রুনা লায়লার সংগীতসন্ধ্যা: কণ্ঠে সময়ের জাদু, গানে জীবনের গল্প
আইরীন নিয়াজী মান্না
উইমেননিউজ২৪
প্রকাশিত : ১০:৫২ পিএম, ২৪ জুলাই ২০২৬ শুক্রবার
ছবি: সংগ্রহিত।
কিছু কণ্ঠ কখনো বুড়িয়ে যায় না। সময়ের দীর্ঘ পথ পেরিয়েও তারা মানুষের হৃদয়ে একই রকম উজ্জ্বল থাকে। বাংলাদেশের সংগীতের আকাশে তেমনই এক নক্ষত্র রুনা লায়লা। তাঁর গান শুধু সুরের মূর্ছনা নয়, প্রজন্মের পর প্রজন্মের স্মৃতি, ভালোবাসা, বিচ্ছেদ, দেশপ্রেম আর জীবনের অসংখ্য অনুভূতির এক অবিনাশী দলিল।
আজ শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মিলনায়তনে ‘শিল্পী আমি তোমাদেরই গান শোনাব’ শিরোনামে আয়োজিত রুনা লায়লার সম্মাননা ও একক সংগীতসন্ধ্যা যেন ছিল সেই স্মৃতিরই এক উজ্জ্বল পুনর্মিলন। দীর্ঘ ৬২ বছর পর বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মঞ্চে গান গাইলেন কিংবদন্তি এই শিল্পী।
আলোচনা ও সম্মাননা প্রদান পর্বে শেষে ৭৪ বছরের কিশোরী শিল্পী রুনা লায়লা আলো নিভে যাওয়ার পর মঞ্চে যখন উপস্থিত হলেন, তখন করতালিতে মুখর হয়ে ওঠে পুরো মিলনায়তন। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই দর্শক-শ্রোতারা যেন ফিরে গেলেন কয়েক দশকের সংগীতযাত্রায়—যেখানে প্রতিটি গান একেকটি জীবনের গল্প।
দেশাত্মবোধ, প্রেম, বিরহ, লোকসংগীত, নজরুলসংগীত—এক সন্ধ্যায় যেন বাংলা গানের নানা রঙ তুলে ধরলেন এই কিংবদন্তি শিল্পী। শুরুতেই তিনি গাইলেন ‘দেশের জন্য যারা দিয়ে গেল প্রাণ’। গান শুরুর আগে তিনি বললেন, ১৯৭১ সালে যারা আমাদের এই স্বাধীন বাংলা দিয়েছেন, যারা প্রাণ দিয়েছেন এই দেশের জন্য, যাদের কারণে আমরা বাংলাদেশকে পেয়েছি এবং যারা ৫২’ সালে ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছেন, তাদের শ্রদ্ধা জানিয়ে আমি প্রথম গানটি শুরু করছি। গানের প্রতিটি পঙ্ক্তিতে ছিল দেশের প্রতি গভীর ভালোবাসা ও আত্মত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা।
এরপর একে একে পরিবেশন করেন ‘শিল্পী আমি তোমাদের গান শুনাবো’, ‘যখন থামবে কোলাহল’, ‘গানের খাতায় স্বরলিপি লিখে’, ‘যে জন প্রেমের সাধ জানে না’, ‘আমায় গেঁথে দাও না মাগো’, ‘বন্ধু, তিন দিন তোর বাড়িতে গেলাম’, নজরুলসংগীত ‘ভুলিতে পারিনি তাই’, ‘অনেক বৃষ্টি ঝরে তুমি এলে’, ‘সাধের লাউ বানাইল মোরে বৈরাগী’ এবং দর্শকদের উচ্ছ্বাসে শেষ করেন তাঁর জনপ্রিয় ‘ধামা ধাম মাস্ত কালান্দার’ গানটি।
প্রতিটি গান শেষ হওয়ার পর মিলনায়তনজুড়ে বেজে ওঠে দীর্ঘ করতালি। অনেক দর্শককে দেখা যায় শিল্পীর সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে গাইতে। কেউ মোবাইলে স্মৃতি ধরে রাখছেন, কেউ আবার নিঃশব্দে চোখ মুছছেন। এ যেন কেবল একটি সংগীতানুষ্ঠান নয়—বাংলাদেশের সংগীত ঐতিহ্যের সঙ্গে মানুষের হৃদয়ের এক গভীর সংযোগের সন্ধ্যা।
গানের ফাঁকে ফাঁকে নানা রকম গল্প, রসিকতা, আলাপ ও স্মৃতি স্মরণ করেন রুনা লায়লা। তার কণ্ঠে বয়সের ছাপ নয়, বরং অভিজ্ঞতার পরিণত দীপ্তিই ধরা পড়েছে। প্রতিটি গানে তাঁর কণ্ঠের নিয়ন্ত্রণ, উচ্চারণের স্বচ্ছতা এবং আবেগের গভীরতা দর্শকদের মুগ্ধ করে রাখে পুরো আয়োজনজুড়ে। কয়েক দশক ধরে কোটি মানুষের হৃদয় জয় করা এই শিল্পী আবারও প্রমাণ করলেন—সত্যিকারের শিল্পীর পরিচয় সময়ের কাছে হার মানে না।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বিশিষ্টজন, শিল্পী, লেখক, অভিনয়শিল্পী, সংগীতপ্রেমী এবং নানা বয়সের দর্শক। তাঁদের উপস্থিতি যেন রুনা লায়লার প্রতি জাতির ভালোবাসা ও শ্রদ্ধারই প্রতিফলন।
এক সন্ধ্যায় মাত্র এগারটি গান। কিন্তু সেই এগারটি গান যেন কয়েক দশকের স্মৃতি, ভালোবাসা, সংগ্রাম আর বাঙালির সংগীতঐতিহ্যকে এক সুতোয় গেঁথে দিল। অনুষ্ঠান শেষে দর্শকেরা যখন ধীরে ধীরে মিলনায়তন ছাড়ছিলেন, তখনও অনেকের ঠোঁটে ভাসছিল পরিচিত সেই সুর। মনে হচ্ছিল, মঞ্চের আলো নিভে গেছে, কিন্তু রুনা লায়লার কণ্ঠের আলো আরও অনেকক্ষণ রয়ে যাবে মানুষের হৃদয়ে।
সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রনালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী এমপি। বিশেষ অতিথি ছিলেন একই মন্ত্রনালয়ের প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম এমপি। অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করেন অভিনেতা আফজাল হোসেন এবং স্বাগত বক্তব্য রাখেন শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক শেখ রেজাউদ্দিন আহমাদ (রেজাউদ্দিন স্ট্যালিন)। সভাপতিত্ব করেন সংশ্লষ্টি মন্ত্রনালয়ের সচিব কানিজ মাওলা।
বন্যার্তদের সহায়তায় রুনা লায়লার এই একক কনসার্ট আয়োজন করা হয়।
