ঢাকা, শুক্রবার ১০, জুলাই ২০২৬ ১৭:২৬:১২ পিএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

বৃষ্টি নামলেই কেন মনে পড়ে খিচুড়ির কথা

অনলাইন ডেস্ক

উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ০১:৪৯ পিএম, ১০ জুলাই ২০২৬ শুক্রবার

ছবি: সংগ্রহিত।

ছবি: সংগ্রহিত।

আকাশজুড়ে কালো মেঘ, জানালার কাঁচে বৃষ্টির টুপটাপ শব্দ আর ভেজা মাটির সোঁদা গন্ধ—এমন আবহাওয়া তৈরি হলেই অনেকের মন প্রথমে যে খাবারের কথা মনে করে, সেটি হলো ধোঁয়া ওঠা গরম খিচুড়ি। সঙ্গে ডিমভাজা, ইলিশ, গরুর মাংস, বেগুনি কিংবা পাপড়—এই আয়োজন যেন বাঙালির বর্ষার চিরচেনা রূপ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বৃষ্টি হলেই কেন খিচুড়ির প্রতি এত টান তৈরি হয়?

খাদ্যবিশেষজ্ঞদের মতে, এর পেছনে যেমন রয়েছে ঐতিহ্য, তেমনি আছে মানুষের মানসিক অনুভূতি ও জীবনযাপনের ইতিহাস। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বর্ষাকালের সঙ্গে খিচুড়ির যে সম্পর্ক তৈরি হয়েছে, তা আজ বাঙালির খাদ্যসংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।

ইতিহাসের পাতায় খিচুড়ি

খিচুড়ির ইতিহাস কয়েকশ বছরের পুরোনো। উপমহাদেশে চাল ও ডাল একসঙ্গে রান্নার এই খাবারের প্রচলন বহু আগে থেকেই ছিল। ইতিহাসবিদদের মতে, মুঘল আমলেও বিভিন্ন ধরনের খিচুড়ি রাজকীয় খাবারের তালিকায় স্থান পেয়েছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি সাধারণ মানুষের ঘরেও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

লোকজ সংস্কৃতিতে খিচুড়ির একটি ভিন্ন ইতিহাসও রয়েছে। একসময় বাউল ও সাধকরা গ্রামে গ্রামে গান গেয়ে মানুষের কাছ থেকে চাল ও ডাল সংগ্রহ করতেন। পরে সেগুলো একসঙ্গে রান্না করে সহজেই পুষ্টিকর একটি খাবার তৈরি করতেন। অনেকের মতে, সেখান থেকেই খিচুড়ির জনপ্রিয়তা আরও ছড়িয়ে পড়ে।

বর্ষার সঙ্গে গড়ে ওঠা সম্পর্ক

গ্রামবাংলায় বর্ষাকালে চারপাশ পানিতে ডুবে যেত। বাজারে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ত, জ্বালানি কাঠও ভিজে থাকত। তখন ঘরে মজুত থাকা চাল, ডাল, আলু বা মৌসুমি সবজি দিয়েই দ্রুত রান্না করা হতো খিচুড়ি। কম উপকরণে, কম সময়ে এবং এক হাঁড়িতেই পরিবারের সবার জন্য খাবার প্রস্তুত করা সম্ভব হতো।

এই বাস্তব প্রয়োজনই ধীরে ধীরে এক সাংস্কৃতিক অভ্যাসে পরিণত হয়। আজও বর্ষা এলেই সেই পুরোনো রীতির ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে অসংখ্য পরিবার।

শুধু খাবার নয়, আবেগও

মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, মানুষের স্মৃতি ও স্বাদের মধ্যে গভীর সম্পর্ক রয়েছে। বৃষ্টির দিনে ছোটবেলার অসংখ্য স্মৃতি—মায়ের হাতে রান্না করা গরম খিচুড়ি, পরিবারের সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে খাওয়া কিংবা ছুটির দিনের অলস বিকেল—অবচেতন মনে ফিরে আসে। তাই বৃষ্টি দেখলেই অনেকের মনে খিচুড়ি খাওয়ার ইচ্ছা জেগে ওঠে।

পুষ্টিগুণেও এগিয়ে

পুষ্টিবিদদের মতে, চাল ও ডালের সমন্বয়ে তৈরি খিচুড়ি কার্বোহাইড্রেট, উদ্ভিজ্জ প্রোটিন, আঁশ এবং বিভিন্ন প্রয়োজনীয় খনিজ উপাদানের ভালো উৎস। এতে মৌসুমি সবজি, ডিম বা মাছ-মাংস যোগ করলে এর পুষ্টিমান আরও বেড়ে যায়। সহজপাচ্য হওয়ায় বর্ষার দিনে এটি অনেকের জন্য আরামদায়ক খাবার হিসেবেও বিবেচিত।

খিচুড়ির নানা রূপ

বাংলাদেশে অঞ্চলভেদে খিচুড়ির স্বাদ ও ধরনেও রয়েছে বৈচিত্র্য। কেউ পছন্দ করেন ঘি ও মুগ ডাল দিয়ে রান্না করা ভুনা খিচুড়ি, কেউ আবার পাতলা ঝোলযুক্ত খিচুড়ি। অনেক পরিবারে খিচুড়ির সঙ্গে পরিবেশন করা হয় ইলিশ ভাজা, গরুর মাংস, মুরগির রোস্ট, ডিমভাজা, বেগুনি, আলুভাজা, পাপড় কিংবা আচার।

বৃষ্টি আর খিচুড়ির সম্পর্ক তাই শুধু খাবারের নয়; এটি বাঙালির স্মৃতি, সংস্কৃতি, পারিবারিক বন্ধন ও আবেগেরও এক মধুর প্রতীক। জানালার ওপারে ঝরতে থাকা বৃষ্টির সঙ্গে ধোঁয়া ওঠা এক প্লেট খিচুড়ি যেন আজও বর্ষার সবচেয়ে প্রিয় স্বাদ।