গ্রামীণ ইতিহাসের ধারক ও বাহক ‘খড়ম’ হারিয়ে যাচ্ছে
অনু সরকার
উইমেননিউজ২৪
প্রকাশিত : ০১:০৩ পিএম, ৪ মার্চ ২০২৬ বুধবার
ছবি: সংগ্রহিত।
একসময় গ্রামবাংলার পথঘাটে, হাট-বাজারে, মন্দিরের উঠোনে কিংবা সাধু-সন্ন্যাসীদের পায়ে পায়ে যে শব্দ শোনা যেত—টকটক টকটক—তা ছিল খড়মের শব্দ। কাঠের তৈরি এই পাদুকা শুধু চলার উপকরণ ছিল না, ছিল জীবনাচারের অংশ, সংস্কৃতির পরিচয়। সময় বদলেছে, বদলেছে মানুষের রুচি ও প্রয়োজন। আধুনিক জুতা-স্যান্ডেলের ভিড়ে আজ হারিয়ে যেতে বসেছে ঐতিহ্যবাহী খড়ম।
খড়মের ইতিহাস:
খড়মের ইতিহাস বহু প্রাচীন। ভারতীয় উপমহাদেশে প্রাচীনকাল থেকেই কাঠের তৈরি এই পাদুকার প্রচলন ছিল। সংস্কৃত গ্রন্থে ‘পাদুকা’ নামে খড়মের উল্লেখ পাওয়া যায়। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, বিশেষ করে বৈষ্ণব ও সন্ন্যাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে খড়ম ছিল অপরিহার্য। মন্দিরে প্রবেশের সময় খড়ম খুলে রাখা হতো, আবার পূজা বা ভ্রমণের সময় পরা হতো খড়মই।
বাংলার গ্রামসমাজে খড়ম ছিল সাধারণ মানুষের জুতা। মাঠে কাজ করা কৃষক, নদীপাড়ে হাঁটা জেলে, হাটে যাওয়া মানুষ—সবার পায়ে দেখা যেত কাঠের খড়ম। কাদা, পানি বা কাঁটাযুক্ত পথে হাঁটার জন্য এটি ছিল বেশ কার্যকর।
গড়নের বৈশিষ্ট্য:
খড়ম মূলত কাঠের তৈরি। পায়ের তলা রাখার জায়গায় থাকে একটি চওড়া কাঠের পাত, মাঝখানে বা সামনের দিকে থাকে খুঁটির মতো একটি অংশ, যেখানে পায়ের আঙুল আটকে রাখা হয়। কোনো কোনো খড়মে চামড়ার ফিতা বা কাপড়ের বেল্ট লাগানো থাকত।
নিম, শাল, কড়ই বা আম কাঠ দিয়ে খড়ম তৈরি হতো। কাঠ মসৃণ করে ঘষে নিলে এটি বেশ টেকসই হতো এবং দীর্ঘদিন ব্যবহার করা যেত।
ব্যবহার ও প্রয়োজনীয়তা: খড়মের প্রধান ব্যবহার ছিল—
কাদা বা পানিভেজা রাস্তায় হাঁটা
গরম মাটি বা বালির ওপর পা না পুড়িয়ে চলা
ধর্মীয় কারণে চামড়ার জুতা পরা নিষিদ্ধ এমন জায়গায় ব্যবহার
গ্রামীণ জীবনে দৈনন্দিন চলাফেরা
বর্ষাকালে যখন রাস্তাঘাট কর্দমাক্ত হয়ে উঠত, তখন খড়ম ছিল সবচেয়ে ভরসার পাদুকা। এতে পা তুলনামূলকভাবে উঁচুতে থাকত, ফলে পা ভিজে যেত কম।
সংস্কৃতি ও প্রতীকী অর্থ:
খড়ম শুধু পাদুকা নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আধ্যাত্মিকতা ও শালীনতার ধারণা। সন্ন্যাসীরা খড়ম পরতেন ভোগবিলাস ত্যাগের প্রতীক হিসেবে। অনেক সাধক মনে করতেন, চামড়ার জুতা প্রাণীর চামড়া দিয়ে তৈরি—তাই তা পরিহার করাই উত্তম।
