ঢাকা, বুধবার ২৫, মার্চ ২০২৬ ২২:১৭:৪৬ পিএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

ইতিহাস, স্থাপত্য ও স্মৃতির প্রতীক ইন্ডিয়া গেট

ফিচার ডেস্ক

উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ০৬:৪৫ পিএম, ২৫ মার্চ ২০২৬ বুধবার

ছবি: সংগ্রহিত।

ছবি: সংগ্রহিত।

ভারতের রাজধানী নিউ দিল্লির হৃদয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ইন্ডিয়া গেট কেবল একটি স্থাপনা নয়—এটি ইতিহাস, আত্মত্যাগ এবং জাতির সম্মিলিত স্মৃতির এক অনন্য প্রতীক। প্রতিদিন হাজারো মানুষ এখানে ভিড় করেন, কেউ ইতিহাস জানতে, কেউ শ্রদ্ধা জানাতে, আবার কেউ শুধু এই মহিমান্বিত স্থাপত্যের সৌন্দর্য উপভোগ করতে।

যুদ্ধস্মৃতি থেকে জাতির প্রতীক: ইন্ডিয়া গেইট নির্মিত হয়েছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধ এবং তৃতীয় অ্যাংলো-আফগান যুদ্ধে নিহত ভারতীয় সৈন্যদের স্মরণে। প্রায় ৭০ হাজার ভারতীয় সেনার আত্মত্যাগকে সম্মান জানাতে এই স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করা হয়। ব্রিটিশ শাসনামলে এর নির্মাণকাজ শুরু হয় ১৯২১ সালে এবং ১৯৩১ সালে এটি সম্পন্ন হয়।

এই স্থাপত্যটির নকশা করেন বিখ্যাত ব্রিটিশ স্থপতিএডউইন লুটিয়েন্স, যিনি দিল্লির অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা পরিকল্পনায় যুক্ত ছিলেন। ইন্ডিয়া গেইটের দেয়ালে খোদাই করা রয়েছে হাজার হাজার শহীদ সেনার নাম—যা এটিকে শুধুমাত্র একটি স্থাপনা নয়, বরং এক বিশাল স্মৃতিফলকে পরিণত করেছে।

স্থাপত্যের নান্দনিকতা: প্রায় ৪২ মিটার উঁচু ইন্ডিয়া গেইট দেখতে অনেকটা ফ্রান্সের আর্ক দ্য ত্রিওঁফ-এর মতো। লাল ও হলদে বেলেপাথরে নির্মিত এই গেটের গঠনশৈলীতে রয়েছে ইউরোপীয় ধাঁচের সঙ্গে ভারতীয় আবহের মিশেল।

এর চারপাশে বিস্তৃত সবুজ প্রান্তর, পরিচ্ছন্ন রাস্তা এবং সুশৃঙ্খল পরিবেশ পুরো জায়গাটিকে এক অনন্য সৌন্দর্য দিয়েছে। সন্ধ্যার আলোয় যখন পুরো গেট আলোকিত হয়ে ওঠে, তখন এর সৌন্দর্য যেন আরও কয়েকগুণ বেড়ে যায়।

অমর জওয়ান জ্যোতি: চিরন্তন শ্রদ্ধা: ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পর ইন্ডিয়া গেইটের নিচে স্থাপন করা হয় “অমর জওয়ান জ্যোতি”—একটি চিরন্তন শিখা, যা অজ্ঞাতনামা শহীদদের স্মরণে জ্বলে থাকে।

এই শিখা প্রতীক হয়ে উঠেছে দেশের জন্য প্রাণ দেওয়া সৈনিকদের অমরত্বের। রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ দিবসে এখানে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন রাষ্ট্রপ্রধান ও সামরিক কর্মকর্তারা।

রাজপথ ও প্রজাতন্ত্র দিবসের গৌরব: ইন্ডিয়া গেট সংলগ্ন রাজপথ (বর্তমানে ‘কর্তব্য পথ’ নামে পরিচিত) ভারতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আনুষ্ঠানিক সড়কগুলোর একটি। প্রতি বছর প্রজাতন্ত্র দিবসের কুচকাওয়াজ এখানেই অনুষ্ঠিত হয়।

সেদিন পুরো এলাকা রঙিন হয়ে ওঠে সামরিক কুচকাওয়াজ, সাংস্কৃতিক পরিবেশনা এবং বিভিন্ন রাজ্যের ঐতিহ্যবাহী প্রদর্শনীতে। ইন্ডিয়া গেইট তখন হয়ে ওঠে জাতীয় গৌরবের কেন্দ্রবিন্দু।

মানুষের প্রাণের জায়গা: আজকের দিনে ইন্ডিয়া গেইট শুধু ইতিহাসের স্মারক নয়, এটি মানুষের বিনোদনের অন্যতম কেন্দ্র। পরিবার, বন্ধু কিংবা পর্যটক—সবাই এখানে এসে সময় কাটাতে ভালোবাসেন। শিশুদের হাসি, বিক্রেতাদের ডাক, আর খোলা আকাশের নিচে অবসর—সব মিলিয়ে এটি এক প্রাণবন্ত পরিবেশ তৈরি করে।

গরমের দিনে ঠাণ্ডা বাতাস আর শীতের রাতে উষ্ণ চায়ের কাপে জমে ওঠে আড্ডা। স্থানীয়দের কাছে এটি যেন শহরের ফুসফুসের মতো—ব্যস্ত জীবনের মাঝে এক টুকরো স্বস্তি।

ইতিহাসের নীরব সাক্ষী: সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক কিছু বদলেছে, কিন্তু ইন্ডিয়া গেইট একইভাবে দাঁড়িয়ে আছে—নীরব অথচ শক্তিশালী এক সাক্ষী হয়ে। এটি মনে করিয়ে দেয় আত্মত্যাগ, সংগ্রাম আর জাতির অগ্রযাত্রার গল্প।

যখন কেউ ইন্ডিয়া গেইটের সামনে দাঁড়ায়, তখন শুধু একটি স্থাপনা দেখে না—দেখে ইতিহাস, অনুভব করে আবেগ, আর উপলব্ধি করে সেই সব মানুষের ত্যাগ, যাদের জন্য আজকের এই স্বাধীনতা।

ইন্ডিয়া গেইট তাই শুধু একটি পর্যটনকেন্দ্র নয়—এটি একটি অনুভূতি, একটি ইতিহাস, একটি জাতির আত্মার প্রতিচ্ছবি।