মন খারাপ? একা ভ্রমণে যান, ভালো লাগবে
দীপালি হাসান
উইমেননিউজ২৪
প্রকাশিত : ১১:১৫ পিএম, ১৪ আগস্ট ২০২৬ শুক্রবার
প্রতীকী ছবি।
কখনো কখনো মনটা অকারণেই খারাপ হয়ে থাকে। চারপাশে মানুষ আছে, কথা বলার লোক আছে, কাজ আছে—তবু ভেতরে কেমন একটা শূন্যতা। কোনো কিছুই ভালো লাগে না। পরিচিত ঘর, পরিচিত মুখ, প্রতিদিনের একই ব্যস্ততা তখন আরও বেশি ক্লান্ত করে তোলে। মনে হয়, একটু দূরে কোথাও চলে যাই। যেখানে কেউ কিছু জিজ্ঞেস করবে না, কোনো দায়িত্বের তালিকা থাকবে না, থাকবে শুধু নিজের সঙ্গে নিজের কিছুটা সময়।
মন খারাপের এমন দিনে একা ভ্রমণে বেরিয়ে পড়া হতে পারে দারুণ একটি উপায়।
একা ভ্রমণ মানে একাকিত্ব নয়। বরং কখনো কখনো একা পথ চলাই নিজের সঙ্গে সবচেয়ে গভীরভাবে পরিচিত হওয়ার সুযোগ করে দেয়। প্রতিদিন অন্যদের প্রয়োজন, পছন্দ-অপছন্দ, সময় আর প্রত্যাশাকে গুরুত্ব দিতে দিতে আমরা নিজের কথাই ভুলে যাই। একা ভ্রমণ সেই ভুলে যাওয়া ‘আমি’-কে আবার খুঁজে পাওয়ার একটা সুন্দর সুযোগ।
নিজের জন্য একটু সময়
সকালে ঘুম থেকে উঠে কোথাও যাওয়ার তাড়া নেই। কারও পছন্দের জায়গায় যেতে হবে না, কারও জন্য অপেক্ষা করতে হবে না। ইচ্ছে হলে পাহাড় দেখবেন, ইচ্ছে হলে নদীর ধারে বসে থাকবেন। ভালো লাগলে কোনো ছোট্ট ক্যাফেতে বসে এক কাপ চা খাবেন। আর কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই রাস্তায় হাঁটবেন।
এই স্বাধীনতাটুকুই অনেক সময় মনকে হালকা করে দেয়।
একা ভ্রমণের সবচেয়ে বড় আনন্দ হলো—সিদ্ধান্তগুলো নিজের। কখন বের হবেন, কোথায় থামবেন, কী খাবেন, কতক্ষণ কোনো জায়গায় বসে থাকবেন—সবকিছুই আপনার ইচ্ছেমতো।
পরিচিত জীবন থেকে সামান্য বিরতি
একই ঘর, একই রাস্তা, একই কাজ, একই মানুষের ভিড়—সবকিছু মিলিয়ে জীবন কখনো কখনো খুব একঘেয়ে হয়ে যায়। অথচ নতুন কোনো জায়গায় পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে চোখের সামনে খুলে যায় অন্যরকম একটি পৃথিবী।
নতুন রাস্তা, নতুন মানুষ, নতুন খাবার, নতুন গন্ধ, নতুন দৃশ্য—মস্তিষ্কও যেন নতুন করে জেগে ওঠে।
ভ্রমণ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, পৃথিবীটা শুধু আমাদের প্রতিদিনের সমস্যাগুলোর সমান নয়। পৃথিবী অনেক বড়। আমাদের দুঃখ, হতাশা কিংবা ব্যর্থতার বাইরেও অসংখ্য সুন্দর দৃশ্য অপেক্ষা করে আছে।
একা বসে সূর্যাস্ত দেখার আনন্দ
ভাবুন তো, নদীর ধারে কিংবা সমুদ্রের পাড়ে বসে আছেন। সামনে ধীরে ধীরে সূর্য ডুবে যাচ্ছে। পাশে পরিচিত কেউ নেই। কারও সঙ্গে কথা বলার প্রয়োজনও নেই। শুধু বাতাস, পানির শব্দ আর আকাশের রং বদলে যাওয়ার দৃশ্য।
হয়তো প্রথম কয়েক মিনিট অস্বস্তি লাগবে। মনে হবে, পাশে কেউ থাকলে ভালো হতো। তারপর ধীরে ধীরে বুঝবেন—নীরবতারও নিজস্ব একটা ভাষা আছে।
কখনো কখনো নিজের ভেতরের কথাগুলো শোনার জন্যই এমন নীরবতা প্রয়োজন।
বই, গান আর একটি ছোট ব্যাগ
একা ভ্রমণের জন্য খুব বেশি আয়োজনের দরকার নেই। প্রয়োজনীয় পোশাক, কিছু ওষুধ, মোবাইল, চার্জার, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আর একটি প্রিয় বই—ব্যস।
সঙ্গে রাখতে পারেন প্রিয় গান। কোনো সুন্দর জায়গায় বসে হেডফোনে গান শুনতে শুনতে চারপাশ দেখতে পারেন। কিংবা বই খুলে বসতে পারেন গাছের নিচে, নদীর পাড়ে বা হোটেলের বারান্দায়।
শহরের ব্যস্ত জীবনে যে বইটি পড়ার সময় হয়ে ওঠেনি, সেটিই হয়তো ভ্রমণের সঙ্গী হয়ে উঠবে।
নিজের সঙ্গে নিজের আলাপ
একা ভ্রমণের আরেকটি বড় উপকার হলো নিজের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পাওয়া।
জীবনে কী চাই? কোন কাজটি সত্যিই ভালো লাগে? কোন সম্পর্ক আমাকে আনন্দ দেয়? কোন বিষয়গুলো অযথা আমাকে কষ্ট দিচ্ছে? ভবিষ্যতে কী করতে চাই?
