ঢাকা, শনিবার ১৮, জুলাই ২০২৬ ১৪:৪৪:০৯ পিএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
কাশিমপুর মহিলা কারাগার থেকে আসামি পলায়ন, বরখাস্ত ৭ ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্পে মৃত্যু বেড়ে ৫ হাজার ৬৯ ঢাবি অধ্যাপক নাজমুন নাহার মারা গেছেন অস্কারজয়ী প্রথম আইরিশ অভিনেত্রী ফ্রিকার আর নেই এআই ঝুঁকিতে ১২ লাখ পোশাক শ্রমিক, অনিশ্চয়তায় নারীরা চার সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর সতর্ক সংকেত বহাল

এআই ঝুঁকিতে ১২ লাখ পোশাক শ্রমিক, অনিশ্চয়তায় নারীরা

রাতুল মাঝি | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ১০:৫১ এএম, ১৮ জুলাই ২০২৬ শনিবার

ছবি: সংগ্রহিত।

ছবি: সংগ্রহিত।

সকালের আলো ফুটতেই গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া কিংবা নারায়ণগঞ্জের শিল্পাঞ্চলগুলোতে শুরু হয় হাজারো মানুষের ছুটে চলা। কাঁধে ব্যাগ, হাতে খাবারের পাত্র। প্রতিদিনের মতো পোশাক কারখানার গেটে লাইন ধরে ঢোকেন তাঁরা। দেশের অর্থনীতির চাকা ঘোরানোর অন্যতম কারিগর এসব শ্রমিকের বেশির ভাগই নারী। তাঁদের হাতেই তৈরি হয় বিশ্বের নামী ব্র্যান্ডের পোশাক।

কিন্তু সেই পরিচিত দৃশ্যের আড়ালে এখন ধীরে ধীরে জন্ম নিচ্ছে এক নতুন বাস্তবতা। কারখানার উৎপাদন লাইনে বাড়ছে স্বয়ংক্রিয় মেশিনের ব্যবহার। একসময় যে কাজ করতে লাগত ১৫ থেকে ২০ জন শ্রমিক, সেখানে এখন কয়েকটি আধুনিক মেশিন ও হাতে গোনা কয়েকজন দক্ষ অপারেটরই যথেষ্ট। ফলে শ্রমিকদের মধ্যে অজানা এক আতঙ্ক—একদিন কি মেশিনই তাঁদের জায়গা দখল করে নেবে?

এই আশঙ্কাকে আরও জোরালো করেছে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সাম্প্রতিক এক গবেষণা। সেখানে বলা হয়েছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), অটোমেশন ও প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থার বিস্তারে ২০৪১ সালের মধ্যে দেশের তৈরি পোশাক খাতের প্রায় ১২ লাখ ২০ হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থান ঝুঁকিতে পড়তে পারে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়, ঝুঁকিতে থাকা কর্মীদের প্রায় ৬০ শতাংশই নারী।

এমন বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠছে—বাংলাদেশ কি প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত? নাকি একদিকে উৎপাদন বাড়বে, অন্যদিকে কর্মহীন হয়ে পড়বেন লাখো শ্রমিক?

বদলে যাচ্ছে কারখানার চিত্র

দেশের পোশাক শিল্প গত এক দশকে ব্যাপক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের চাহিদা, দ্রুত উৎপাদন, মান নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যয় কমানোর লক্ষ্যে অনেক কারখানায় আধুনিক প্রযুক্তি যুক্ত হয়েছে।

কারখানা-সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কাটিং, ফেব্রিক স্প্রেডিং, প্যাটার্ন তৈরি, প্যাকেজিং, এমনকি কিছু সেলাইয়ের কাজেও এখন স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি ব্যবহার বাড়ছে। উৎপাদনের গতি বাড়ছে, ভুল কমছে, কিন্তু একই সঙ্গে কমে যাচ্ছে শ্রমঘন কাজের প্রয়োজনীয়তা।

শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, এই পরিবর্তন একদিনে আসেনি। তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিকাশের কারণে আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরে এর প্রভাব আরও স্পষ্ট হবে।

সবচেয়ে বেশি শঙ্কায় নারী শ্রমিক

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পে কর্মরত শ্রমিকদের বড় অংশই নারী। দীর্ঘদিন ধরে তাঁরা সেলাই, ফিনিশিং, কাটিং, কোয়ালিটি চেকিংসহ বিভিন্ন শ্রমনির্ভর কাজে নিয়োজিত।

সিপিডির গবেষণায় বলা হয়েছে, প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়বে এই কাজগুলোর ওপর। ফলে নারীদের কর্মসংস্থান তুলনামূলক বেশি ঝুঁকির মুখে।

শ্রম অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর মতে, শুধু চাকরি হারানোর ঝুঁকিই নয়, নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পারলে নারী শ্রমিকদের আয় কমে যেতে পারে। অনেকেই হয়তো নিম্ন মজুরির অনানুষ্ঠানিক খাতে চলে যেতে বাধ্য হবেন।

অর্থনীতির জন্যও বড় সংকেত

বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের সবচেয়ে বড় উৎস তৈরি পোশাক শিল্প। এই খাতে প্রায় ৪০ লাখের বেশি মানুষ প্রত্যক্ষভাবে কাজ করেন। তাঁদের একটি বড় অংশ নারী।

