জলবায়ু পরিবর্তন: পানি সংকটের বোঝা নারীর কাঁধেই বেশি
জোসেফ সরকার
উইমেননিউজ২৪
প্রকাশিত : ১২:১৭ এএম, ১৩ মার্চ ২০২৬ শুক্রবার
ছবি: সংগ্রহিত।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বিশ্বজুড়েই বাড়ছে নিরাপদ পানির সংকট। এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর ওপর, বিশেষ করে নারীদের জীবনে। বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকা, চরাঞ্চল ও খরাপ্রবণ অঞ্চলে নিরাপদ পানির অভাব এখন এক বড় মানবিক সংকটে পরিণত হয়েছে। এতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন নারী ও কিশোরীরা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি, খরা, বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ বেড়ে যাওয়ায় অনেক এলাকায় পানযোগ্য পানির উৎস নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ফলে নিরাপদ পানি সংগ্রহের দায়িত্ব যেহেতু সাধারণত নারীদের ওপরই থাকে, তাই এই সংকট তাদের জীবনে বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
উপকূলে লবণাক্ততার প্রভাব
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অনেক জেলায় নদী ও ভূগর্ভস্থ পানিতে লবণাক্ততা বেড়েছে। ফলে টিউবওয়েল ও পুকুরের পানি অনেক ক্ষেত্রে পানযোগ্য থাকে না। এতে গ্রামীণ নারীদের প্রতিদিন কয়েক কিলোমিটার দূর থেকে পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে।
উপকূলীয় অঞ্চলের বাসিন্দা শারমিন আক্তার বলেন, “আগে বাড়ির কাছেই পানির ব্যবস্থা ছিল। এখন লবণাক্ততার কারণে দূরে যেতে হয়। প্রতিদিন কয়েকবার পানি আনতে অনেক কষ্ট হয়।”
স্থানীয়দের মতে, অনেক সময় সকাল থেকে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে একটি টিউবওয়েল থেকে পানি নিতে হয়। এতে নারীদের সময় ও শ্রম দুটোই বেশি ব্যয় হয়।
স্বাস্থ্যঝুঁকিতে নারী ও শিশু
নিরাপদ পানির অভাবে স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে। দূষিত বা লবণাক্ত পানি ব্যবহারের কারণে ডায়রিয়া, চর্মরোগসহ নানা রোগের ঝুঁকি বেড়েছে। গর্ভবতী নারী ও শিশুদের ক্ষেত্রে এর প্রভাব আরও বেশি।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, লবণাক্ত পানি দীর্ঘদিন ব্যবহার করলে উচ্চ রক্তচাপসহ নানা স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দিতে পারে।
ঢাকার এক জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. সাদিয়া রহমান বলেন, “নিরাপদ পানির অভাব শুধু পানীয় জলের সমস্যা নয়, এটি একটি বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি। নারীরা পানি সংগ্রহের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।”
শিক্ষায় প্রভাব
পানি সংগ্রহের কাজ অনেক সময় কিশোরীদের ওপরও পড়ে। ফলে অনেক মেয়ে স্কুলে নিয়মিত যেতে পারে না। বিশেষ করে খরাপ্রবণ ও উপকূলীয় এলাকায় এই সমস্যা বেশি দেখা যায়।
একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার জরিপে দেখা গেছে, অনেক পরিবারে কিশোরীরা প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা সময় ব্যয় করে পানি সংগ্রহে। এতে তাদের পড়াশোনার সময় কমে যায়।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বাড়ছে
পরিবেশবিদরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা এবং খরার প্রবণতা বেড়েছে। এর ফলে নিরাপদ পানির উৎসগুলো ক্রমেই ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
পরিবেশ গবেষক ড. আরিফুল ইসলাম বলেন, “বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি। উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং খরাপ্রবণ এলাকায় পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় নিরাপদ পানির সংকট তীব্র হচ্ছে।”
নারীর ওপর বাড়তি চাপ
গ্রামীণ সমাজে পানির দায়িত্ব সাধারণত নারীদের ওপরই থাকে। তাই পানির সংকট বাড়লে নারীদের কাজের চাপও বেড়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে ভোরে উঠে দূর থেকে পানি সংগ্রহ করতে হয়।
নারী অধিকার কর্মীরা বলছেন, নিরাপদ পানির অভাব নারীদের জীবনে বহুমাত্রিক প্রভাব ফেলছে। এতে তাদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তা সব ক্ষেত্রেই ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
নারী উন্নয়নকর্মী রোকেয়া পারভীন বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নারীরা বেশি অনুভব করেন। পানি সংগ্রহ, পরিবার দেখাশোনা—সব দায়িত্ব তাদের ওপর। তাই নিরাপদ পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা খুব জরুরি।”
সমাধানের উদ্যোগ
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিরাপদ পানির সংকট মোকাবিলায় টেকসই পরিকল্পনা প্রয়োজন। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, গভীর নলকূপ স্থাপন, লবণাক্ততা সহনশীল প্রযুক্তি ব্যবহার এবং স্থানীয় পর্যায়ে পানি ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা জরুরি।
সরকার ও বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থা ইতিমধ্যে কিছু প্রকল্প হাতে নিয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, সমস্যা সমাধানে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও সমন্বিত উদ্যোগ দরকার।
ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব যদি এভাবেই বাড়তে থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে নিরাপদ পানির সংকট আরও তীব্র হতে পারে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন নারী ও শিশু।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিরাপদ পানির অধিকার নিশ্চিত করা শুধু পরিবেশগত নয়, এটি একটি সামাজিক ও মানবাধিকার বিষয়ও। তাই জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলার পাশাপাশি নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কথা মাথায় রেখে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
