ডাকসুর প্রথম নারী ভিপি: বেগম জাহানারা আখতার
অনলাইন ডেস্ক
উইমেননিউজ২৪
প্রকাশিত : ০৯:১২ পিএম, ২৬ অক্টোবর ২০২৬ সোমবার
ডাকসুর প্রথম নারী ভিপি: বেগম জাহানারা আখতার
ডাকসুর নারী ভিপি বলতে অনেক বছর ধরে একজনের নামই বলা হতো, মাহফুজা খানম। কিন্তু তাঁরও আগে এই পদে নির্বাচিত হয়েছিলেন আরেকজন, বেগম জাহানারা আখতার। ১৯৬০-৬১ শিক্ষাবর্ষে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের সহসভাপতি হন। ডাকসুর ইতিহাসে তিনিই প্রথম নারী ভিপি।
তাঁর সম্পর্কে যা জানা যায়, তার প্রায় সবটাই ওই এক বছরের। জন্মতারিখ, জন্মস্থান, বাবা-মা বা পরিবারের কোনো তথ্য আজ পর্যন্ত কোথাও পাওয়া যায়নি। ভিপি হওয়ার পর তিনি কোথায় গেলেন, কী করলেন, সে কথাও অজানা। ডাকসুর ভিপি বা জিএস হওয়ার পর পরবর্তী জীবনে রাজনীতিতে তাঁর আর কোনো সম্পৃক্ততাও দেখা যায় না।
নামটা নিয়েও একটু গোলমাল আছে। ডাকসুর তালিকায় লেখা বেগম জাহানারা আখতার। তখনকার একটি সংবাদে তাঁকে লেখা হয়েছিল "উইমেন্স হলের মিস জাহানারা বেগম"। কোনো কোনো প্রতিবেদনে বানান আসে জাহানারা আক্তার বা আখতারও।
যে তথ্যগুলো নিশ্চিত: তিনি ছিলেন তৎকালীন উইমেন্স হলের শিক্ষার্থী। ওই হলের নাম এখন রোকেয়া হল। ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ষাটের দশকের শুরুতে শিক্ষা আন্দোলন জোরালো হয়ে উঠলে তিনি খুব সক্রিয় ছিলেন।
তখন পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক শাসন চলছে। ছাত্ররা শিক্ষা আর অধিকার নিয়ে সরব হতে শুরু করেছে। ক্যাম্পাসের রাজনীতি মূলত ছেলেদের জায়গা। মেয়েদের সংখ্যা কম, আর তাঁরা সংগঠনের শীর্ষ পদে যাবেন, এটা তখন কেউ ভাবতই না।
সে সময় ডাকসুর ভিপি সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হতেন না। পরোক্ষ পদ্ধতিতে নির্বাচন হতো। তবু একজন নারী শিক্ষার্থী এই পদে পৌঁছালেন, সেটাই ছিল বড় ঘটনা। সে সময়ের একটি সংবাদে লেখা হয়েছিল, বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একজন নারী সহসভাপতি হলেন। ১৯৬১ সালের ফেব্রুয়ারিতে নবনির্বাচিত ভিপি হিসেবে তাঁর বক্তৃতা দেওয়ার একটি ছবিও টিকে আছে।
ডাকসুকে বলা হতো ছাত্রসমাজের দ্বিতীয় সংসদ। ভাষা আন্দোলনের পর থেকে একের পর এক আন্দোলনের কেন্দ্র ছিল এই সংগঠন। শিক্ষা আন্দোলন, সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন, পরে মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি তৈরির সময়েও এর ভূমিকা ছিল। এমন সংগঠনে নারীর ভিপি হওয়া তাই শুধু একজনের জয় ছিল না। এতে বোঝা গেল, মেয়েরাও সংগঠন চালাতে পারেন, মানুষের আস্থা পেতে পারেন।
কয়েক বছর পরে ডাকসু প্রথম নারী সাধারণ সম্পাদকও পায়। ছাত্র ইউনিয়নের মতিয়া চৌধুরী ষাটের দশকের মাঝামাঝি জিএস নির্বাচিত হন। ষাটের দশকের শেষ দিকে ভিপি হন মাহফুজা খানম।
২০২৫ সালের আগস্টে মাহফুজা খানম মারা যান। তখন বেশ কিছু গণমাধ্যম তাঁকে ডাকসুর "একমাত্র" নারী ভিপি লেখে। পরে প্রথম আলো প্রকাশ্যে ভুল স্বীকার করে সংশোধনী দেয়। ডিসমিসল্যাবের ফ্যাক্ট-চেকেও পুরোনো পত্রিকা আর বইয়ের তথ্য মিলিয়ে একই কথা বলা হয়। ডাকসু ভবনের সংগ্রহশালার তালিকাতেও জাহানারা আখতারের নাম লেখা আছে।
ডাকসুতে নারী ভিপি তাই এখন পর্যন্ত দুজন। প্রথম জাহানারা আখতার, দ্বিতীয় মাহফুজা খানম। দুজনেই ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। দুজনের মধ্যে ব্যবধান ছয়-সাত বছরের।
২০২৫ সালের ডাকসু নির্বাচনে ভিপি পদে প্রার্থী হয়েছিলেন পাঁচজন নারী। অথচ দীর্ঘ সময় ধরে এই পদে কোনো নারী ছিলেন না। সেই আলোচনার মধ্যেই জাহানারা আখতারের নামটা আবার সামনে এসেছে।
একজন মানুষ এত বড় একটা জায়গায় পৌঁছালেন, অথচ তাঁর জন্ম, পরিবার বা শেষ জীবনের কোনো হদিস আজ আর নেই। এটাই হয়তো সবচেয়ে বড় আক্ষেপ। তাঁর সম্পর্কে কেউ কিছু জানলে, বিশেষ করে ডাকসুর পুরোনো সদস্য বা সমসাময়িকদের কেউ, সেই তথ্য ইতিহাসের জন্য খুব দামি হবে।
লেখাটি ফেসবুক থেকে নেয়া
