দ্রোহ, প্রেম ও সাম্যের চিরন্তন কবি নজরুল
অনু সরকার
উইমেননিউজ২৪
প্রকাশিত : ১২:১৫ এএম, ২৫ মে ২০২৬ সোমবার
ছবি: সংগ্রহিত।
বাংলা সাহিত্য ও বাঙালির মননে এমন কিছু নাম আছে, যাদের উপস্থিতি কেবল সাহিত্যিক পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; তারা হয়ে ওঠেন একটি জাতির চেতনা, সংগ্রাম ও আত্মমর্যাদার প্রতীক। কাজী নজরুল ইসলাম তেমনই এক বিস্ময়কর নাম। তিনি শুধু কবি নন—তিনি একসঙ্গে দ্রোহ, প্রেম, সাম্য, মানবতা ও মুক্তির উচ্চারণ। তাঁর কবিতা যেমন অন্যায়ের বিরুদ্ধে বজ্রনিনাদ, তেমনি তাঁর গান মানুষের হৃদয়ে প্রেম ও সৌন্দর্যের গভীর আবেগ জাগিয়ে তোলে। বাংলা সাহিত্য ইতিহাসে নজরুল এমন এক বিরল প্রতিভা, যিনি একই সঙ্গে বিদ্রোহী ও মানবতাবাদী, বিপ্লবী ও প্রেমিক, ধর্মচেতনার মানুষ হয়েও অসাম্প্রদায়িকতার উজ্জ্বল প্রতীক।
১৮৯৯ সালের ২৫ মে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন নজরুল। তাঁর বাবা কাজী ফকির আহমদ ছিলেন স্থানীয় মসজিদের ইমাম ও খাদেম। দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেওয়া শিশুটির ডাকনাম ছিল ‘দুখু মিয়া’। নামের মতোই দুঃখ ছিল তাঁর শৈশবের নিত্যসঙ্গী। অল্প বয়সেই বাবাকে হারিয়ে সংসারের ভার কাঁধে তুলে নিতে হয়। কখনো মসজিদে মুয়াজ্জিনের কাজ করেছেন, কখনো লেটো দলে গান লিখেছেন ও অভিনয় করেছেন, কখনো রুটির দোকানে শ্রমিকের কাজ করেছেন। এই সংগ্রামী জীবনই তাঁকে খুব কাছ থেকে সাধারণ মানুষের কষ্ট, বঞ্চনা ও বৈষম্য দেখতে শিখিয়েছিল।
নজরুলের সাহিত্যজীবনের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হলো তাঁর আবির্ভাবের তীব্রতা। বাংলা কবিতায় তিনি যেন এক ঝড় হয়ে এসেছিলেন। তাঁর “বিদ্রোহী” কবিতা শুধু একটি সাহিত্যকর্ম নয়; এটি ছিল ঔপনিবেশিক শাসন, সামাজিক অবিচার ও মানসিক দাসত্বের বিরুদ্ধে এক বিস্ফোরিত ঘোষণা।
তিনি লিখেছিলেন—
“বল বীর—
আমি চির উন্নত শির!”
