ঢাকা, রবিবার ০৫, জুলাই ২০২৬ ৪:১১:২১ এএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
হামে আরও ২ শিশুর মৃত্যু, নতুন আক্রান্ত ৮৩৩ শেষ ষোলোয় কবে কখন কে কার মুখোমুখি জুলাই শহীদ স্মরণসভায় প্রধানমন্ত্রী ইউরোপে ভয়াবহ তাপপ্রবাহে তিন দেশে মৃত্যু ৩৭০০ আয়াতুল্লাহ খামেনির প্রতি সর্বসাধারণের আনুষ্ঠানিক শ্রদ্ধা শুরু ঘানাকে হারিয়ে শেষ ষোলোতে কলম্বিয়া কেপ ভার্দের কঠিন পরীক্ষায় পাস করে শেষ ষোলোয় আর্জেন্টিনা

ছোট গল্প: নিঃ শ ব্দ ছা দে র কা ন্না

আইরীন নিয়াজী মান্না | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ১২:৪৩ এএম, ৫ জুলাই ২০২৬ রবিবার

ছবি এঁকেছে: নক্ষত্র। বয়স: ৭ বছর।

ছবি এঁকেছে: নক্ষত্র। বয়স: ৭ বছর।

বর্ষা নামার আগের দিনগুলোতে শহরটা কেমন ধুলো ধুলো হয়ে থাকে। আকাশে মেঘ জমে, কিন্তু বৃষ্টি নামে না। বাতাসে শুধু অপেক্ষার গন্ধ ভাসে। দীপালি হাসান এই অপেক্ষার গন্ধ খুব চেনেন।

তার বয়স এখন ষাট ছুঁইছুঁই। একসময় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তিনি কবিতা লিখতেন, পরে গল্পে চলে আসেন। এখন তিনি দেশের জনপ্রিয় গল্পকারদের একজন। পাঠকেরা তার গল্পে নিজেদের জীবন খুঁজে পায়। অথচ নিজের জীবনটাকে তিনি বহুদিন হলো গল্পহীন মনে করেন।

একটি অভিজাত এলাকার বিশাল বহুতল ভবনের সবচেয়ে উঁচু ফ্লোরে তার বাস। একা মানুষ। চাকরি, বই, লেখালেখি আর নীরবতা—এই চারটি জিনিস নিয়ে তার সংসার।

দীপালির বেডরুমের সঙ্গে লাগোয়া বিশাল একটি বারান্দা আছে। এই বারান্দাটাই তার পৃথিবীর সবচেয়ে প্রিয় জায়গা। সন্ধ্যায় কিংবা ছুটির দিনে তিনি সেখানে বসেন। হাতে ধোঁয়া ওঠা লাল চা। সামনে ছড়িয়ে থাকা শহর।

এই শহরকে তিনি উপর থেকে দেখেন—কখনো ক্লান্ত, কখনো উন্মত্ত, কখনো বিষন্ন। আর বর্ষাকালে তিনি দেখেন দুটি মেয়েকে। একটু দূরে একটি ছয়তলা বাড়ির ছাদ। ছাদজুড়ে টবের সারি। বেলি, গাঁদা, জবা, বোগেনভেলিয়া, মানিপ্ল্যান্ট। বর্ষা নামলেই দুই কিশোরী ছুটে আসে ছাদে। বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে হাসে তারা। শুকনো পাতা কুঁড়িয়ে নেয়। টব সরিয়ে পরিস্কার করে। গাছের ডাল বেঁধে দেয়। কখনো ছাদে ঘুরতে ঘুরতে নাচে দুজনে।

মাঝেমধ্যে তাদের বাবা এসে ভেজা কাপড় কাঁধে ফেলে দাঁড়িয়ে থাকেন। মা এসে তোয়ালে হাতে বকাঝকা করেন। অথচ সেই বকুনিতেও মায়া ঝরে।
দীপালি দূর থেকে দেখেন। তার মনে হয়, সুখ আসলে খুব ছোট্ট একটি দৃশ্য—একটি ছাদ, কিছু টব, বৃষ্টিতে ভেজা দুটি মেয়ে।

মেয়ে দুটি প্রায় একইরকম দেখতে। শুধু একজন একটু লম্বা। দীপালি মনে মনে নামও দিয়েছিলেন—লম্বাটির নাম ‘বড় বৃষ্টি’, ছোটটির নাম ‘ছোট বৃষ্টি’।
বর্ষা এলেই ওরা ছাদে আসবে—এটি যেন এক অদৃশ্য নিয়ম হয়ে গিয়েছিল। এভাবে পাঁচ-ছয় বছর কেটে যায়।

দীপালি খেয়াল করে দেখেন, মেয়ে দুটি বড় হচ্ছে। তাদের হাসির ভেতর শিশুসুলভ ছেলেমানুষি কমে এসেছে। একজনের চুল কোমর ছুঁয়েছে। আরেকজন চশমা পরা শুরু করেছে। হয়তো তারা এখন কলেজে পড়ে। কিন্তু বর্ষার সঙ্গে তাদের সম্পর্ক বদলায়নি। প্রথম বৃষ্টি নামলেই তারা এখনও ছাদে ওঠে।

দীপালির ভালো লাগে। অদ্ভুত ভালো লাগে। তিনি কখনো তাদের সঙ্গে কথা বলেননি। নাম জানেন না। কাছে থেকে মুখও দেখেননি স্পষ্ট করে। তবু মানুষ কখন যে কার জীবনের সঙ্গে নীরবে জড়িয়ে যায়, তা কে জানে!

