ঢাকা, বুধবার ০২, সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১৪:৫৪:৫৮ পিএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

দ্রুতগতির ডিজিটাল পৃথিবীতে হারিয়ে গেছে চিঠি

ট্রেশো জফি

উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ১২:৩৫ পিএম, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ বুধবার

প্রতীকী ছবি।

প্রতীকী ছবি।

কাল ছিলো বিশ্ব চিঠি দিবস । আজকাল আর কেউ কলম-কাগজ হাতে নিয়ে চিঠি লেখে না। দ্রুতগতির ডিজিটাল পৃথিবীতে হারিয়ে গেছে চিঠি। বদলে গেছে মানুষের চিঠির ভাষাও। মেসেজ, ইমেল, ভয়েজমেল বদলে দিয়েছে সাধারণ মানুষের অভ্যাসও।

অথচ একটা সময় ছিল, ডাকপিয়নের সাইকেলের ঘণ্টা শুনলেই বুকের ভেতর কেমন যেন কেঁপে উঠত। দূর থেকে দেখা যেত পরিচিত খাকি পোশাক। হাতে কয়েকটি খাম। তার মধ্যে একটি খামে হয়তো লেখা আছে নিজের নাম। সেই খাম হাতে পাওয়ার মুহূর্তে যে আনন্দ, যে উৎকণ্ঠা, যে কৌতূহল—তা আজকের এক সেকেন্ডে পৌঁছে যাওয়া মুঠোফোনের বার্তায় কোথায়!

একটি চিঠির জন্য মানুষ দিনের পর দিন অপেক্ষা করত। কখনো সপ্তাহ, কখনো মাস। অপেক্ষাটা তখন বিরক্তিকর ছিল না; বরং অপেক্ষার মধ্যেই ছিল ভালোবাসার অন্যরকম এক মায়া।

আজ বিশ্ব চিঠি দিবস। দ্রুতগতির ডিজিটাল পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে দিনটি যেন আমাদের একটু থামিয়ে দিয়ে মনে করিয়ে দেয়—একসময় মানুষের মনের কথা পৌঁছানোর সবচেয়ে সুন্দর মাধ্যম ছিল একটি কাগজের টুকরো।

চিঠি শুধু কাগজে লেখা কিছু শব্দ নয়। চিঠি ছিল মানুষের অনুভূতির স্পর্শ।

একটি খাম, হাজার অনুভূতি

চিঠি লেখারও ছিল নিজস্ব আয়োজন। টেবিলে কাগজ রাখা, প্রিয় কলমটি হাতে নেওয়া, কিছুক্ষণ চুপ করে বসে ভাবা—কী দিয়ে শুরু করব?

তারপর ধীরে ধীরে অক্ষর ফুটে উঠত কাগজে।

কোনো শব্দ ভুল হলে কেটে আবার লেখা হতো। কোনো বাক্য খুব বেশি আবেগী হয়ে গেলে হয়তো থেমে যেতে হতো কিছুক্ষণ। কখনো চিঠি লিখতে লিখতে চোখ ভিজে উঠত। কখনো আনন্দে মুখে হাসি ফুটত।

চিঠির সৌন্দর্য এখানেই—এটি লেখা হতো সময় নিয়ে, ভাবনা নিয়ে, অনুভূতি নিয়ে।

আজ আমরা লিখি ‘কেমন আছ?’ তারপর অপেক্ষা করি কয়েক সেকেন্ড। উত্তর না এলে আবার লিখি, ‘কোথায়?’

