ঢাকা, বুধবার ২৬, আগস্ট ২০২৬ ১৪:১২:২৪ পিএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

ডলি পার্টন আর নেই, থামল ‘কান্ট্রি কুইনের’ গান

বিনোদন ডেস্ক

উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ১১:০০ এএম, ২৬ আগস্ট ২০২৬ বুধবার

সংগৃহীত ছবি

সংগৃহীত ছবি

খুবই সাধারণ জীবন থেকে উঠে এসে আমেরিকান সংগীতের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছানো ডলি পার্টন মারা গেছেন, যাকে বলা হয় মার্কিন কান্ট্রি সংগীতের রানি। ৮০ বছর বয়সে ক্যানসারের সঙ্গে লড়াইয়ের পর ন্যাশভিলে মারা যান গায়িকা ও সমাজসেবী এই সংগীত তারকা।

পরিবারের তরফে এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, ৮০ বছর বয়সে মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশভিলে চিরবিদায় নেন গায়িকা, সমাজসেবী ডলি পার্টন। পরিবারের ঘনিষ্ঠ সদস্যদের নিয়ে ছোট পরিসরে তার শেষকৃত্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে।

পার্টনের মুখপাত্র মার্সেল পারিসো জানান, ক্যানসারের সঙ্গে লড়াইয়ের পর মারা গেছেন এই সংগীত তারকা।

সিএনএন লিখেছে, গত দুই বছর ধরে নিজের বিভিন্ন শারীরিক সমস্যার কথা খোলামেলাভাবেই বলছিলেন ডলি পার্টন। বিশেষ করে ২০২৫ সালের মার্চে স্বামী কার্ল ডিনের মৃত্যুর পর তিনি বেশ ভেঙে পড়েন।

চলতি বছরের শুরুতে ভক্তদের উদ্দেশ্যে এক ভিডিও বার্তায় তিনি বলেছিলেন, “আমার স্বামী কার্ল দীর্ঘ সময় ধরে খুব অসুস্থ ছিল। আর সে যখন চলে গেল, আমি নিজের ঠিকমতো যত্ন নিইনি। এমন অনেক কিছু আমি অবহেলা করেছি, যেগুলোর দিকে আমার খেয়াল রাখা উচিত ছিল।”

আমেরিকান সংগীতের ‘অমূল্য রত্ন’

অর্ধশতকের বেশি সময় ধরে ডলি পার্টন আমেরিকানদের জীবনের প্রেম, বিচ্ছেদ ও সংগ্রামের গল্প গানে গানে তুলে ধরেছেন। নিজের ক্যারিয়ারে তিন হাজারের বেশি গান লিখেছেন।

এর মধ্যে রয়েছে মায়ের উদ্দেশ্যে লেখা ‘কোট অব মেনি কালারস’, এবং প্রেম ও বিরহের গান ‘জোলিন’ ও ‘আই উইল অলওয়েজ লাভ ইউ’-এর মতো মাস্টারপিস।

এছাড়া ‘নাইন টু ফাইভ’ গানটি আমেরিকান নারী ও শ্রমিকদের এক অলিখিত জাতীয় সংগীতে পরিণত হয়েছিল।

সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়, ক্যারিয়ারে ৪৯টি অ্যালবাম প্রকাশ করেছেন ডলি পার্টন, জিতেছেন ১১টি গ্র্যামি পুরস্কার। কেনি রজার্সের সঙ্গে তার গাওয়া ‘আইল্যান্ডস ইন দ্য স্ট্রিম’ গানটি পপ চার্টেও বড় সাফল্য পেয়েছিল।

তবে পার্টন সবার আগে নিজেকে একজন গীতিকার হিসেবেই ভাবতেন। নব্বইয়ের দশকে হুইটনি হিউস্টনের গাওয়া তার বিখ্যাত গান ‘আই উইল অলওয়েজ লাভ ইউ’ সৃষ্টির পেছনের গল্পটি বেশ চমকপ্রদ।

ওই গানটি মূলত তার পারফর্মিং পার্টনার পোর্টার ওয়াগনারের উদ্দেশ্যে লেখা হয়েছিল। ওয়াগনারের টেলিভিশন অনুষ্ঠানের সঙ্গে দীর্ঘদিন যুক্ত থাকার পর একসময় একক ক্যারিয়ার গড়ার সিদ্ধান্ত নেন পার্টন।

ওয়াগনার তার কথা শুনতে চাইছিলেন না বলে পার্টন বাড়ি ফিরে গানটি লেখেন। পরদিন গানটি তাকে শুনিয়ে নিজের সিদ্ধান্ত জানান।

পার্টনের বর্ণনা অনুযায়ী, গানটি শুনে ওয়াগনার কেঁদে ফেলেন এবং শেষ পর্যন্ত তার একক ক্যারিয়ারে যাওয়ার সিদ্ধান্ত মেনে নেন।

এই একটি গানই আমেরিকান সংগীতের ইতিহাসে পার্টনকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়।

চরম দারিদ্র্য থেকে সংগীতের শীর্ষে

১৯৪৬ সালের ১৯ জানুয়ারি টেনেসির একটি এক কামরার ঘরে ডলি পার্টনের জন্ম। ১২ ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন চতুর্থ।

