রঙবেরঙের ফড়িং—ডানায় ভর করে রঙিন স্বপ্ন
অনু সরকার
উইমেননিউজ২৪
প্রকাশিত : ০৫:১৬ পিএম, ২৭ মার্চ ২০২৬ শুক্রবার
ফড়িং
সবুজ ধানক্ষেতের ওপর হালকা বাতাস বয়ে যায়, আর সেই বাতাসের ভাঁজে ভাঁজে হঠাৎ চোখে পড়ে ক্ষুদ্র এক রঙিন উড়ান—ফড়িং। কখনো নীল, কখনো সবুজ, কখনোবা লালচে আভায় ঝলমল করা এই ছোট্ট প্রাণীটি যেন প্রকৃতির আঁকা এক জীবন্ত জলরং ছবি। নিঃশব্দে উড়ে বেড়ানো ফড়িং শুধু একটি পোকা নয়, এটি বাংলার গ্রামজীবনের এক চিরচেনা, প্রিয় দৃশ্য।
পৃথিবীর বুকে ডাইনোসরদের পদচারণের অনেক আগে থেকেই আকাশে উড়ে বেড়িয়েছে ফড়িং। প্রায় ৩০০ মিলিয়নের বেশি বছর ধরে পৃথিবীতে ফড়িংদের বসবাস। সময়ের সঙ্গে পরিবেশের পরিবর্তনে, বিবর্তনের ধারায় একসময়ের সুবিশাল পতঙ্গ ফড়িং আজকে পরিণত হয়েছে ছোট পতঙ্গে। গবেষকদের মতে, পৃথিবীতে প্রায় পাঁচ হাজার ৭০০ প্রজাতির ফড়িং দেখা যায়।
পুকুরপাড়, খাল-বিল, ধানক্ষেত কিংবা ঘাসে ঢাকা মাঠ—যেখানেই একটু জল আর সবুজের ছোঁয়া, সেখানেই ফড়িংয়ের উপস্থিতি। তারা কখনো একা, কখনো দল বেঁধে উড়ে বেড়ায়। হালকা ডানায় সূর্যের আলো পড়লে রঙের যে খেলা তৈরি হয়, তা যেন ক্ষণিকের জন্য সময়কে থামিয়ে দেয়।
শিশুদের কাছে ফড়িং মানেই এক ধরনের মুগ্ধতা। গ্রামের ছেলেমেয়েরা কখনো হাত বাড়িয়ে ধরতে চায়, কখনো শুধু তাকিয়ে থাকে বিস্ময়ে। সেই চিরচেনা ছড়ার লাইন মনে পড়ে—
“ফড়িং ফড়িং ডানা মেলে,
নীল আকাশে ভাসো খেলায় মেতে।”
ফড়িংয়ের উড়ান যেন কোনো নিয়ম মানে না, তবুও তার মধ্যে আছে এক অদ্ভুত ছন্দ। কখনো সোজা, কখনো হঠাৎ বাঁক, কখনো স্থির হয়ে ভাসা—সব মিলিয়ে তার চলাচল যেন এক নীরব নৃত্য। প্রকৃতির এই ক্ষুদ্র নৃত্যশিল্পী আমাদের অজান্তেই মন ভালো করে দেয়।
বাংলার সাহিত্যে ফড়িং বারবার এসেছে শৈশব, স্বাধীনতা আর ক্ষণস্থায়ী সৌন্দর্যের প্রতীক হয়ে। কবি জীবনানন্দ দাশ-এর প্রকৃতিনির্ভর কবিতাগুলোর আবহে যেমন ঘাস, নদী, পাখির সঙ্গে এই ছোট্ট প্রাণীর উপস্থিতি অনুভব করা যায়, তেমনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর লেখায়ও প্রকৃতির ক্ষুদ্রতম সৌন্দর্যের প্রতি এক গভীর টান দেখা যায়।
ফড়িংয়ের জীবনচক্রও কম বিস্ময়কর নয়। পানির ভেতর থেকে জন্ম নিয়ে ধীরে ধীরে ডানা মেলে আকাশে উড়ে বেড়ানো—এ যেন এক রূপান্তরের গল্প। ছোট্ট এক লার্ভা থেকে রঙিন ডানার উড়ান, প্রকৃতি যেন নিজেই তার মধ্যে লিখে রেখেছে পরিবর্তনের কবিতা।
তবে এই রঙিন ফড়িং আজ নানা কারণে হুমকির মুখে। জলাশয় ভরাট, কীটনাশকের অতিরিক্ত ব্যবহার এবং পরিবেশ দূষণের কারণে তাদের আবাসস্থল কমে যাচ্ছে। ফলে আগের মতো আর তেমন দেখা যায় না এই রঙিন উড়ান। পরিবেশবিদরা বলছেন, ফড়িং শুধু সৌন্দর্যের অংশ নয়, এটি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তাই ফড়িংকে রক্ষা করা মানে প্রকৃতির এক টুকরো সৌন্দর্যকে বাঁচিয়ে রাখা। আমাদের ছোট্ট সচেতনতা—জলাশয় সংরক্ষণ, বিষাক্ত রাসায়নিক কম ব্যবহার—এই প্রাণীগুলোর অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করতে পারে।
শেষ বিকেলের সোনালি আলোয়, যখন ধানক্ষেতের ওপর দিয়ে হালকা বাতাস বয়ে যায়, তখন হঠাৎ কোনো এক ফড়িং ডানা মেলে উড়ে ওঠে। সেই উড়ানে যেন লুকিয়ে থাকে এক অদ্ভুত স্বাধীনতা, এক মায়াবী সৌন্দর্য। মনে হয়, জীবনের সব ব্যস্ততা ছেড়ে যদি এক মুহূর্তের জন্য ফড়িংয়ের মতো উড়ে যাওয়া যেত!
ফড়িং তাই শুধু একটি পোকা নয়—এটি বাংলার প্রকৃতির এক কোমল, রঙিন কবিতা; ক্ষণিকের হলেও যার সৌন্দর্য চিরকাল মনে থেকে যায়।
ফড়িং, আমার ভালোবাসার ফড়িং...।
