আজ স্বভাবকবি গোবিন্দচন্দ্র দাসের ১০৮তম মৃত্যুবার্ষিকী
নিজস্ব প্রতিবেদক
উইমেননিউজ২৪
প্রকাশিত : ১১:০৬ এএম, ১ অক্টোবর ২০২৬ বৃহস্পতিবার
সংগৃহীত ছবি
বাংলা সাহিত্যের ‘স্বভাবকবি’ হিসেবে পরিচিত গোবিন্দচন্দ্র দাসের ১০৮তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ১৯১৮ সালের ১ অক্টোবর তিনি মারা যান। প্রেম, বিরহ, দেশপ্রেম, প্রকৃতি, মানবজীবন ও সামাজিক অবিচার ছিল তার কবিতার প্রধান বিষয়। সহজ-সরল ভাষায় তীব্র আবেগ ও গভীর অনুভূতি প্রকাশের কারণে বাংলা সাহিত্যে আলাদা জায়গা করে নিয়েছেন তিনি।
গোবিন্দচন্দ্র দাস ১৮৫৫ সালের ১৬ জানুয়ারি তৎকালীন ঢাকা জেলার ভাওয়াল পরগণার জয়দেবপুরে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা রামনাথ দাস ও মা আনন্দময়ী দেবী। দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেওয়া এই কবি ছোটবেলাতেই বাবা-মাকে হারান। ভাওয়াল রাজপরিবারের সহায়তায় তার পড়াশোনা শুরু হলেও তা বেশি দূর এগোয়নি। ছাত্রজীবন থেকেই কবিতা লেখার প্রতি তার আগ্রহ তৈরি হয়।
কৈশোরেই তার কবিপ্রতিভার পরিচয় পাওয়া যায়। জয়দেবপুরের বিদ্যোৎসাহিনী সভা ও ভাওয়ালের প্রজাহিতৈষিণী সভায় তিনি নিজের লেখা কবিতা পাঠের সুযোগ পান। তার প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে ভাওয়ালের রাজা কালীনারায়ণ রায় তার পড়াশোনার জন্য বৃত্তির ব্যবস্থাও করেছিলেন।
১৮৭৭ সালে গোবিন্দচন্দ্র দাস ভাওয়াল রাজকুমার রাজেন্দ্র নারায়ণের ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে কাজ শুরু করেন। তবে ভাওয়াল রাজপরিবারের শাসন ও দেওয়ান কালীপ্রসন্ন ঘোষের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে তার প্রতিবাদ তাকে বিপাকে ফেলে। একপর্যায়ে রাজবাড়ির চাকরি হারানোর পাশাপাশি নিজ এলাকা জয়দেবপুর ছাড়তেও বাধ্য হন। পরে তিনি মুক্তাগাছা, শেরপুর ও মুন্সীগঞ্জে বসবাস করেন।
জীবনের এই সংঘাত ও দুঃখ-কষ্ট তার কবিতায় গভীরভাবে ফুটে ওঠে। তার কবিতায় প্রেম ও বিরহের পাশাপাশি অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, দেশপ্রেম এবং মানুষের জীবনসংগ্রামের কথাও উঠে এসেছে। এ কারণেই তার কবিতায় একদিকে যেমন আবেগ ও ভালোবাসা রয়েছে, অন্যদিকে রয়েছে তীব্র প্রতিবাদী সুর।
মুন্সীগঞ্জে অবস্থানকালে তিনি মগের মুল্লুক নামে ব্যঙ্গাত্মক রচনা প্রকাশ করেন। এটি পরে বই আকারেও প্রকাশিত হয় এবং পাঠকদের মধ্যে জনপ্রিয়তা পায়। তার উল্লেখযোগ্য রচনার মধ্যে রয়েছে মগের মুল্লুক, নির্বাসিতের আবেদন, ভাওয়াল, হেমাঙ্গিনী ঘোষ, জন্মভূমি, বাঙালী, আমার ভালোবাসা, রমণীর মন, সামান্য নারী ও দিন ফুরায়ে যায়রে আমার। তার কাব্যগ্রন্থের মধ্যে প্রেম ও ফুল, কুঙ্কুম, কস্তূরী, চন্দন, ফুলরেণু, বৈজয়ন্তী ও শোক ও সান্ত্বনা উল্লেখযোগ্য।
গোবিন্দচন্দ্র দাসের কবিতার একটি বড় বৈশিষ্ট্য ছিল ব্যক্তিগত অনুভূতিকে সরল ভাষায় প্রকাশ করা। বিশেষ করে প্রেম ও বিরহের কবিতায় তার গভীর আবেগ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রথম স্ত্রী সারদাসুন্দরীর মৃত্যু তাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। তার ব্যক্তিগত শোক ও জীবনসংগ্রামও পরবর্তী কবিতায় নানা ভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
গোবিন্দচন্দ্র দাসের কবিতায় ব্যক্তিগত বেদনার পাশাপাশি সমাজের দুঃখ-দারিদ্র্যের চিত্রও উঠে এসেছে। ‘আমার চিতায় দিবে মঠ’ কবিতায় তিনি লিখেছেন—
“ও ভাই বঙ্গবাসী, আমি মর্লে,
তোমারা আমার চিতায় দিবে মঠ!”