পার্টনের ভাষায়, তাদের পরিবার ছিল ‘চরম দরিদ্র’। তার বাবা পড়তে জানতেন না। তবে মায়ের দিক থেকে পরিবারে সবসময়ই সংগীতের চর্চা ছিল। তার নানার বাবা ছিলেন একজন ধর্মযাজক, যিনি পিয়ানো ও গিটার বাজাতেন। স্থানীয় বিভিন্ন অনুষ্ঠান, বিয়ে ও অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় গান গাইত তার পরিবার।

শৈশবে এক চাচার কাছ থেকে প্রথম গিটার পান পার্টন। মাত্র সাত বছর বয়সে গিটার বাজানো শেখেন এবং নিজের গান লেখা শুরু করেন।

হাই স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে সংগীতকে পেশা হিসেবে নিতে ন্যাশভিলে পাড়ি জমান ডলি পার্টন। প্রথম দিনই একটি লন্ড্রোম্যাটের বাইরে কার্ল টমাস ডিনের সঙ্গে তার প্রথম দেখা হয়। পরের বছর তারা বিয়ে করেন।

১৯৬৫ সালে মনুমেন্ট রেকর্ডসের সঙ্গে প্রথম চুক্তি স্বাক্ষর করেন ডলি পার্টন। ১৯৬৭ সালে দ্য পোর্টার ওয়াগনার শোর মাধ্যমে তিনি ঘরে ঘরে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। ১৯৭১ সালে ‘জশুয়া’ গানের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো চার্টের শীর্ষস্থান দখল করেন।

ব্যবসায়িক দূরদর্শিতা, পর্দার ঝলকানি

সিএনএন লিখেছে, গানের স্বত্ব ধরে রাখার ব্যাপারে পার্টনের দূরদর্শিতা ছিল অনন্য।

১৯৭৪ সালে কিংবদন্তি গায়ক এলভিস প্রিসলি যখন তার ‘আই উইল অলওয়েজ লাভ ইউ’ গানটি গাইতে চান, তখন প্রিসলির ম্যানেজার গানের প্রকাশনা স্বত্বের অর্ধেক দাবি করেন।

পার্টন সেই প্রস্তাব সরাসরি ফিরিয়ে দেন। তিনি বলেছিলেন, “এটি আমি আমার পরিবারের জন্য রেখে যাচ্ছি।”

পরে ১৯৯২ সালের ‘দ্য বডিগার্ড’ সিনেমায় হুইটনি হিউস্টন গানটি গাইলে পার্টন রয়্যালটি বাবদ প্রায় ১ কোটি মার্কিন ডলার আয় করেন।

দক্ষিণাঞ্চলীয় টান, রসবোধ ও আকর্ষণীয় উপস্থিতির কারণে ক্যামেরার সামনেও দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন পার্টন।

১৯৮০ সালে জেন ফন্ডা ও লিলি টমলিনের সঙ্গে ‘নাইন টু ফাইভ’ সিনেমার মাধ্যমে চলচ্চিত্রে পা রাখেন ডলি পার্টন। সিনেমায় তারা তিনজনই এক অফিসের কর্মী হিসেবে অভিনয় করেন, যারা তাদের কর্তৃত্বপরায়ণ বসের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়ার পরিকল্পনা করে।

সিনেমার প্রযোজক ফন্ডা ও পার্টনকে নেওয়ার সিদ্ধান্তের কথা স্মরণ করে বলেছিলেন, রেডিওতে পার্টনের ‘টু ডোরস ডন’ গানটি শোনার পর তার মনে হয়েছিল, তিনজনকে একসঙ্গে পর্দায় দারুণ মানাবে।

পার্টন শর্ত দিয়েছিলেন, অভিনয়ের পাশাপাশি তিনি সিনেমার থিম সং লিখবেন ও গাইবেন। তার লেখা ‘নাইন টু ফাইভ’ গানটি পরে নারীর অধিকার ও কর্মক্ষেত্রে সমতার আন্দোলনের প্রতীক হয়ে ওঠে।

এরপর ‘দ্য বেস্ট লিটল হোরহাউস ইন টেক্সাস’ (১৯৮২) এবং ‘স্টিল ম্যাগনোলিয়াস’ (১৯৮৯)-এর মতো ব্যবসাসফল সিনেমায় অভিনয় করেন ডলি পার্টন।

২০০৫ সালের ‘ট্রান্সআমেরিকা’ সিনেমার ‘ট্রাভেলিন থ্রু’ গানের জন্য তিনি দ্বিতীয়বারের মতো অস্কার মনোনয়ন পান।

সিনেমাটি ছিল ট্রান্সজেন্ডার এক নারীর পারিবারিক সম্পর্ক পুনর্গঠনের গল্প নিয়ে। ডলি পার্টন সবসময়ই মানবাধিকার ও এলজিবিটিকিউ+ সম্প্রদায়ের প্রতি সমর্থন জানিয়ে গেছেন।

