ঢাকা, মঙ্গলবার ১১, আগস্ট ২০২৬ ১৮:৩৩:৪৪ পিএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

হুমায়ূন আজাদ: প্রথাবিরোধী, সাহস ও সৃষ্টির অদম্য লেখক 

উইমেননিউজ২৪ ডেস্কঃ

উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ১০:৫০ এএম, ১১ আগস্ট ২০২৬ মঙ্গলবার

সংগৃহীত ছবি

সংগৃহীত ছবি

হুমায়ূন আজাদ ছিলেন একাধারে সৃজনশীল লেখক, ভাষাবিদ ও তীক্ষ্ণ সমালোচক, যিনি ভাষা ও চিন্তার স্বাধীনতাকে সাহিত্যের কেন্দ্রে স্থাপন করেন। তার উপন্যাস ও প্রবন্ধে ব্যক্তি-স্বাধীনতা, ধর্মীয় গোঁড়ামি, পিতৃতন্ত্র ও সামাজিক ভণ্ডামির বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান রয়েছে। 

কবি, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, ভাষাবিজ্ঞানী, গবেষক, সমালোচক ও অধ্যাপক—বহুমাত্রিক পরিচয়ে তিনি বাংলা সাহিত্য ও বুদ্ধিবৃত্তিক জগতে নিজের স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেছিলেন। তাঁর লেখায় ছিল যুক্তি, তীব্রতা, ব্যঙ্গ, প্রতিবাদ এবং প্রচলিত ধারণার বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলার সাহস। 

বাংলা সাহিত্যে কিছু মানুষ কেবল বই লেখেন না—তাঁরা সমাজের প্রচলিত চিন্তাকে প্রশ্ন করেন, অস্বস্তিকর সত্য সামনে আনেন এবং পাঠককে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেন। হুমায়ূন আজাদ ছিলেন তেমনই এক ব্যতিক্রমী লেখক। 