***
সে বছর বর্ষা একটু দেরিতে আসে। এক দুপুরে আকাশ কালো হয়ে এলো। তারপর আচমকা বৃষ্টি। দীপালি চায়ের কাপ হাতে বারান্দায় এসে দাঁড়ালেন।
ওই বাড়ির ছাদে একটি মেয়ে। শুধু একটি। সে একা ভিজছে।

দীপালি প্রথমে খুব গুরুত্ব দিলেন না। হয়তো অন্যজন অসুস্থ। হয়তো পড়তে বসেছে।

কিন্তু পরদিনও একই দৃশ্য। তারপরের দিনও। মেয়েটি একা আসে। একা ভিজে। একা টব সরায়। মাঝে মাঝে আকাশের দিকে তাকিয়ে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। ছাদের অর্ধেক যেন খালি পড়ে থাকে।

দীপালির বুকের ভেতর কেমন অস্বস্তি জমতে থাকে।

চতুর্থ দিনের বিকেলে প্রবল বৃষ্টি হচ্ছিল। আকাশ যেন শহরের ওপর ঝুঁকে কাঁদছে। মেয়েটি ছাদে দাঁড়িয়ে ছিল। আজ সে কিছুই করছিল না। শুধু ভিজছিল। নিঃশব্দে।

দীপালি অদ্ভুত এক টান অনুভব করলেন। তিনি অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। ঠিক তখনই কাজের বুয়া রাহেলা পাশে এসে দাঁড়াল।

—খালাম্মা, চা নেন।

—দাও।

রাহেলা বাইরের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ বলল,
—ওই বাড়ির বড় মাইয়াডা মইরা গেছে।

দীপালির হাত কেঁপে উঠল। কাপের ভেতর চা দুলে উঠল।
—কী বললে?

—হ, খালাম্মা। ডেঙ্গু হইছিল। তিন মাস হইলো মইরা গেছে। আমি তো ওগোর বিল্ডিংয়েই কাজ করি।

শব্দটা আচমকা খুব ভারী মনে হতে লাগল। দীপালি আবার ওই ছাদের দিকে তাকালেন।

মেয়েটি এখনও ভিজছে। কিন্তু এখন তাকে আর আগের মতো লাগছে না। মনে হচ্ছে, সে আসলে একা না। তার পাশে অদৃশ্য হয়ে দাঁড়িয়ে আছে আরেকটি মেয়ে। একইরকম মুখ। একইরকম হাসি। শুধু তাকে দেখা যায় না।

সেদিন রাতে দীপালি কিছু লিখতে পারেননি। টেবিলের সামনে বসে সাদা কাগজের দিকে তাকিয়ে ছিলেন শুধু। তার মনে হচ্ছিল, মৃত্যু খুব নিঃশব্দে মানুষের জীবন থেকে একজনকে মুছে দেয়। কিন্তু মুছে ফেলতে পারে না অভ্যাসগুলো।

যে মেয়েটি মারা গেছে, সে এখনও বুঝি প্রতিদিন বৃষ্টির সময় ছাদে আসে। ছোট বোনের পাশে দাঁড়ায়। টব সরায়। চুল ভেজায়। শুধু অন্যরা তাকে দেখতে পায় না।

***
তারপরের কয়েকদিন দীপালি আর বারান্দায় যাননি। ওই ছাদটার দিকে তাকালেই খুব দূঃখ লাগত। কিন্তু মানুষ শেষ পর্যন্ত তার দুঃখের কাছেই ফিরে আসে।
এক বিকেলে আবার বৃষ্টি নামল। তিনি ধীরে ধীরে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালেন।

ছোট মেয়েটি ছাদে এসেছে। আজও একা সে। হঠাৎ মেয়েটি আকাশের দিকে মুখ তুলে দুই হাত ছড়িয়ে দিল। যেন কারও সঙ্গে ভিজছে। কারও সঙ্গে হাসছে, কথা বলছে। দীপালির চোখ ঝাপসা হয়ে এলো।

তার মনে হলো, পৃথিবীর সবচেয়ে নিঃসঙ্গ মানুষ তারা, যারা বেঁচে থাকে— কিন্তু তাদের প্রিয় মানুষটি আর বেঁচে থাকে না। পাশে থাকে না। সে রাতে দীপালি একটি গল্প লিখলেন। গল্পের নাম দিলেন— ‘নিঃশব্দ ছাদের কান্না’। 

ছবি এঁকেছে: নক্ষত্র। বয়স: ৭ বছর।