গোমতীর তীরে নজরুলের প্রেম, বিরহ ও অমর সৃষ্টির গল্প
উইমেননিউজ২৪ ডেস্কঃ
উইমেননিউজ২৪
প্রকাশিত : ০৮:৩৮ এএম, ৩১ অক্টোবর ২০২৬ শনিবার
সংগৃহীত ছবি
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জীবনে কুমিল্লা এক অনন্য অধ্যায়। এ শহরের গোমতী নদী, গ্রামীণ প্রকৃতি আর গোধূলির মায়াবী পরিবেশ যেমন তাঁর সৃষ্টিশীলতাকে প্রভাবিত করেছে, তেমনি এ জনপদের দুই নারী নার্গিস ও প্রমীলা তাঁর প্রেম, বিরহ ও ব্যক্তিজীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছেন গভীরভাবে। অসমাপ্ত প্রেমের বেদনা, প্রিয়জনকে হারানোর হাহাকার আর হৃদয়ের গোপন ক্ষত নজরুলের কবিতা, গান ও সুরে পেয়েছে কালজয়ী রূপ।
গোমতীর বুকে বয়ে চলা ঢেউ আর নদীতীরের নির্জন পরিবেশ যেন আজও কবির সেই না-বলা কথাগুলো বহন করে চলেছে। প্রেমের আকুলতা আর বিচ্ছেদের দীর্ঘশ্বাসে ভরা তাঁর বহু গানের সুরে মিশে আছে কুমিল্লার স্মৃতি।
নজরুলের গানের সেই বিষণ্ন উচ্চারণ যেন আজও কানে বাজে,
‘মধুর বাঁশরি বাজে, বাজে আমার অন্তরে সন্ধ্যাবেলায়। এখনো হঠাৎ মনে হয়, দুটি আঁখি অশ্রুতে ভরা।’
প্রিয় মানুষকে হারানোর বেদনা নজরুলের কাছে শুধু ব্যক্তিগত দুঃখ ছিল না, তা হয়ে উঠেছিল সৃষ্টির অনিঃশেষ প্রেরণা। নার্গিসের সঙ্গে পরিচয়, প্রেম ও বিচ্ছেদের প্রায় ১৫ বছর পর ১৯৩৭ সালের ১ জুলাই তাঁকে লেখা একটি চিঠিতে কবি নিজের অন্তর্দাহের কথা তুলে ধরেছিলেন। সেখানে তিনি লিখেছিলেন, নার্গিসের জন্য তাঁর হৃদয়ে কত গভীর ক্ষত ও অসীম বেদনা জমে আছে, তা কেবল তাঁর নিজের মনই জানে। সেই দুঃখের আগুনে তিনি নিজেই পুড়েছেন, কিন্তু প্রিয়জনকে পোড়াতে চাননি।
চিঠিতে কবি আরও লিখেছিলেন, নার্গিস যদি তাঁকে সেই আগুনের পরশপাথর না দিতেন, তবে হয়তো তিনি ‘অগ্নিবীণা’ বাজাতে পারতেন না, ধূমকেতুর বিস্ময় নিয়ে আত্মপ্রকাশও করতে পারতেন না।
নার্গিসের কৈশোরের সেই রূপ কবির হৃদয়ে চিরকাল অমলিন ছিল। জীবনের প্রথম প্রেমের স্মৃতি তাঁর কাছে ছিল স্বর্গীয় ফুল পারিজাত ও মন্দারের মতো পবিত্র। এই চিঠিতে কবি অতীতের অভিমান কিংবা অভিযোগের পরিবর্তে বিচ্ছেদের বেদনাকেই সৃষ্টির প্রেরণা হিসেবে তুলে ধরেছিলেন।
কুমিল্লায় নজরুলের আগমন ও প্রথম প্রেম
১৯২১ সালের ৩ এপ্রিল কলকাতা থেকে আলী আকবর খানের সঙ্গে প্রথম কুমিল্লায় আসেন কাজী নজরুল ইসলাম। পরে আলী আকবর খানের অতিথি হিসেবে মুরাদনগরের দৌলতপুরে অবস্থান করেন তিনি। সেখানেই আলী আকবর খানের ভাগনি সৈয়দা খাতুনের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। পরিচয় থেকে গড়ে ওঠে প্রেমের সম্পর্ক। নজরুলই তাঁর নাম দেন ‘নার্গিস’।
দৌলতপুরে প্রায় ৭৩ দিনের অবস্থানকালে নার্গিস ও সেখানকার প্রকৃতি কবির মনোজগতে গভীর প্রভাব ফেলে। আলী আকবর খানের বাড়ির পুকুরপাড়ে আমগাছের নিচে বসে বাঁশি বাজাতেন তিনি। প্রকৃতির নিবিড় সান্নিধ্যে সেখানেই রচনা করেন ‘পাপড়ি খোলা’ কবিতা।
কবিতায় রেশমি চুড়ির রিনিঝিনি শব্দ, হৃদয়ের গোপন কথা আর পথের ধারে দাঁড়িয়ে থাকা লাজুক নারীর ছবি ফুটে উঠেছে। এসব চিত্রকল্পে প্রেমের প্রথম আবেশের পাশাপাশি গ্রামীণ বাংলার প্রকৃতিও মূর্ত হয়ে উঠেছে।