এই উচ্চারণ কেবল কবির ব্যক্তিগত আত্মবিশ্বাস ছিল না; এটি ছিল উপনিবেশিক শাসনে নিপীড়িত মানুষের আত্মমর্যাদার ভাষা। নজরুলের বিদ্রোহ ছিল কেবল রাজনৈতিক নয়; তিনি ধর্মীয় কুসংস্কার, সাম্প্রদায়িকতা, সামাজিক বৈষম্য ও মানবিক অবক্ষয়ের বিরুদ্ধেও কলম ধরেছিলেন।
নজরুলের রাজনৈতিক চেতনা তাঁর সাহিত্য থেকে আলাদা নয়। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের উত্তাল সময়ে তিনি সরাসরি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দিলেও পরে তিনি ঔপনিবেশিক শাসনের কঠোর সমালোচক হয়ে ওঠেন। তাঁর সম্পাদিত পত্রিকা ধূমকেতু ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদের ভাষা হয়ে উঠেছিল। “আনন্দময়ীর আগমনে” কবিতার জন্য তাঁকে কারারুদ্ধ করা হয়। কারাগারে বসেও তিনি আপস করেননি; বরং লিখেছিলেন ঐতিহাসিক “রাজবন্দীর জবানবন্দী”, যেখানে স্বাধীনতা ও মানবমুক্তির প্রশ্নে তাঁর অটল অবস্থান প্রকাশ পেয়েছে।
তবে নজরুলকে শুধু ‘বিদ্রোহী কবি’ বললে তাঁর পূর্ণ পরিচয় ধরা পড়ে না। তাঁর সাহিত্যজগৎ প্রেম, সৌন্দর্য ও মানবিক আবেগে সমানভাবে সমৃদ্ধ। তিনি যেমন বিদ্রোহের কবিতা লিখেছেন, তেমনি লিখেছেন অসংখ্য প্রেমের গান, গজল, শ্যামাসংগীত ও ভক্তিগীতি। বাংলা গানে তিনি এক অভূতপূর্ব বৈচিত্র্য এনেছিলেন। ইসলামী সংগীত থেকে কীর্তন, হামদ-নাত থেকে শ্যামাসংগীত—সব ধারাতেই তিনি অসাধারণ দক্ষতা দেখিয়েছেন। তাঁর সৃষ্ট “নজরুলগীতি” বাংলা সংগীতের এক স্বতন্ত্র ভুবন।
নজরুলের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তাঁর অসাম্প্রদায়িক চেতনা। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষের পরিচয় ধর্ম দিয়ে নয়—মানবতা দিয়ে। তাঁর লেখায় হিন্দু পুরাণ যেমন এসেছে, তেমনি এসেছে ইসলামের ইতিহাস ও ঐতিহ্য। তিনি লিখেছেন—
“মোরা এক বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু-মুসলমান।”
এই চেতনা তাঁকে আজও প্রাসঙ্গিক করে রেখেছে। যখন সমাজে বিভাজন, ঘৃণা ও ধর্মান্ধতা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে, তখন নজরুলের সাহিত্য নতুন করে পথ দেখায়।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধেও নজরুল ছিলেন এক অনুপ্রেরণার উৎস। তাঁর গান ও কবিতা মুক্তিযোদ্ধাদের সাহস জুগিয়েছে। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁকে সপরিবারে বাংলাদেশে নিয়ে আসেন এবং জাতীয় কবির মর্যাদা প্রদান করেন। এটি ছিল শুধু একজন কবিকে সম্মান জানানো নয়; বরং বাংলাদেশের রাষ্ট্রচেতনার সঙ্গে নজরুলের আদর্শকে যুক্ত করার এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ।
জীবনের শেষ দিকে দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে তিনি বাকশক্তি হারান। কিন্তু তাঁর নীরবতাও যেন তাঁর সৃষ্টির শক্তিকে ম্লান করতে পারেনি। ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট তিনি মৃত্যুবরণ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন তিনি—যেন তাঁরই কবিতার ভাষায়, “মসজিদেরই পাশে আমায় কবর দিও ভাই।”
আজকের পৃথিবীতে নজরুল আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। যখন মানুষ বিভক্ত হয় ধর্ম, জাতি ও মতাদর্শের নামে; যখন অন্যায় ও বৈষম্য নতুন রূপে ফিরে আসে; তখন নজরুল আমাদের সাহস জোগান প্রতিবাদ করতে, মানুষকে ভালোবাসতে এবং মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে।
তিনি ছিলেন না কেবল একটি সময়ের কবি। তিনি ছিলেন এবং আছেন—মানুষের মুক্তি, সাম্য ও ভালোবাসার চিরন্তন কণ্ঠস্বর।
