চাক দোয়েল: প্রকৃতির এক অদ্ভূত নৃত্যশিল্পী
আইরীন নিয়াজী মান্না
উইমেননিউজ২৪
প্রকাশিত : ০৭:৩০ পিএম, ৮ নভেম্বর ২০২৬ রবিবার
চাক দোয়েল।
গাছের ডালে বসে আছে ছোট্ট একটি পাখি। হঠাৎ সে লেজটি পাখার মতো মেলে ধরল। তারপর একবার ডানে, একবার বাঁয়ে ঘুরে নাচতে শুরু করল। কখনো লেজ গুটিয়ে ফেলছে, আবার কখনো পেখমের মতো ছড়িয়ে দিচ্ছে। দেখতে মনে হয়, কোনো নৃত্যশিল্পী যেন নিজের ছন্দে মেতে উঠেছে। একটু পরেই ডানা মেলে উড়ে গিয়ে বাতাস থেকে একটি ছোট পোকা ধরে আবার ফিরে এল আগের ডালে। আমি আমাদের বাসার দখিনের বারান্দায় দাঁড়িয়ে উঠোনোর বাতাবি লেবুর গাছে ওর খেলা দেখছি। ইদানিং প্রায় প্রতিদিনই এ সময়ে সে আসছে। এই পাখিটির নাম চাক দোয়েল।
বাংলাদেশের প্রকৃতিপ্রেমী ও পাখিপ্রেমীদের কাছে চাক দোয়েল বেশ পরিচিত। ছোট্ট শরীর, ছটফটে স্বভাব, সুন্দর লেজ এবং নাচের মতো চলাফেরা—সব মিলিয়ে পাখিটি প্রকৃতির এক অপূর্ব সৃষ্টি। সাধারণ দোয়েলের সঙ্গে নামের মিল থাকলেও চাক দোয়েল সম্পূর্ণ আলাদা প্রজাতির পাখি।
নাম ও পরিচয়:
চাক দোয়েলের ইংরেজি নাম White-throated Fantail। এর বৈজ্ঞানিক নাম Rhipidura albicollis। এটি রিপিডুরিডি (Rhipiduridae) পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। এই পরিবারের পাখিদের সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো লেজ ছড়িয়ে পাখার মতো করে রাখা এবং উড়তে উড়তে পোকামাকড় শিকার করা।
বাংলাদেশে পাখিটি চাক দোয়েল, ধলাগলা লেজনাচানি, সাদাগলা লেজনাচানি ও ধলাগলা ছাতিঘুরুনি নামেও পরিচিত।
এখানে একটি বিষয় মনে রাখা দরকার, চাক দোয়েল বাংলাদেশের জাতীয় পাখি দোয়েল নয়। জাতীয় দোয়েলের ইংরেজি নাম Oriental Magpie-Robin এবং বৈজ্ঞানিক নাম Copsychus saularis। দেখতে ও স্বভাবে দুটির মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে।
দেখতে কেমন:
চাক দোয়েল আকারে ছোট, সাধারণত প্রায় ১৭ সেন্টিমিটার লম্বা। শরীরের রং ধূসর ও কালচে। মাথা তুলনামূলক গাঢ়। চোখের ওপর দিয়ে সাদা ভ্রুর মতো দাগ রয়েছে। গলা সাদা, আর বুক ও পেটের পালকে ধূসর আভা দেখা যায়। পা ও ঠোঁট কালচে।
তবে পাখিটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় অঙ্গ তার লেজ। লেজের পালকগুলো পাখার মতো ছড়িয়ে দিতে পারে। এই লেজ ছড়িয়ে কখনো ডালের ওপর বসে থাকে, কখনো নাচের মতো করে শরীর ঘোরায়। আবার উড়তে উড়তে লেজ মেলে ধরে দিক পরিবর্তন করে।
স্ত্রী ও পুরুষ পাখির চেহারায় খুব বেশি পার্থক্য নেই। তাই কাছ থেকে না দেখলে অনেক সময় স্ত্রী ও পুরুষকে আলাদা করা কঠিন।
কোথায় থাকে:
চাক দোয়েল মূলত গাছপালায় ঘেরা এলাকা, হালকা বন, বাঁশঝাড়, বাগান, ঝোপঝাড় ও ছায়াঘেরা জায়গা পছন্দ করে। পুকুরের পাড়, গ্রামের বাড়ির বাগান কিংবা শহরের সবুজ পরিবেশেও এদের দেখা মেলে।
বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এই পাখি দেখা যায়। সাধারণত একা অথবা জোড়ায় জোড়ায় ঘুরে বেড়ায়। গাছের নিচু ডাল থেকে উঁচু ডালে, কখনো ঝোপের আড়ালে, আবার কখনো খোলা জায়গায় উড়ে বেড়ায়। খুব বেশি দূরে যায় না। একটি নির্দিষ্ট এলাকায় বারবার ফিরে আসতেও দেখা যায়।
চাক দোয়েল মানুষের বসতির আশপাশেও থাকতে পারে। তবে ঘন গাছপালা ও ঝোপঝাড় থাকলে সেখানে তাদের বসবাসের উপযোগী পরিবেশ তৈরি হয়।
কেন এত নাচে চাক দোয়েল?:
চাক দোয়েলের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য তার লেজের নাচ। পাখিটি যখন লেজের পালকগুলো মেলে ধরে, তখন দেখতে অনেকটা হাতপাখার মতো লাগে। এই লেজ মেলে সে ডালে ডালে ঘোরে, শরীর দোলায় এবং কখনো হঠাৎ ডিগবাজির মতো ভঙ্গিতে উড়ে যায়।
এই নাচের পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ। খাবার খোঁজার সময় পাখিটি বারবার শরীর ঘোরায়, লেজ মেলে ধরে এবং ডানা নামায়। আবার প্রজনন মৌসুমে পুরুষ পাখি সঙ্গীকে আকর্ষণ করার জন্য বিশেষ ভঙ্গিতে নাচে ও ডাকতে থাকে।
তার নাচের মধ্যে রয়েছে ছন্দ, গতি ও সৌন্দর্য। তাই পাখিপ্রেমীরা তাকে অনেক সময় নাচুনে পাখি বলেও ডাকেন।
খাবার কী:
চাক দোয়েল মূলত পতঙ্গভোজী পাখি। মশা, মাছি, ছোট ছোট উড়ন্ত পোকামাকড়, মথ ও অন্যান্য পতঙ্গ তার প্রধান খাবার।
খাবার ধরার কৌশলও বেশ চমৎকার। একটি ডালে বসে আশপাশে নজর রাখে। কোনো পোকা উড়তে দেখলেই দ্রুত ডানা মেলে ছুটে যায়। মাঝআকাশে পোকাটি ধরে আবার ফিরে আসে ডালে। কখনো ডালের নিচে, কখনো পাতার আড়ালে, আবার কখনো ঝোপের মধ্যে খাবার খুঁজে বেড়ায়।
সুযোগ পেলে মাটিতে নেমে উইপোকা ও অন্যান্য ছোট পতঙ্গও খায়।
এভাবে নানা ক্ষুদ্র পতঙ্গ খেয়ে প্রকৃতির খাদ্যশৃঙ্খলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে চাক দোয়েল।
বাসা বাঁধে কীভাবে:
চাক দোয়েলের বাসা প্রকৃতির এক অপূর্ব স্থাপত্য। ছোট্ট পাখিটি নিজের বাসা তৈরি করে ঘাস, সরু শিকড়, উদ্ভিদের আঁশ ও মাকড়সার জাল দিয়ে।
বাসাটি দেখতে অনেকটা ছোট্ট পেয়ালা বা মাটির চায়ের কাপের মতো। সাধারণত গাছের সরু ডালের সংযোগস্থলে অথবা ডালের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় বাসা তৈরি করে। বাসার বাইরের অংশে মাকড়সার জাল ব্যবহার করায় এটি ডালের সঙ্গে বেশ ভালোভাবে আটকে থাকে।
দূর থেকে দেখলে অনেক সময় বোঝাই যায় না, ডালের মধ্যে এমন সুন্দর একটি বাসা রয়েছে।
প্রজনন মৌসুমে স্ত্রী পাখি সাধারণত তিনটি ডিম পাড়ে। ডিমের রং সাদাটে বা হালকা আভাযুক্ত, গায়ে বাদামি ছিট বা দাগ থাকে। স্ত্রী ও পুরুষ পাখি দুজনেই ডিমে তা দেওয়া এবং ছানাদের খাবার জোগানোর কাজে অংশ নেয়।
ছানা বড় হওয়ার আগপর্যন্ত মা-বাবা দুজনেই খাবার সংগ্রহ করে তাদের খাওয়ায়।
ছোট্ট পাখির অসাধারণ সাহস:
চাক দোয়েল আকারে ছোট হলেও সাহসে কম নয়। নিজের বাসা ও ছানাদের রক্ষায় সে বেশ আক্রমণাত্মক হয়ে উঠতে পারে।