১৯২১ সালের জুন মাসে নার্গিসের সঙ্গে নজরুলের বিয়ের আয়োজন করা হয়। কিন্তু বিয়ের রাতে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পর কবি দৌলতপুর ছেড়ে কুমিল্লা শহরে চলে আসেন। এরপর আর দৌলতপুরে ফিরে যাননি তিনি।
এই বিচ্ছেদ নার্গিসের জীবনেও দীর্ঘ অপেক্ষার অধ্যায় তৈরি করে। অন্যদিকে নজরুলের সাহিত্যজীবনে প্রেম ও বিচ্ছেদের অভিজ্ঞতা হয়ে ওঠে গভীর অনুভবের উৎস। তাঁদের অসমাপ্ত প্রেমকাহিনি পরবর্তী সময়ে কবির জীবন ও সাহিত্য নিয়ে আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।
নার্গিসকে লেখা চিঠিতে জমে থাকা বেদনা
দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর ১৯৩৭ সালের ১ জুলাই নার্গিসকে চিঠি লেখেন নজরুল। জীবনে নার্গিসকে লেখা তাঁর একমাত্র চিঠি হিসেবে এটি বিশেষভাবে আলোচিত। সেখানে কবি স্পষ্ট করেন, নার্গিসের প্রতি তাঁর কোনো বিদ্বেষ, তিরস্কার কিংবা অভিযোগ নেই। বরং অতীতের বেদনাকে তিনি নিজের সাহিত্যসৃষ্টির অন্যতম উৎস হিসেবে দেখেছেন।
চিঠিতে প্রায় ১৫ বছর আগের একটি স্মৃতিও তুলে ধরেন কবি। নার্গিসের জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার সেই ঘটনা তাঁর স্মৃতিতে তখনো অমলিন ছিল। সময় পেরিয়ে গেলেও প্রিয় মানুষের অসুস্থতার মতো ছোট একটি ঘটনাও যে তাঁর মনে এত গভীরভাবে গেঁথে ছিল, তা কবির আবেগের গভীরতা প্রকাশ করে।
নার্গিসের স্মৃতি ফিরে এসেছে নজরুলের গানে ও কবিতায়। গোমতীর তীরে পাতায় ছাওয়া কুটিরে গোধূলিবেলায় অপেক্ষার যে ছবি তাঁর সৃষ্টিতে উঠে এসেছে, সেখানে হারানো প্রেমের পাশাপাশি রয়েছে এক অদ্ভুত অনিশ্চয়তা। প্রিয় মানুষটি হয়তো আর ফিরবেন না, তবু মনের গভীরে থেকে যায় ফিরে পাওয়ার ক্ষীণ আশা।
এই অপেক্ষা বাস্তবের চেয়ে অনুভূতির জগতে বেশি জীবন্ত। মানুষটি জীবনে অনুপস্থিত, কিন্তু স্মৃতির মধ্যে তিনি প্রতিনিয়ত ফিরে আসেন।
প্রমীলা: প্রেম থেকে আজীবনের বন্ধন
নার্গিসের সঙ্গে বিয়ের আয়োজন ভেঙে যাওয়ার পর কুমিল্লা শহরের কান্দিরপাড়ে বীরেন্দ্রকুমার সেনের বাড়িতে অবস্থান করেন নজরুল। সেখানেই পরিচয় হয় আশালতা সেনগুপ্তের সঙ্গে। পরবর্তী সময়ে কবি তাঁর নাম দেন ‘প্রমীলা’। পরিচয় থেকে তাঁদের মধ্যে গড়ে ওঠে প্রেমের সম্পর্ক।
সামাজিক ও পারিবারিক বিরোধিতা উপেক্ষা করে ১৯২৪ সালের ২৫ এপ্রিল কলকাতার ৬ হাজী লেনের ঠিকানায় তাঁদের বিয়ে হয়। প্রমীলা শুধু কবির জীবনসঙ্গী ছিলেন না, তাঁর সাহিত্যসৃষ্টিরও গুরুত্বপূর্ণ প্রেরণা হয়ে ওঠেন।
প্রমীলার প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার প্রকাশ পাওয়া যায় ‘বিজয়িনী’, ‘প্রিয়ার রূপ’ ও ‘দোদুল দুল’সহ বিভিন্ন রচনায়। ‘বিজয়িনী’ কবিতায় প্রিয়াকে বিজয়ী রূপে কল্পনা করে কবি লিখেছিলেন,
‘ওগো রানি! আজিকে তোমার কাছে নত করি মোর বিজয়কেতন।’
প্রমীলার সঙ্গে নজরুলের সম্পর্ক ছিল প্রেম, সংগ্রাম ও পারস্পরিক নির্ভরতার এক দীর্ঘ অধ্যায়। জীবনের নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও তাঁদের সম্পর্ক কবির ব্যক্তিজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ছিল।
কুমিল্লার প্রকৃতি ও নজরুলের সাহিত্যজগৎ