হুমায়ূন আজাদ জন্মগ্রহণ করেন ২৮ এপ্রিল ১৯৪৭ সালে মুন্সীগঞ্জের রাড়িখালে। তাঁর জন্মনাম ছিল হুমায়ূন কবির। রাড়িখালের স্যার জগদীশচন্দ্র বসু ইনস্টিটিউশন থেকে মাধ্যমিক এবং ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন এবং যুক্তরাজ্যের এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভাষাবিজ্ঞানে পিএইচডি অর্জন করেন। পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে অধ্যাপনা করেন। 
ভাষাবিজ্ঞান থেকে সাহিত্যের বিস্তৃত অঙ্গনে
হুমায়ূন আজাদের সাহিত্যিক পরিচয় যতটা শক্তিশালী, ভাষাবিজ্ঞানী হিসেবেও তাঁর অবদান ছিল গুরুত্বপূর্ণ। বাংলা ভাষার গঠন, বাক্যতত্ত্ব ও ভাষাবৈজ্ঞানিক নানা বিষয়ে তিনি গবেষণা করেছেন। তাঁর গবেষণাকর্ম তাঁকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যচর্চায় একটি স্বতন্ত্র মর্যাদা এনে দেয়। ভাষাবিজ্ঞানে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি ১৯৮৬ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন। পরে সামগ্রিক সাহিত্যকর্ম ও ভাষাবিজ্ঞানে অবদানের জন্য ২০১২ সালে মরণোত্তর একুশে পদক দেওয়া হয়। 
তবে কেবল ভাষাবিজ্ঞান তাঁর পরিচয়কে ধারণ করতে পারে না। কবিতা, উপন্যাস, গল্প, প্রবন্ধ, সমালোচনা, কিশোরসাহিত্য—প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাঁর বিচরণ ছিল। জীবদ্দশায় ও মৃত্যুর পর মিলিয়ে তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ৬০-এর বেশি; বিভিন্ন সূত্রে ৭০টিরও বেশি গ্রন্থের উল্লেখ পাওয়া যায়। 
যে লেখায় সমাজকে প্রশ্ন করেছিলেন
হুমায়ূন আজাদের লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল প্রশ্ন করার সাহস। ধর্মীয় মৌলবাদ, সামাজিক কুসংস্কার, নারীর অধিকার, পিতৃতান্ত্রিকতা, রাষ্ট্র ও রাজনীতি, ক্ষমতার কাঠামো—বিভিন্ন স্পর্শকাতর বিষয় তিনি তাঁর লেখায় এনেছেন।
তাঁর বহুল আলোচিত গ্রন্থ ‘নারী’ প্রকাশিত হয় ১৯৯২ সালে। নারীর সামাজিক অবস্থান, পুরুষতান্ত্রিক কাঠামো ও লিঙ্গবৈষম্য নিয়ে এই গ্রন্থ ব্যাপক বিতর্ক তৈরি করে। একইভাবে তাঁর উপন্যাস ‘ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল’, ‘সবকিছু ভেঙে পড়ে’, ‘নিজের সঙ্গে নিজের জীবনের মধু’ এবং ‘পাক সার জমিন সাদ বাদ’ বাংলা সাহিত্যে বিশেষ আলোচিত। 
কিশোরদের জন্যও তিনি লিখেছেন। ‘লাল নীল দীপাবলি’, ‘ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না’, ‘আব্বুকে মনে পড়ে’ প্রভৃতি রচনা তাঁর সৃষ্টিশীলতার আরেকটি দিক তুলে ধরে। 
কবিতায় আলাদা স্বর
হুমায়ূন আজাদের কবিতাতেও ছিল তাঁর নিজস্ব স্বর। ‘অলৌকিক ইস্টিমার’, ‘জ্বলো চিতাবাঘ’, ‘সবকিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে’, ‘যতোই গভীরে যাই মধু যতোই ওপরে যাই নীল’, **‘আমি বেঁচে ছিলাম অন্যদের সময়ে’**সহ একাধিক কাব্যগ্রন্থে তিনি ব্যক্তিমানুষের সংকট, সমাজ, রাজনীতি, প্রেম, অস্তিত্ব ও সময়কে ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখেছেন। 
২০০৪ সালের সেই ভয়াবহ হামলা
হুমায়ূন আজাদের জীবনের শেষ অধ্যায় ছিল অত্যন্ত বেদনাদায়ক। ২০০৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি, অমর একুশে বইমেলা থেকে ফেরার পথে বাংলা একাডেমির কাছে তিনি সন্ত্রাসী হামলার শিকার হন। তাঁকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে গুরুতরভাবে আঘাত করা হয়। পরে তিনি সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসা নেন এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য ব্যাংককে পাঠানো হয়। 
সেই হামলার পরও তিনি লেখালেখি ও গবেষণা থেকে সরে দাঁড়াননি। বরং চিকিৎসা শেষে আবার নিজের কাজের জগতে ফিরে আসেন। তাঁর ওপর হামলা মুক্তচিন্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে দেশে-বিদেশে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছিল।
জার্মানিতে শেষ অধ্যায়
২০০৪ সালের আগস্টে হাইনরিখ হাইনের ওপর গবেষণার জন্য বৃত্তি নিয়ে তিনি জার্মানিতে যান। সেখানে মিউনিখে অবস্থানকালে ১২ আগস্ট ২০০৪ তাঁকে তাঁর অ্যাপার্টমেন্টে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। সে সময় জার্মান পুলিশের উদ্ধৃত ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে হৃদ্‌যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মৃত্যুর কথা বলা হয়েছিল। তবে তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে মৃত্যুকে স্বাভাবিক বলে মেনে নেওয়া হয়নি এবং আগের হামলার সঙ্গে মৃত্যুর সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল। 
পরবর্তীতে বাংলাদেশে তাঁর ওপর হামলার মামলাটি হত্যামামলায় রূপ নেয়। ২০২২ সালে ঢাকার একটি আদালত চার জেএমবি সদস্যকে তাঁর হত্যার ঘটনায় মৃত্যুদণ্ড দেয়। ২০২৪ সালে মামলার একজন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামিকে গ্রেপ্তার করার খবরও প্রকাশিত হয়। 
হুমায়ূন আজাদ কেন আজও প্রাসঙ্গিক?
হুমায়ূন আজাদকে শুধু একজন সাহিত্যিক হিসেবে দেখলে তাঁর গুরুত্বের বড় একটি অংশ অদৃশ্য থেকে যায়। তিনি ছিলেন মুক্তচিন্তার পক্ষে এক শক্তিশালী বুদ্ধিবৃত্তিক কণ্ঠ। তাঁর লেখার সঙ্গে একমত হওয়া বা না-হওয়া আলাদা বিষয়; কিন্তু তিনি যে প্রশ্নগুলো তুলেছিলেন, সেগুলো বাংলা সমাজের চিন্তার পরিসরকে নাড়া দিয়েছিল।
তিনি মনে করতেন, সমাজকে এগিয়ে নিতে হলে ভয়কে অতিক্রম করে প্রশ্ন করতে হবে। তাই তাঁর লেখায় কখনো তীব্রতা এসেছে, কখনো ব্যঙ্গ, কখনো নির্মম বাস্তবতা। তাঁর ভাষা পাঠককে স্বস্তি দেওয়ার চেয়ে অনেক সময় অস্বস্তিতে ফেলেছে—আর সেই অস্বস্তিই ছিল তাঁর সাহিত্যিক শক্তির অন্যতম জায়গা।
আজকের সময়ে যখন মতপ্রকাশ, যুক্তি, বিজ্ঞানমনস্কতা, নারী-পুরুষের সমতা এবং সামাজিক অসহিষ্ণুতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা হচ্ছে, তখন হুমায়ূন আজাদের সাহিত্য ও চিন্তা আবারও পাঠের দাবি রাখে।
হুমায়ূন আজাদ চলে গেছেন দুই দশকেরও বেশি সময় আগে। কিন্তু তাঁর বই, তাঁর প্রশ্ন এবং তাঁর চিন্তার সঙ্গে আমাদের সমাজের কথোপকথন এখনো শেষ হয়নি। একজন লেখকের সবচেয়ে বড় সাফল্য সম্ভবত এখানেই—মৃত্যুর পরও তাঁর লেখা পাঠককে ভাবতে বাধ্য করে।
প্রথার কাছে মাথা নত না করে প্রশ্ন করার যে সাহস তিনি দেখিয়েছিলেন, সেটিই তাঁর সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার।
হুমায়ূন আজাদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।