সেই তুলনায় চিঠির পৃথিবী ছিল সম্পূর্ণ অন্যরকম।

একটি ‘কেমন আছো’ পৌঁছাত কয়েক দিন পর। আর সেই কয়েক দিন ধরে প্রাপক অপেক্ষা করত সেই প্রশ্নটির জন্য।

মায়ের চিঠি

মায়ের চিঠির সঙ্গে পৃথিবীর আর কোনো কিছুর তুলনা চলে না।

দূরে থাকা সন্তানকে লেখা মায়ের চিঠি হয়তো শুরু হতো—‘বাবা, আশা করি ভালো আছিস।’

এরপর একে একে চলে আসত বাড়ির খবর।

কে অসুস্থ, কার বিয়ে হলো, উঠানে কোন গাছে ফুল ফুটেছে, বাড়ির বিড়ালটি কী করছে—কত তুচ্ছ তুচ্ছ বিষয়! অথচ সেই তুচ্ছ বিষয়গুলোর মধ্যেই লুকিয়ে থাকত মায়ের ভালোবাসা।

শেষে হয়তো লেখা থাকত—

‘সময়মতো খাওয়া-দাওয়া করিস। নিজের শরীরের যত্ন নিস।’

একই কথা মা ফোনেও বলতে পারেন। কিন্তু মায়ের হাতের লেখা কয়েকটি লাইনের যে মায়া, তা কি কোনো ফোনকল দিতে পারে?

আজও পুরোনো বাক্স খুলে মায়ের হাতের লেখা একটি চিঠি পাওয়া গেলে বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেমন খালি হয়ে যায়।

মনে হয়—মানুষটি নেই, কিন্তু তার হাতের লেখা এখনো আছে।

প্রেমপত্রের দিনগুলো

প্রেমের সঙ্গে চিঠির সম্পর্ক যেন আরও গভীর।

একসময় প্রেমিক-প্রেমিকার সম্পর্কের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ ছিল চিঠি। একটি চিঠি পাওয়ার জন্য কত অপেক্ষা, কত উৎকণ্ঠা!

চিঠি হাতে পাওয়ার পর সেটি একবার পড়েই শেষ নয়। বারবার পড়া হতো। একা ঘরে, বালিশের নিচে লুকিয়ে, কখনো রাতের অন্ধকারে।

একটি বাক্য বারবার পড়া হতো।

একটি শব্দের অর্থ নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভাবা হতো।

চিঠি লেখা মানুষটির হাতের লেখা দেখে তার মনের অবস্থাও বোঝার চেষ্টা করা হতো।

অক্ষরগুলো কি আজ একটু বেশি এলোমেলো?

তাহলে কি মন খারাপ?

কালির চাপ কি বেশি?

তাহলে কি রাগ?

এই ছোট ছোট অনুভূতিগুলোই ছিল চিঠির জাদু।

চিঠি শুধু ভালোবাসার নয়, ইতিহাসেরও

চিঠি শুধু ব্যক্তিগত সম্পর্কের গল্প বলে না। একটি সময়ের ইতিহাসও ধরে রাখে চিঠি।

যুদ্ধের ময়দান থেকে লেখা সৈনিকের চিঠি, কারাগার থেকে লেখা রাজনৈতিক বন্দির চিঠি, বিদেশে থাকা মানুষের স্বদেশে লেখা চিঠি, প্রবাসীর পরিবারের কাছে লেখা চিঠি—সবই একেকটি সময়ের দলিল।

ইতিহাসের বহু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা আমরা চিঠির মাধ্যমে জানতে পেরেছি। কারণ সরকারি নথিতে যে অনুভূতি থাকে না, চিঠিতে তা থাকে।

একজন মানুষ তার সময়কে কীভাবে দেখছিলেন, কী নিয়ে ভয় পাচ্ছিলেন, কী স্বপ্ন দেখছিলেন, কাকে ভালোবাসছিলেন—চিঠি সেই ব্যক্তিগত ইতিহাসটুকু আমাদের কাছে রেখে যায়।

এখন আর ডাকপিয়নের অপেক্ষা নেই

প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে বদলে দিয়েছে।

ই-মেইল এসেছে। মুঠোফোন এসেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এসেছে। এখন পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে একটি বার্তা পৌঁছে যায় চোখের পলকে।

