ঢাকা, শনিবার ০১, আগস্ট ২০২৬ ৪:২৭:৫৭ এএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

কাঠ, স্মৃতি ও সময়ের শিল্পী: নিপুর রঙে জীবনের গল্প

রাতুল মাঝি

উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ০৫:১৪ পিএম, ৩১ জুলাই ২০২৬ শুক্রবার

চিত্রশিল্পী নাহিদ নিয়াজী।

চিত্রশিল্পী নাহিদ নিয়াজী।

বাংলাদেশের সমকালীন চিত্রকলায় কিছু শিল্পী আছেন, যাঁরা প্রচলিত ক্যানভাসের বাইরে গিয়ে নিজস্ব ভাষা তৈরি করেছেন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম শিল্পী নাহিদ নিয়াজী। তিনি শুধু ছবি আঁকেন না, বরং পরিত্যক্ত কাঠ, পুরোনো দরজা, ভাঙা বাক্স, ক্ষয়ে যাওয়া বস্তু ও সময়ের চিহ্নকে শিল্পে রূপ দেন। তাঁর কাজের দিকে তাকালে মনে হয়, যেন পুরোনো দিনের স্মৃতি নতুন করে কথা বলতে শুরু করেছে।

১৯৭৫ সালে ঢাকায় জন্ম নেওয়া নাহিদ নিয়াজী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউট থেকে ড্রয়িং অ্যান্ড পেইন্টিং বিষয়ে এমএফএ সম্পন্ন করেন ১৯৯৮ সালে। শিক্ষাজীবন থেকেই তিনি প্রচলিত মাধ্যমের বাইরে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেন। ক্যানভাসের পরিবর্তে কাঠ, প্লাইউড ও বিভিন্ন পরিত্যক্ত উপকরণ ব্যবহার করে তিনি ধীরে ধীরে গড়ে তোলেন নিজের স্বতন্ত্র শিল্পভাষা।

নাহিদ নিয়াজীর শিল্পজীবনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো—তিনি সৌন্দর্য খুঁজে পান ক্ষয় ও পরিত্যক্ততার মধ্যে। পুরান ঢাকার শ্যামবাজার এলাকায় বসবাস শুরু করার পর সেখানকার পুরোনো স্থাপনা, কাঠের বাক্স, নদীতীরের ফেলে দেওয়া তক্তা ও শহরের স্মৃতিবাহী উপকরণ তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। তিনি এসব উপকরণের স্বাভাবিক রঙ, দাগ ও টেক্সচারকে শিল্পের অংশ হিসেবে ব্যবহার করেন। ফলে তাঁর কাজ একই সঙ্গে চিত্রকলা ও ভাস্কর্যের অনুভূতি তৈরি করে।

তাঁর শিল্পকর্মে সময়, স্মৃতি, নস্টালজিয়া ও পরিবর্তনের বিষয়গুলো বারবার ফিরে আসে। ‘Broken Door’ সিরিজে তিনি হারিয়ে যেতে বসা পুরোনো দরজার নকশাকে নতুনভাবে উপস্থাপন করেছেন। তাঁর ভাষায়, আধুনিক নগরায়ণের চাপে এসব দরজার অস্তিত্ব বিলীন হয়ে গেলেও শৈশবের স্মৃতিতে তারা এখনও বেঁচে আছে।

দেশ-বিদেশে একাধিক একক ও দলীয় প্রদর্শনীতে অংশ নিয়েছেন নাহিদ নিয়াজী। তাঁর ষষ্ঠ একক প্রদর্শনী ‘Manyfestation’ শিল্পমহলে বিশেষ প্রশংসিত হয়। এই প্রদর্শনীতে তিনি কাঠ, ক্যানভাস ও কার্টনের ওপর অ্যাক্রিলিক রঙে তৈরি ২৫টি শিল্পকর্ম উপস্থাপন করেন। সেখানে পুরোনো ও মরিচাধরা বস্তুকে নতুন জীবন দেওয়ার চেষ্টা ছিল স্পষ্ট।

পুরস্কার ও স্বীকৃতির ক্ষেত্রেও তিনি সফল। ২০০৮ সালে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির ১৬তম ইয়াং আর্টিস্টস আর্ট এক্সিবিশনে চিত্রকলা বিভাগে শ্রেষ্ঠ পুরস্কার অর্জন করেন। এছাড়া যুক্তরাজ্যের Royal Overseas League Travel Scholarship, Lucy Morrison Memorial Prize-সহ একাধিক সম্মাননা পেয়েছেন।

ব্যক্তিজীবনে চিত্রশিল্পী কাজী সাঈদ আহমেদ তার স্বামী। চারুকলায় পড়াশোনার সময় থেকেই দুজনের পরিচয়। পরবর্তীতে শিল্পচর্চায় তাঁরা একে অপরের অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠেন। তাঁদের শিল্পকর্মে পুরোনো উপকরণ, স্মৃতি ও সময়ের ছাপ বিশেষভাবে লক্ষ করা যায়।

বাংলাদেশের শিল্পাঙ্গনে নাহিদ নিয়াজী এমন একজন শিল্পী, যিনি প্রমাণ করেছেন—শিল্পের জন্য সব সময় নতুন উপকরণ প্রয়োজন হয় না। কখনও কখনও একটি পুরোনো কাঠের তক্তা, ভাঙা দরজা কিংবা পরিত্যক্ত বাক্সও হয়ে উঠতে পারে অসাধারণ শিল্পকর্মের ভিত্তি। তাঁর তুলির আঁচড়ে ক্ষয়িষ্ণু বস্তুগুলো যেন ফিরে পায় নতুন জীবন, আর দর্শক আবিষ্কার করেন সময়ের গভীরে লুকিয়ে থাকা সৌন্দর্য।