দারিদ্র্য, ক্ষুধা ও স্বদেশচ্যুত মানুষের যন্ত্রণা এই কবিতায় তীব্রভাবে প্রকাশ পেয়েছে।
তার কবিতায় যেমন প্রেম ও বিরহের আবেগ রয়েছে, তেমনি রয়েছে স্বদেশ ও মানুষের প্রতি গভীর টান। ‘জন্মভূমি’ কবিতায় তিনি লিখেছেন—
“জননী গো জন্মভূমি তোমারি পবন
দিতেছে জীবন মোরে নিশ্বাসে নিশ্বাসে!”
জন্মভূমির মাটি, প্রকৃতি ও মানুষের সঙ্গে তার গভীর সম্পর্কের প্রকাশ ঘটেছে এই কবিতায়। আবার ‘ভাওয়াল’ কবিতায় নিজের জন্মভূমির প্রতি গভীর টান প্রকাশ করে লিখেছেন—
“ভাওয়াল আমার অস্থিমজ্জা
ভাওয়াল আমার প্রাণ!”
তেমনি ‘মগের মুল্লুক’ কবিতায় দেখা যায় তীব্র ব্যঙ্গ ও প্রতিবাদ। ‘দিন ফুরায়ে যায়রে আমার’ কবিতায় জীবনের শেষপ্রান্তে এসে সময়, মৃত্যু ও অপূর্ণতার বেদনা অত্যন্ত মর্মস্পর্শী হয়ে উঠেছে।
গোবিন্দচন্দ্র দাসের সাহিত্যজীবন ছিল নানা প্রতিকূলতায় ভরা। দারিদ্র্য, পারিবারিক শোক, চাকরি হারানো ও নানা ধরনের নিপীড়নের মধ্যেও তিনি লেখা চালিয়ে গেছেন। জীবনের শেষভাগেও অসুস্থতা ও আর্থিক সংকট তাকে ঘিরে ছিল। একসময় বিষফোঁড়ায় আক্রান্ত হয়ে তিনি হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস তাকে আর্থিক সহায়তা করেছিলেন বলে বিভিন্ন জীবনীতে উল্লেখ রয়েছে।
রোগ, শোক ও দারিদ্র্যের মধ্যে ১৯১৮ সালের ১ অক্টোবর ঢাকায় তার মৃত্যু হয়। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৬৩ বছর।
বাংলা সাহিত্যে গোবিন্দচন্দ্র দাসের পরিচয় শুধু স্বভাবকবি হিসেবে সীমাবদ্ধ নয়। তার কবিতায় উনিশ শতকের পূর্ববাংলার প্রকৃতি, মানুষের জীবন, প্রেম-বিরহ, দেশপ্রেম এবং সামাজিক বাস্তবতার যে ছবি উঠে এসেছে, তা তাকে বাংলা কবিতার ইতিহাসে স্বতন্ত্র অবস্থান দিয়েছে। আজ তার ১০৮তম মৃত্যুবার্ষিকীতে সেই কবির সাহিত্যকর্ম ও জীবনসংগ্রাম নতুন করে স্মরণ করা হচ্ছে।