এসব প্রশ্নের উত্তর সবসময় অন্য কারও কাছ থেকে পাওয়া যায় না। কখনো কখনো উত্তরটা নিজের ভেতরেই থাকে। শুধু একটু নিরিবিলি সময় দরকার।
ভ্রমণের পথে হাঁটতে হাঁটতে, জানালার পাশে বসে কিংবা কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে সেই উত্তরগুলো হঠাৎ করেই মনে আসতে পারে।
মন খারাপকে একটু দূরে রেখে আসুন
মন খারাপ হলেই সব সমস্যা থেকে পালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। ভ্রমণ কোনো জাদুর ওষুধও নয়। কিন্তু পরিবেশ বদলালে অনেক সময় চিন্তার ধরন বদলায়। যে সমস্যাটিকে ঘরের চার দেয়ালের মধ্যে অসম্ভব বড় মনে হচ্ছিল, দূর থেকে সেটিই হয়তো একটু ছোট বলে মনে হতে পারে।
আর সবচেয়ে বড় কথা, নিজের যত্ন নেওয়ার জন্য সবসময় বড় কোনো কারণের প্রয়োজন নেই।
আপনার মন খারাপ—এই কারণটিই যথেষ্ট।
কোথায় যাবেন?
একা ভ্রমণের জন্য খুব দূরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। ঢাকার কাছাকাছি কোনো শান্ত জায়গা, নদীর পাড়, সবুজে ঘেরা কোনো রিসোর্ট কিংবা ঐতিহাসিক কোনো স্থানও হতে পারে আপনার গন্তব্য।
আর সময় ও সুযোগ থাকলে যেতে পারেন পাহাড়ে, সমুদ্রের কাছে কিংবা কোনো নিরিবিলি গ্রামে। তবে প্রথমবার একা ভ্রমণে খুব দুর্গম বা অপরিচিত জায়গা বেছে না নেওয়াই ভালো।
ভ্রমণের আগে থাকার জায়গা, যাতায়াত, আবহাওয়া ও নিরাপত্তার বিষয়গুলো জেনে নেওয়া জরুরি। পরিবারের একজন বিশ্বস্ত মানুষকে নিজের গন্তব্য ও যোগাযোগের তথ্য জানিয়ে রাখুন।
ফিরে এসে দেখবেন...
হয়তো ফিরে এসে দেখবেন, পৃথিবী বদলায়নি। একই কাজ, একই শহর, একই ব্যস্ততা অপেক্ষা করছে। কিন্তু বদলে গেছে আপনার ভেতরের কিছু একটা।
আপনি হয়তো একটু শান্ত হয়েছেন। কোনো পুরোনো কষ্টকে নতুন চোখে দেখতে শিখেছেন। হয়তো বুঝেছেন, সব সমস্যার সমাধান আজই করতে হবে না। কিংবা আবিষ্কার করেছেন—নিজের সঙ্গেও বেশ ভালো থাকা যায়।
তাই মনটা যখন খুব খারাপ, সব দরজা বন্ধ মনে হয়, তখন একবার ব্যাগ গুছিয়ে বেরিয়ে পড়তে পারেন।
গন্তব্য খুব গুরুত্বপূর্ণ নয়।
গুরুত্বপূর্ণ হলো—কিছুটা পথ নিজের জন্য হাঁটা।
হয়তো কোনো এক অচেনা রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে হঠাৎ মনে হবে, এতদিন পর নিজের সঙ্গে দেখা হলো।
আর তখনই বুঝবেন—একা থাকা আর একা হয়ে যাওয়া এক কথা নয়।
