ঢাকা, বৃহস্পতিবার ০৪, জুন ২০২৬ ৫:৫১:৪৯ এএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

মুকুটের আড়ালের এক দীর্ঘ জীবন: রাণী এলিজাবেথের গল্প

অনু সরকার

উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ০৬:০৯ পিএম, ২৪ মে ২০২৬ রবিবার

বৃটেনের রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথ

বৃটেনের রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথ

বিশ্ব ইতিহাসে কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা শুধু একটি দেশের শাসক নন—একটি সময়ের প্রতীক। বৃটেনের রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথ ছিলেন তেমনই এক নাম। সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের মুখ হয়ে থাকা এই নারী শুধু রাজপ্রাসাদের অলংকার ছিলেন না; তিনি ছিলেন ধৈর্য, দায়িত্ববোধ এবং নীরব নেতৃত্বের এক অনন্য প্রতীক।

তার জন্ম হয়েছিল ১৯২৬ সালের ২১ এপ্রিল, লন্ডনের এক রাজপরিবারে। কিন্তু ছোট্ট এলিজাবেথ তখন জানতেন না, একদিন ইতিহাসের দীর্ঘতম সময় সিংহাসনে থাকা ব্রিটিশ সম্রাজ্ঞী হবেন তিনি। কারণ জন্মসূত্রে তিনি ছিলেন না সিংহাসনের সরাসরি উত্তরাধিকারী। ভাগ্যের মোড় ঘুরে যায় যখন তাঁর চাচা অষ্টম এডওয়ার্ড প্রেমের কারণে সিংহাসন ছেড়ে দেন। এরপর তাঁর বাবা ষষ্ঠ জর্জ রাজা হন, আর এলিজাবেথ হয়ে ওঠেন ভবিষ্যতের রাণী।

মাত্র ২৫ বছর বয়সে, ১৯৫২ সালে বাবার মৃত্যুর পর সিংহাসনে বসেন তিনি। তখনও পৃথিবী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্য ভাঙছে, উপনিবেশগুলো স্বাধীন হচ্ছে, বদলে যাচ্ছে বিশ্বরাজনীতি। সেই অস্থির সময়েই এক তরুণী নারী মাথায় তুলে নেন রাজমুকুট।

কিন্তু এলিজাবেথের বিশেষত্ব ছিল অন্য জায়গায়। তিনি কখনো উচ্চকণ্ঠ ছিলেন না। রাজনীতি নিয়ে প্রকাশ্যে বিতর্ক করেননি। তবু তাঁর নীরব উপস্থিতিই হয়ে উঠেছিল স্থিতিশীলতার প্রতীক। ব্রিটেনে প্রধানমন্ত্রী বদলেছেন একের পর এক—উইনস্টন চার্চিল থেকে শুরু করে লিজ ট্রাস পর্যন্ত—কিন্তু বাকিংহাম প্রাসাদের সেই পরিচিত মুখটি অপরিবর্তিত থেকেছে।

রাণী এলিজাবেথের জীবনে ছিল গৌরব, আবার গভীর ব্যক্তিগত বেদনাও। তাঁর স্বামী প্রিন্স ফিলিপ ছিলেন দীর্ঘ জীবনের সঙ্গী। সাত দশকেরও বেশি সময় একসঙ্গে কাটানোর পর ফিলিপের মৃত্যু রাণীকে ভীষণভাবে নাড়া দিয়েছিল। জীবনের শেষ দিকে তাঁকে প্রায়ই একা দেখা যেত—কিন্তু দায়িত্ব থেকে সরে যেতে দেখা যায়নি কখনো।

রাজপরিবারের নানা বিতর্কও তাঁকে তাড়া করেছে। প্রিন্সেস ডায়ানা স্পেন্সার-এর মৃত্যু, রাজপরিবারে ভাঙন, আধুনিকতার চাপ—সবকিছুর মধ্যেও তিনি নিজেকে ধরে রেখেছিলেন অবিচলভাবে। অনেকেই বলেন, ব্রিটিশ রাজতন্ত্র টিকে থাকার পেছনে সবচেয়ে বড় শক্তি ছিলেন এলিজাবেথ নিজেই।

তাঁর ব্যক্তিত্বে ছিল এক অদ্ভুত সংযম। তিনি খুব কম কথা বলতেন, কিন্তু প্রতিটি উপস্থিতি ছিল অর্থবহ। রঙিন পোশাক, মাথায় টুপি, হাতে ছোট ব্যাগ—এই পরিচিত চেহারা ধীরে ধীরে বিশ্বের সবচেয়ে পরিচিত প্রতীকগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছিল।

তবে রাজকীয় পরিচয়ের বাইরেও এলিজাবেথ ছিলেন একজন মা, দাদি, প্রপিতামহী। ঘোড়া ভালোবাসতেন, কুকুর পছন্দ করতেন, সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। তাঁর হাসি ছিল সংযত, কিন্তু আন্তরিক।

২০২২ সালের ৮ সেপ্টেম্বর স্কটল্যান্ডের বালমোরাল প্রাসাদে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। তাঁর মৃত্যুতে শুধু ব্রিটেন নয়, পুরো বিশ্ব যেন একটি যুগের অবসান দেখেছিল। কারণ এলিজাবেথ ছিলেন এমন এক সেতু, যিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পৃথিবীকে ডিজিটাল যুগের সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন।

আজও ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের কথা উঠলে রাণী এলিজাবেথের মুখই প্রথম ভেসে ওঠে। তিনি ছিলেন ক্ষমতার চেয়ে দায়িত্বের প্রতীক, জাঁকজমকের চেয়ে স্থিতির প্রতীক। ইতিহাসে তাঁর নাম লেখা থাকবে শুধু একজন রাণী হিসেবে নয়—এক দীর্ঘ সময়ের নীরব অভিভাবক হিসেবে।