এটি নিঃসন্দেহে আশীর্বাদ।

কিন্তু এর সঙ্গে হারিয়ে গেছে অপেক্ষার সৌন্দর্য।

হারিয়ে গেছে ডাকপিয়নের সাইকেলের ঘণ্টা।

হারিয়ে গেছে ডাকবাক্সের সামনে দাঁড়িয়ে থাকার উত্তেজনা।

হারিয়ে গেছে নিজের নামে আসা একটি খাম বুকের কাছে চেপে ধরার আনন্দ।

এখন আমরা অনেক বেশি যোগাযোগ করি, কিন্তু হয়তো অনেক কম অনুভব করি।

চিঠির কাগজে মানুষের স্পর্শ থাকে

একটি মোবাইল ফোন হারিয়ে গেলে হাজার হাজার বার্তা হারিয়ে যেতে পারে। একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট বন্ধ হয়ে গেলে অনেক স্মৃতিও হারিয়ে যেতে পারে।

কিন্তু একটি চিঠি বহু বছর টিকে থাকে।

কাগজ হলুদ হয়, ভাঁজ পড়ে, কালির রং ফিকে হয়ে আসে—তবু চিঠিটি থেকে যায়।

কারণ চিঠির মূল্য তার কাগজে নয়; তার ভেতরের মানুষটিতে।

কোনো পুরোনো চিঠি হাতে নিলে মনে হয়, এই কাগজ একদিন সেই মানুষটির হাত ছুঁয়েছিল। যে মানুষটি হয়তো আজ অনেক দূরে। কিংবা হয়তো আর এই পৃথিবীতেই নেই।

তখন একটি চিঠি আর চিঠি থাকে না।

তা হয়ে ওঠে স্মৃতি।

আবার কি চিঠি লেখা যায়?

অবশ্যই যায়।

আজ কাউকে চিঠি লিখতে হলে ডাকটিকিট কিনে ডাকঘরে যেতে হবে না। চাইলে চিঠিটি হাতে হাতে দেওয়া যায়। প্রিয় মানুষটির টেবিলে রেখে আসা যায়। বইয়ের ভেতর লুকিয়ে রাখা যায়।

কাউকে একটি চিঠি লেখা যায় শুধু এই কারণে—

‘তোমাকে মনে পড়ছে।’

কোনো বিশেষ দিন না থাকলেও লেখা যায়—

‘তুমি আমার জীবনে আছো, এটাই আমার জন্য আনন্দের।’

অথবা বহুদিন কথা না হওয়া কোনো বন্ধুকে লেখা যায়—

‘কেমন আছো? অনেকদিন তোমার কোনো খবর নেই।’

হয়তো সেই চিঠির উত্তর আসবে না।

তবু চিঠিটি লেখা হবে।

কারণ কিছু কথা উত্তর পাওয়ার জন্য লেখা হয় না। শুধু পৌঁছে দেওয়ার জন্য লেখা হয়।

চিঠি আসলে কী?

চিঠি হলো অপেক্ষা।

চিঠি হলো অভিমান।

চিঠি হলো ভালোবাসা।

চিঠি হলো দূরত্ব পেরিয়ে কাছে আসার চেষ্টা।

চিঠি হলো এমন কিছু কথা, যা মুখে বলা যায় না।

আর চিঠি হলো সময়কে ধরে রাখার এক আশ্চর্য পদ্ধতি।

আজ বিশ্ব চিঠি দিবসে পুরোনো কোনো বাক্সে যদি আপনার একটি চিঠি পড়ে থাকে, খুলে দেখুন।

হয়তো কাগজটি অনেক পুরোনো।

হয়তো অক্ষরগুলো ঝাপসা।

হয়তো যিনি লিখেছিলেন, তিনি আজ পাশে নেই।

তবু কয়েকটি শব্দের ভেতর থেকে হঠাৎ একটি পরিচিত কণ্ঠ শুনতে পাবেন—

‘ভালো থেকো।’

তখন হয়তো বুঝবেন, পৃথিবী যত আধুনিকই হোক, কিছু অনুভূতির কোনো বিকল্প নেই।

মানুষ চলে যায়, সময় চলে যায়, প্রযুক্তি বদলে যায়—কিন্তু ভালোবাসা দিয়ে লেখা একটি চিঠি কখনো পুরোনো হয় না।