পাখিদের মৃত্যু, প্রকৃতির নিঃশব্দ বিদায়
ফিচার বিভাগ
উইমেননিউজ২৪
প্রকাশিত : ১২:৫৫ এএম, ৯ জুন ২০২৬ মঙ্গলবার
ছবি: সংগ্রহিত।
প্রতিদিন ভোরে জানালার পাশে বসে আমরা পাখির গান শুনি। আকাশে উড়ে যেতে দেখি ঝাঁকে ঝাঁকে শালিক, চড়ুই, বক কিংবা কাক। পৃথিবীতে পাখির সংখ্যা প্রায় ৫ হাজার কোটি বলে ধারণা বিজ্ঞানীদের। কিন্তু কখনও কি মনে প্রশ্ন জেগেছে—এত পাখি কোথায় গিয়ে মরে? কেন আমরা খুব কমই মৃত পাখি দেখতে পাই?
প্রশ্নটি যত সহজ, উত্তরটি ততটাই বিস্ময়কর।
প্রকৃতিবিদদের মতে, অধিকাংশ পাখি জীবনের শেষ সময়টুকু মানুষের চোখের আড়ালে কাটায়। অসুস্থতা, বার্ধক্য বা আঘাতে দুর্বল হয়ে পড়লে তারা সাধারণত গাছের ঘন ডালপালা, ঝোপঝাড়, বনভূমি কিংবা নির্জন স্থানে আশ্রয় নেয়। মানুষের মতো তাদেরও যেন এক ধরনের নিভৃত মৃত্যুচেতনা কাজ করে।
বাংলাদেশের বিশিষ্ট পক্ষীবিজ্ঞানী ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক এমেরিটাস ড. মনিরুল এইচ খান একাধিক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, অধিকাংশ বন্যপ্রাণী দুর্বল হয়ে পড়লে নিরাপদ ও আড়াল করা জায়গায় চলে যায়। ফলে তাদের মৃত্যুর ঘটনা মানুষের চোখে খুব কম ধরা পড়ে।
তবে এটিই একমাত্র কারণ নয়।
প্রকৃতিতে কোনো প্রাণীর মৃত্যু মানেই আরেক প্রাণীর জীবনের সুযোগ। একটি ছোট পাখি মারা গেলে খুব দ্রুত সেটি কাক, শকুন, বেজি, বনবিড়াল, সাপ কিংবা নানা ধরনের পোকামাকড়ের খাদ্যে পরিণত হয়। জীববিজ্ঞানীরা বলেন, প্রকৃতিতে মৃতদেহ অপসারণের জন্য একটি বিশাল ‘পরিচ্ছন্নতাকর্মী বাহিনী’ কাজ করে। শকুন, কাক, পিঁপড়া, বিটল এবং অগণিত অণুজীব মৃতদেহকে দ্রুত ভেঙে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও বন্যপ্রাণী গবেষকরা বলেন, একটি ছোট পাখির মৃতদেহ অনেক সময় ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই প্রায় সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে যেতে পারে। ফলে মানুষ সেটি দেখার সুযোগই পায় না।
আরেকটি কারণ হলো পাখিদের জীবন খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। অধিকাংশ পাখি বার্ধক্যে পৌঁছানোর আগেই শিকারির হাতে মারা যায়। বাজপাখি, ঈগল, সাপ, বন্য বিড়ালসহ অসংখ্য প্রাণী পাখি শিকার করে বেঁচে থাকে। অর্থাৎ অনেক পাখির মৃত্যুই আসলে অন্য প্রাণীর খাদ্যশৃঙ্খলের অংশ হয়ে যায়।
শহরাঞ্চলে অবশ্য মাঝেমধ্যে মৃত পাখি দেখা যায়। উঁচু কাচঘেরা ভবনে ধাক্কা লেগে, বিদ্যুতের তারে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে কিংবা যানবাহনের আঘাতে অনেক পাখির মৃত্যু হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বের বিভিন্ন শহরে কাচের ভবনের সঙ্গে সংঘর্ষ পাখি মৃত্যুর একটি বড় কারণ হয়ে উঠেছে।
প্রকৃতির এই চক্র আমাদের একটি গভীর সত্যের কথা মনে করিয়ে দেয়। আমরা যে পাখিদের প্রতিদিন আকাশে উড়তে দেখি, তাদের জীবনও ক্ষণস্থায়ী। তবে মৃত্যুর পরও তারা হারিয়ে যায় না। তাদের দেহ অন্য প্রাণীর খাদ্য হয়, মাটির পুষ্টি হয়, নতুন জীবনের উৎস হয়ে ওঠে।
তাই হয়তো আমরা মৃত পাখি খুব কম দেখি। কারণ প্রকৃতি কাউকে দীর্ঘদিন পড়ে থাকতে দেয় না। জীবনের মতো মৃত্যুকেও সে নিঃশব্দে নিজের বুকে ধারণ করে নেয়।
পাখিরা কোথায় মরে যায়—এই প্রশ্নের উত্তর শেষ পর্যন্ত আমাদের প্রকৃতির এক অনিবার্য সত্যের কাছেই নিয়ে যায়: এখানে কিছুই হারিয়ে যায় না, সবকিছুই অন্য কোনো জীবনের অংশ হয়ে ফিরে আসে।