১৯২১ সালের এপ্রিল থেকে ১৯২৪ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত পাঁচ দফায় কুমিল্লায় এসে প্রায় ১১ মাস অবস্থান করেন নজরুল। সময়ের হিসাবে এই অবস্থান দীর্ঘ না হলেও কবির ব্যক্তিজীবন ও সাহিত্যিক বিকাশে এর গুরুত্ব ছিল অসামান্য।
গোমতীর শান্ত প্রবাহ, সন্ধ্যার আলো, গ্রামের আঁকাবাঁকা পথ এবং নাগরিক কোলাহল থেকে দূরের পরিবেশ তাঁর সংবেদনশীল মনকে আলোড়িত করেছিল। নদীর কলতান ও প্রকৃতির স্নিগ্ধতা তাঁর সংগীতের আবহ তৈরিতে ভূমিকা রেখেছিল। কুমিল্লার স্মৃতি পরবর্তী সময়ে নজরুলের বহু গান ও কবিতার আবেগের সঙ্গে মিশে যায়।
বিশিষ্ট কবি ও নজরুল গবেষক আবদুল হাই শিকদার কুমিল্লাকে নজরুলের শহর হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, একদিকে নার্গিস, অন্যদিকে প্রমীলা আর মাঝখানে গোমতী নদী। এই তিনের সমন্বয়েই নজরুলের কুমিল্লা অধ্যায়কে বুঝতে হয়।
শহরটির বিভিন্ন স্থানে নজরুলের স্মৃতিফলক রয়েছে। কুমিল্লার সঙ্গে কবির প্রেম, সাম্য, বিদ্রোহ ও সৃষ্টিশীলতার স্মৃতি জড়িয়ে আছে। গবেষকদের মতে, কুমিল্লা থেকে কলকাতায় ফেরার অল্প সময়ের মধ্যেই নজরুল রচনা করেন তাঁর কালজয়ী কবিতা ‘বিদ্রোহী’। যদিও কবিতাটির রচনাকাল ও প্রকাশনার ইতিহাস আলাদাভাবে বিবেচ্য, এ সময়ের অভিজ্ঞতা কবির সাহিত্যিক বিকাশের বৃহত্তর প্রেক্ষাপটের অংশ।
কাজী নজরুল ইসলাম ইনস্টিটিউটের পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক ও নজরুল গবেষক ড. আলী হোসেন চৌধুরীর দৃষ্টিতেও কুমিল্লা অধ্যায় কবির জীবনের উজ্জ্বল সময়গুলোর একটি। নার্গিসকে লেখা চিঠির প্রসঙ্গ তুলে তিনি মনে করেন, হারানো প্রেমের বেদনা ও কৈশোরের প্রিয় মানুষের স্মৃতি নজরুলের অনুভূতিকে পরিণত করেছে এবং তাঁর সাহিত্যসৃষ্টিতে গভীর প্রভাব ফেলেছে।
বিরহের আগুনে অমর প্রেম
কাজী নজরুল ইসলাম বিদ্রোহের কবি হিসেবে পরিচিত হলেও প্রেম ও বিরহের কবি হিসেবেও তাঁর অবস্থান অনন্য। তাঁর প্রেমের প্রকাশ কখনো উচ্ছ্বাসে, কখনো অভিমানে, আবার কখনো দীর্ঘশ্বাসে। অপূর্ণতা তাঁর অনুভূতিকে থামিয়ে দেয়নি; বরং সেই অপূর্ণতাই সৃষ্টি করেছে এক গভীর ও শাশ্বত প্রেমের জগৎ।
নার্গিসের সঙ্গে বিচ্ছেদ এবং প্রমীলার সঙ্গে দাম্পত্য, দুটি ভিন্ন অভিজ্ঞতা নজরুলের জীবনকে ভিন্নভাবে সমৃদ্ধ করেছে। একজন হয়ে রইলেন অধরা প্রেম ও অনুচ্চারিত বেদনার স্মৃতি, অন্যজন হলেন জীবনসঙ্গী ও সংগ্রামের সহযাত্রী।
নজরুলের অন্তরের আগুনের কথা সবাই জানত না। তিনি নিজের বেদনা নিজেই বহন করেছেন, কিন্তু সেই দহনকে প্রিয়জনের ওপর চাপিয়ে দিতে চাননি। তাঁর প্রেম তাই কেবল কাউকে কাছে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা নয়, বরং স্মৃতি, ত্যাগ, বিরহ ও সৃষ্টির মধ্য দিয়ে ভালোবাসাকে অমর করে রাখার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
গোমতীর জল হয়তো সময়ের সঙ্গে বদলে যায়, নদীতীরের পথেও আসে পরিবর্তন। কিন্তু নজরুলের গান ও কবিতায় কুমিল্লার যে প্রেমময় স্মৃতি বেঁচে আছে, তা মুছে যাওয়ার নয়। গোধূলির নীরবতায়, নদীর ঢেউয়ে আর তাঁর গানের বাঁশিতে আজও যেন বেজে চলে সেই অমর প্রেমের সুর। সূত্র: বাসস
