ বলছে, “তোমার শ্রম আমরা ভুলিনি।” এই পদক মানে—একজন অভিনেত্রী আর শুধু নায়িকা নন, তিনি এখন ইতিহাসের অংশ। সময়ের কাছে হার মানা শরীর, জিতে থাকা মুখ

ববিতা এখন বয়স্ক নারী। পায়ে ব্যথা। শরীর দুর্বল। কিন্তু চোখে এখনো আলো। মুখে এখনো হাসি।

তিনি যেন বলছেন— “শরীর থামলেও অভিনয়ের স্মৃতি থামে না।”

এই হাসির মধ্যেই লুকিয়ে আছে—তার তরুণ বয়স, তার শুটিং সেট, তার সিনেমার গান, তার দর্শকের ভালোবাসা।

আমাদের কষ্ট, তার সম্মান:
মঞ্চে ওঠার সময় তাকে দেখে কষ্ট হয়েছে। কারণ আমরা তাকে তরুণী হিসেবেই দেখতে চাই। কিন্তু একই সঙ্গে গর্বও হয়েছে। কারণ—তিনি পড়ে যাননি, তিনি দাঁড়িয়ে ছিলেন, তিনি সম্মান নিয়েছেন।

এটা শুধু একজন অভিনেত্রীর পুরস্কার নেওয়ার মুহূর্ত নয়, এটা আমাদের চলচ্চিত্রের এক জীবন্ত ইতিহাসকে সম্মান জানানোর দৃশ্য।

শেষ কথা:
ববিতা আজ আর পর্দার নায়িকা নন, তিনি সময়ের নায়িকা। তার হাঁটা ধীর, কিন্তু তার পথ লম্বা। তার শরীর ক্লান্ত, কিন্তু তার নাম অমর।

একুশে পদক হাতে দাঁড়িয়ে থাকা সেই হাসিমুখ নারী আমাদের মনে করিয়ে দিল— শিল্পী বয়সে বুড়ো হন, কিন্তু শিল্প কখনো বুড়ো হয় না। ভালোবাসা ববিত।