অর্থনীতিবিদদের মতে, এই বিশাল কর্মশক্তির একটি অংশ যদি পর্যায়ক্রমে কাজ হারায়, তাহলে এর প্রভাব শুধু শিল্পেই নয়, দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতেও পড়বে। কমে যেতে পারে পারিবারিক আয়, বাড়তে পারে দারিদ্র্য, সামাজিক বৈষম্য ও বেকারত্ব।

সিপিডির পর্যবেক্ষণ

সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. তৌফিকুল ইসলাম খান বলেছেন, বাংলাদেশ যখন স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন অটোমেশন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল অর্থনীতি, জলবায়ু পরিবর্তন এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য কাঠামোর পরিবর্তন শ্রমবাজারে নতুন চাপ সৃষ্টি করছে।

তিনি বলেন, কর্মসংস্থানের পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে তাল মেলাতে দেশের নীতিগত প্রস্তুতি এখনও যথেষ্ট নয়। শিক্ষা ও শ্রমবাজারের চাহিদার মধ্যে বড় ধরনের অমিল রয়েছে।

সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য মনে করেন, বিশ্ব দ্রুত বদলে যাচ্ছে, কিন্তু নীতিনির্ধারণ এবং দক্ষতা উন্নয়নের গতি সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোতে পারছে না। দক্ষতার ঘাটতি ভবিষ্যতে বড় সংকট তৈরি করতে পারে।

উদ্বেগের পরিসংখ্যান

সিপিডির প্রতিবেদনে উঠে এসেছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য—

২০৪১ সালের মধ্যে পোশাক খাতে প্রায় ১২ লাখ ২০ হাজার চাকরি ঝুঁকিতে।
ঝুঁকিতে থাকা শ্রমিকদের ৬০ শতাংশই নারী।
২০২৪ সালে দেশে প্রায় ১৩ লাখ চাকরি কমেছে, যার প্রায় ৯০ শতাংশ নারী কর্মীদের।
উৎপাদন বাড়লেও উৎপাদন খাতে কর্মসংস্থান প্রায় ৮১ লাখে স্থির।
মাধ্যমিক পর্যায়ে কারিগরি শিক্ষায় ভর্তি ২০ শতাংশেরও কম।
শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নে সরকারি ব্যয় জিডিপির মাত্র ১ দশমিক ৩ শতাংশ।
বিশ্ব কী বলছে?

বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বে এআই ও অটোমেশন প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে, আবার প্রায় ৯০ লাখ চাকরি বিলুপ্তও করবে।

অর্থাৎ, নতুন প্রযুক্তি যেমন সুযোগ তৈরি করবে, তেমনি পুরোনো অনেক ধরনের কাজও হারিয়ে যাবে। যারা নতুন দক্ষতা অর্জন করতে পারবেন, তাঁরাই এগিয়ে থাকবেন।

মালিকদের দৃষ্টিভঙ্গি

পোশাকশিল্প মালিকদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে প্রযুক্তি ব্যবহারের বিকল্প নেই। ক্রেতারা এখন কম সময়ে, কম খরচে এবং উচ্চমানের পণ্য চান। ফলে প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদনে না গেলে রপ্তানি বাজার ধরে রাখা কঠিন হবে।

তবে তাঁদের মতে, প্রযুক্তির পাশাপাশি দক্ষ মানবসম্পদও প্রয়োজন। এজন্য সরকার, শিল্পমালিক ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি।

কী বলছেন শ্রম বিশেষজ্ঞরা?

শ্রমবাজার বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিবর্তনকে ভয় পাওয়ার চেয়ে প্রস্তুতি নেওয়া বেশি জরুরি।

তাঁদের মতে—

শ্রমিকদের পুনঃপ্রশিক্ষণের জাতীয় কর্মসূচি চালু করতে হবে।
নারী শ্রমিকদের ডিজিটাল দক্ষতা বাড়াতে হবে।
কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
প্রযুক্তিগত পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা জোরদার করতে হবে।
শিল্প ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে।
সময় থাকতে সিদ্ধান্ত প্রয়োজন

বাংলাদেশের পোশাক শিল্প গত চার দশকে দেশের অর্থনীতিকে বদলে দিয়েছে। লাখো নারী প্রথমবারের মতো কর্মজীবনে যুক্ত হয়েছেন। তাঁদের আয় বদলে দিয়েছে অসংখ্য পরিবারের ভাগ্য।

এখন সেই শিল্পই প্রবেশ করছে নতুন এক যুগে—যেখানে প্রতিযোগিতা হবে প্রযুক্তি ও দক্ষতার।

প্রশ্ন হলো, এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশের শ্রমিকদের প্রস্তুত করা যাবে কি?

বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের এই সময়ে সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ হওয়া উচিত মানুষের দক্ষতায়। কারণ প্রযুক্তি মানুষের বিকল্প নয়, বরং দক্ষ মানুষের সহায়ক। কিন্তু সেই দক্ষতা অর্জনের সুযোগ যদি তৈরি না হয়, তাহলে প্রযুক্তির অগ্রগতি লাখো শ্রমিকের জন্য আশীর্বাদ নয়, হয়ে উঠতে পারে অনিশ্চয়তার আরেক নাম।