নাটক, যাত্রা ও লোকগানে খড়মের শব্দকে ব্যবহার করা হয়েছে আলাদা মাত্রা দিতে। “খড়মের টকটক শব্দে আসছে সাধু”—এমন পঙ্ক্তি লোককথায় আজও শোনা যায়।
কারিগর ও তাদের জীবন:
একসময় গ্রামাঞ্চলে আলাদা খড়মকার বা কাঠশিল্পী থাকতেন, যাদের কাজ ছিল কাঠ কেটে, ছেঁটে, পালিশ করে খড়ম বানানো। হাটে বসে তাঁরা খড়ম বিক্রি করতেন। আজ সেই পেশা প্রায় বিলুপ্ত।
কারিগররা বলছেন, এখন আর ক্রেতা নেই বললেই চলে। প্লাস্টিক স্যান্ডেল ও রাবারের জুতা সস্তা ও আরামদায়ক হওয়ায় মানুষ খড়ম থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।
হারিয়ে যাওয়ার কারণ:
খড়ম হারিয়ে যাওয়ার পেছনে কয়েকটি বড় কারণ রয়েছে—
আধুনিক জুতা ও স্যান্ডেলের সহজলভ্যতা
খড়ম তুলনামূলক ভারী ও হাঁটতে কষ্টকর
শহুরে জীবনে খড়মের ব্যবহার অপ্রয়োজনীয়
নতুন প্রজন্মের কাছে এটি “সেকেলে” হিসেবে বিবেচিত
কারিগর ও কাঁচামালের সংকট:
আজ গ্রামেও কংক্রিটের রাস্তা, পাকা ঘর—সবকিছু বদলে গেছে। কাদা ও জলাভূমির পথে হাঁটার প্রয়োজন কমে যাওয়ায় খড়মের প্রয়োজনীয়তাও কমে গেছে।
স্মৃতিতে খড়ম:
আজ খড়ম দেখা যায় মূলত মেলা, জাদুঘর কিংবা মন্দিরে। কিছু সাধু-সন্ন্যাসী এখনও এটি ব্যবহার করেন ধর্মীয় অনুশীলনের অংশ হিসেবে। লোকজ উৎসব বা নাটকে খড়ম এখন এক ধরনের প্রতীকী বস্তু—যা দেখে মানুষ পুরোনো দিনের কথা মনে করে।
গ্রামের বয়স্ক মানুষদের কাছে খড়ম মানে শৈশবের স্মৃতি। তাঁরা বলেন, “এক জোড়া খড়ম কিনলে বছরের পর বছর চলত। পা ব্যথা করত, তবু কাদায় পা ডোবাতে হতো না।”
ঐতিহ্য রক্ষার প্রশ্ন:
খড়ম হারিয়ে যাওয়া মানে শুধু একটি পাদুকা হারানো নয়, হারিয়ে যাওয়া মানে একটি জীবনধারা, একটি নান্দনিকতা, একটি সময়ের স্মৃতি মুছে যাওয়া। লোকজ শিল্প ও গ্রামীণ সংস্কৃতি সংরক্ষণের উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম খড়মকে শুধু ছবিতেই দেখবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, খড়মকে আধুনিক নকশায় রূপ দিয়ে, পর্যটন ও সাংস্কৃতিক পণ্যে পরিণত করা গেলে এটি আবার নতুনভাবে ফিরতে পারে। হস্তশিল্প মেলায় খড়মকে স্মারক বা সাজসজ্জার বস্তু হিসেবে তুলে ধরা গেলে এর পরিচিতি বাড়বে।
শেষ কথা:
খড়ম ছিল মাটির মানুষের পাদুকা—সহজ, নির্ভেজাল, প্রকৃতিনির্ভর। সভ্যতার চাপে আজ তা কোণঠাসা। সময়ের সঙ্গে বদলানো স্বাভাবিক, কিন্তু ঐতিহ্য ভুলে যাওয়া নয়।
খড়মের টকটক শব্দ আজ আর শোনা যায় না, কিন্তু সেই শব্দের ভেতরে লুকিয়ে আছে বাংলার এক টুকরো ইতিহাস—যা হারিয়ে গেলে আমরা আমাদেরই একটি অংশ হারাবো।