কোনো শিকারি প্রাণী বাসার কাছে এলে মা-বাবা পাখি চিৎকার করে সতর্ক করে। প্রয়োজনে শত্রুর দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এমনকি আকারে অনেক বড় প্রাণীকেও ভয় দেখিয়ে দূরে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে।
পাখি পর্যবেক্ষক শরীফ খান প্রথম আলোতে প্রকাশিত এক লেখায় চাক দোয়েলের এই সাহসী আচরণের বর্ণনা দিয়েছেন। তাঁর পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, কয়েকটি চাক দোয়েলসহ অন্য পাখি মিলে বেজিদের আক্রমণ করে তাদের বাসার আশপাশ থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিল।
ছোট্ট শরীরের মধ্যে যে এত সাহস থাকতে পারে, চাক দোয়েল তার চমৎকার উদাহরণ।
প্রকৃতিতে চাক দোয়েলের গুরুত্ব:
প্রকৃতির প্রতিটি প্রাণীরই রয়েছে নিজস্ব ভূমিকা। চাক দোয়েলও তার ব্যতিক্রম নয়।
এরা নানা ধরনের ক্ষুদ্র পতঙ্গ খেয়ে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় সাহায্য করে। বিশেষ করে উড়ন্ত পোকামাকড় শিকার করার দক্ষতা তাদের প্রকৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ পতঙ্গনিয়ন্ত্রক হিসেবে পরিচিত করে তুলেছে।
গাছপালা, ঝোপঝাড় ও প্রাকৃতিক আবাসস্থল এদের জীবনধারণের জন্য জরুরি। তাই শহর ও গ্রামের সবুজ জায়গা কমে গেলে এ ধরনের পাখির বসবাসও কঠিন হয়ে পড়ে।
চাক দোয়েলকে টিকিয়ে রাখতে হলে গাছপালা ও ঝোপঝাড় সংরক্ষণ করতে হবে। পাখির বাসা ভাঙা, ডিম নষ্ট করা কিংবা ছানা ধরে খাঁচায় বন্দী করার মতো কাজ থেকে বিরত থাকতে হবে।
সংরক্ষণ পরিস্থিতি:
চাক দোয়েল বাংলাদেশের পরিচিত আবাসিক পাখি। আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংস্থা আইইউসিএনের মূল্যায়নে White-throated Fantail প্রজাতিটি বর্তমানে ‘Least Concern’ বা ন্যূনতম বিপদগ্রস্ত শ্রেণিতে রয়েছে। অর্থাৎ বিশ্বব্যাপী প্রজাতিটি এখনো উচ্চ ঝুঁকিতে নেই।
তবে কোনো প্রজাতি বিশ্বব্যাপী বিপদমুক্ত শ্রেণিতে থাকলেই তার আবাসস্থল ধ্বংস করা বা নির্বিচারে পাখি শিকার করার সুযোগ নেই। স্থানীয়ভাবে পাখির সংখ্যা ও আবাসস্থল রক্ষা করা জরুরি।
একটু সময় নিয়ে কোনো সবুজ বাগানে দাঁড়ালে হয়তো চোখে পড়ে যাবে চাক দোয়েল। প্রথমে তার ছোট্ট শরীরটি চোখে পড়বে না। কিন্তু হঠাৎ যখন লেজের পাখা মেলে নাচতে শুরু করবে, তখন তাকে আর ভুল করা যাবে না।
প্রকৃতির এই ছোট্ট নৃত্যশিল্পী আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সৌন্দর্য শুধু বড় বা রঙিন প্রাণীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ধূসর-কালো রঙের ছোট্ট একটি পাখিও তার নিজস্ব ছন্দ, কৌশল ও জীবনযাত্রা দিয়ে প্রকৃতিকে অসাধারণ করে তুলতে পারে।
তাই পাখিটিকে দেখলে বিরক্ত করো না, বাসা খুঁজে পেলে হাত দিও না। দূর থেকে তার নাচ দেখো, গান শোনো। প্রকৃতির এই ছোট্ট শিল্পীকে তার নিজের মতো বাঁচতে দাও।
