ঢাকা, রবিবার ১৬, আগস্ট ২০২৬ ১৭:২৪:২৫ পিএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

শিশুসাহিত্যে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম

উইমেননিউজ২৪ ডেস্কঃ

উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ১২:৩৬ পিএম, ১৬ আগস্ট ২০২৬ রবিবার

সংগৃহীত ছবি

সংগৃহীত ছবি

কাজী নজরুল ইসলাম শুধু বিদ্রোহের কবি নন, তিনি ছিলেন শিশুদেরও প্রিয় কবি। তার কবিতা, ছড়া, গান ও নাটিকায় শিশুদের হাসি, আনন্দ, কৌতূহল, কল্পনা ও দুরন্তপনার সুন্দর প্রকাশ ঘটেছে। তাই বাংলা শিশুসাহিত্যে নজরুলের অবদান অনন্য।

নজরুল নিজেই বলেছেন, ‘আমি চিরশিশু চির কিশোর।’ তার ভেতরে যেন সবসময় একটি চঞ্চল শিশুমন জেগে ছিল। আর সেই শিশুমনই তাকে শিশুদের খুব কাছাকাছি নিয়ে গিয়েছিল। শিশু কীভাবে ভাবে, কী দেখে আনন্দ পায়, কীভাবে কল্পনার জগৎ তৈরি করে—নজরুল তা খুব সহজেই বুঝতে পেরেছিলেন।

শিশুদের জন্য নজরুলের লেখা

ছোটবেলা থেকেই নজরুল শিশুদের জন্য লিখেছেন। রাণীগঞ্জের সিয়ারসোল রাজ হাইস্কুলে পড়ার সময় তিনি ‘চড়ুই পাখির ছানা’ নামে একটি কবিতা লেখেন। পরে শিশু-কিশোরদের জন্য প্রকাশিত হয় তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ ‘ঝিঙেফুল’ (১৯২৬) ও ‘পুতুলের বিয়ে’ (১৯৩২)।

পরবর্তী সময়ে তার শিশুতোষ রচনার বিভিন্ন সংকলন প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ‘সঞ্চয়ন’, ‘শেষ সওগাত’, ‘ঝড়’, ‘পিলে পটকা ও পুতুলের বিয়ে’ এবং ‘ঘুম জাগানো পাখী’। এসব বইয়ে ছড়া, কবিতা, গান ও নাটিকার মাধ্যমে শিশুদের জন্য তৈরি হয়েছে আনন্দময় এক সাহিত্যভুবন।

কল্পনার রাজ্যে নজরুল
শিশুরা স্বভাবতই কল্পনাপ্রবণ। একটি ছোট্ট কাঠবিড়ালি, পাখি, ফুল কিংবা একটি খেলনাও তাদের কাছে হয়ে উঠতে পারে গল্পের চরিত্র। রূপকথার রাজা-রানি, পক্ষীরাজ ঘোড়া, দৈত্য-দানো কিংবা অচেনা কোনো জগত—সবকিছুই শিশুর কল্পনায় সত্যি হয়ে ওঠে।

নজরুল এই শিশুমনের জাদুকরী শক্তিকে তাঁর লেখায় অসাধারণভাবে ব্যবহার করেছেন। তাঁর কবিতা পড়লে মনে হয়, আমরা যেন শিশুদের সেই কল্পনার রাজ্যেই ঢুকে পড়েছি।

‘খুকি ও কাঠবেড়ালি’
নজরুলের অন্যতম জনপ্রিয় শিশুতোষ কবিতা ‘খুকি ও কাঠবেড়ালি’। কুমিল্লায় বেড়াতে গিয়ে একটি শিশুকে কাঠবেড়ালির সঙ্গে কথা বলতে দেখে কবির মনে এই কবিতার ভাবনা আসে।

কবিতায় খুকি কাঠবেড়ালির কাছে পেয়ারা চায়। কাঠবেড়ালি নিজের মনে পেয়ারা খাচ্ছে, আর খুকি নানা আবদার করছে। শিশুর সরলতা, অভিমান ও আনন্দের সঙ্গে কাঠবেড়ালির চঞ্চলতা মিলিয়ে কবিতাটি হয়ে উঠেছে প্রাণবন্ত ও মজার।

‘লিচু চোর’-এর দুরন্ত আনন্দ
শিশুদের কাছে নজরুলের আরেকটি অত্যন্ত জনপ্রিয় কবিতা ‘লিচু চোর’। কবিতাটিতে রয়েছে দুষ্টুমি, ভয়, দৌড়ঝাঁপ আর হাস্যরস। ছন্দের দোলায় কবিতাটি পড়তে গেলে মনে হয়, চোখের সামনে কোনো দুরন্ত শিশু লিচু চুরি করে পালাচ্ছে!