২০১৬ সালে ল্যারি কিংকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে পার্টন বলেছিলেন, মানুষকে গ্রহণ করা এবং ভালোবাসার পক্ষেই তিনি সবসময় কথা বলেন।

রাজনীতির ক্ষেত্রে অবশ্য তিনি নিজের অবস্থান নিয়ে প্রকাশ্যে খুব বেশি কথা বলতেন না। নির্দিষ্ট কোনো প্রেসিডেন্ট বা রাজনীতিবিদকে সমর্থন বা বিরোধিতা করার অবস্থানও তিনি সাধারণত প্রকাশ করেননি।

সংগীতের বাইরে মানবিকতার উত্তরাধিকার

জীবনের শেষ ভাগে এসে পার্টন তার বিপুল সাফল্যকে জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যবহার করেন। তার প্রতিষ্ঠিত ‘ইমাজিনেশন লাইব্রেরি’ সারা বিশ্বের শিশুদের মাঝে ৩০ কোটির বেশি বই বিনামূল্যে বিতরণ করে। পড়াশোনা না জানা বাবার সম্মানেই তিনি এই উদ্যোগ নিয়েছিলেন।

১৯৮৬ সালে টেনেসির পিজন ফোর্জে একটি থিম পার্ক কিনে সেটির নাম দেন ডলিউড। পরে সেটি ওই অঞ্চলের অন্যতম বড় কর্মসংস্থানের উৎসে পরিণত হয়, যা বছরে প্রায় ১৮০ কোটি ডলার আয় করে।

ডলিউড খোলার দুই বছর পর ডলিউড ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেন পার্টন। শুরুতে টেনেসির নিজ এলাকায় স্কুল থেকে ঝরে পড়ার হার কমানোর উদ্যোগ নেয় প্রতিষ্ঠানটি। পরে উচ্চমাধ্যমিক শেষ করা শিক্ষার্থীদের প্রত্যেককে ৫০০ ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন পার্টন।

সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে কোভিড-১৯ মহামারীর সময় মডার্নার টিকা তৈরিতে তিনি ভ্যান্ডারবিল্ট ইউনিভার্সিটিতে ১০ লাখ ডলার অনুদান দিয়েছিলেন।

বই লেখার ক্ষেত্রেও সাফল্য পেয়েছেন ডলি পার্টন। ‘ডলি: মাইল লাইফ অ্যান্ড আদার আনফিনিশড বিজনেস’, ‘বাহাইন্ড দা সিমস: মাই লাইফ ইন রাইনস্টোনস’ এবং ‘স্টার অব দ্য শো: মাই লাইফ অন স্টেজ’ তার স্মৃতিকথা।

জেমস প্যাটারসনের সঙ্গে যৌথভাবে ‘রান রোজ রান’ নামে একটি উপন্যাসও লিখেছেন পার্টন। শিশুদের জন্যও লিখেছেন বেশ কয়েকটি বই।

১৯৯৯ সালে কান্ট্রি মিউজিক হল অব ফেমে যুক্ত হয় পার্টনের নাম। ২০১১ সালে পান রেকর্ডিং একাডেমির লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড।

‘আই উইল অলওয়েজ লাভ ইউ’

খ্যাতির চূড়ায় থাকলেও ব্যক্তিগত জীবনকে সবসময়ই আড়ালে রেখেছিলেন ডলি পার্টন। প্রায় ছয় দশকের দাম্পত্য জীবনে তার স্বামী কার্ল ডিন কখনোই পাদপ্রদীপের আলোয় আসতে চাননি।

২০২৪ সালে পার্টন বলেছিলেন, দুজনের আলাদা জগৎ ও কাজ থাকাটাই তাদের সম্পর্ককে প্রাণবন্ত রেখেছিল।

ডিন তার স্ত্রীর ক্যারিয়ারের নীরব সমর্থন যুগিয়ে গেছেন। ২০২০ সালে এনটারটেইনমেন্ট টুনাইটকে পার্টন বলেছিলেন, স্বামী তাকে নিয়ে গর্বিত ছিলেন এবং তার সাফল্যে ঈর্ষান্বিত ছিলেন না।

ডলি পার্টনের অন্যতম জনপ্রিয় গান ‘জোলিন’-এর পেছনেও ছিলেন ডিন। এক ব্যাংককর্মী তার স্বামীর প্রতি অতিরিক্ত আগ্রহ দেখানোর পর মজা করেই গানটি লিখেছিলেন বলে একসময় জানিয়েছিলেন পার্টন।

কার্ল ডিন ২০২৫ সালের মার্চে ৮২ বছর বয়সে মারা যান। ৫৯ বছরের দাম্পত্যসঙ্গীর মৃত্যু পার্টনের জন্য ছিল গভীর আঘাত। তার স্মৃতিতে ‘ইফ ইউ হ্যাডনট বিন দেয়ার’ গানটি প্রকাশ করেন তিনি।

গানটির কথায় তিনি লিখেছিলেন, “তুমি যদি না থাকতে, আমি আজ কোথায় থাকতাম? তোমার বিশ্বাস, ভালোবাসা আর আস্থা ছাড়া।”