কবিতাটির একটি অংশ বাংলা ভাষাভাষী মানুষের মুখে মুখে ফিরেছে—
‘পড়বি পড় মালীর ঘাড়েই,
যে ছিল গাছের আড়েই।’

এ ধরনের প্রাণবন্ত ছন্দ ও মজার ঘটনা শিশুদের সহজেই আকৃষ্ট করে।

‘প্রভাতী’তে নতুন দিনের ডাক
নজরুলের ‘প্রভাতী’ শিশুদের ঘুম ভাঙানোর মতো একটি আনন্দময় কবিতা। ভোরের আলো, ফুল-পাখি আর নতুন দিনের সৌন্দর্যের মধ্য দিয়ে কবি শিশুদের ঘুম ও অলসতা কাটিয়ে জেগে উঠতে আহ্বান জানিয়েছেন—

‘ভোর হলো,
দোর খোল,
খুকুমণি ওঠো রে!’

কবিতাটি শুধু ঘুম থেকে ওঠার কথা বলে না; এর মধ্যে রয়েছে নতুন দিনের প্রতি ভালোবাসা, কর্মচাঞ্চল্য ও সুন্দরভাবে জীবন শুরু করার শিক্ষা।

দেশপ্রেম ও মানবতার শিক্ষা
নজরুলের শিশুসাহিত্য শুধু আনন্দ দেওয়ার জন্য নয়। তাঁর লেখায় রয়েছে দেশপ্রেম, মানবতা, সাম্য ও অসাম্প্রদায়িকতার শিক্ষা।

তিনি শিশুদের এমন একটি সমাজের স্বপ্ন দেখিয়েছেন, যেখানে মানুষে মানুষে কোনো ভেদাভেদ থাকবে না। হিন্দু-মুসলমান সবাই মিলেমিশে থাকবে। তাঁর বিখ্যাত পঙ্ক্তি—

‘মোরা এক বৃন্তে দুটি কুসুম—হিন্দু-মুসলমান।’
এই ছোট্ট কথার মধ্যেই রয়েছে সম্প্রীতির বড় শিক্ষা।
দেশের প্রতিও নজরুলের ছিল গভীর ভালোবাসা। তিনি লিখেছেন—

‘নমঃ নমঃ নমো বাঙলা দেশ মম,
চির মনোরম চির মধুর।’

শিশুদের মনে দেশপ্রেম জাগিয়ে তুলতে এমন কবিতার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

কেন আজও শিশুদের প্রিয় নজরুল?
নজরুলের শিশুসাহিত্যের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর সহজ ভাষা, প্রাণবন্ত ছন্দ, মজার চরিত্র ও কল্পনার বিস্ময়। তাঁর কবিতায় শিশু কখনো কাঠবেড়ালির সঙ্গে বন্ধুত্ব করে, কখনো লিচু চুরি করতে গিয়ে বিপদে পড়ে, আবার কখনো ভোরের পাখির ডাকে ঘুম থেকে উঠে নতুন দিনের স্বপ্ন দেখে।
তবে হাসি-আনন্দের আড়ালে নজরুল শিশুদের একটি সুন্দর জীবনদর্শনও দিয়েছেন। তিনি শিখিয়েছেন—মানুষকে ভালোবাসতে হবে, দেশকে ভালোবাসতে হবে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে এবং ধর্ম-বর্ণের ভেদাভেদ ভুলে সবাইকে আপন করে নিতে হবে।

শিশুদের কল্পনার জগৎকে আনন্দময় করে তোলার পাশাপাশি তাদের হৃদয়ে মানবতা ও দেশপ্রেমের বীজ বুনে দেওয়াই নজরুলের শিশুসাহিত্যের বড় সাফল্য।

তাই নজরুল শুধু বিদ্রোহের কবি নন, তিনি শিশুমনেরও কবি। তাঁর সৃষ্টির পাতায় পাতায় আজও খেলা করে দুরন্ত খুকু, চঞ্চল কাঠবেড়ালি, লিচু চোর আর নতুন দিনের ডাক। প্রজন্মের পর প্রজন্মের শিশুর কাছে এ কারণেই নজরুলের সাহিত্য হয়ে থাকবে আনন্দ, কল্পনা ও আলোর এক চিরন্তন ঠিকানা।